‘ঐতিহ্যবাহী গুম’

আপডেট: 02:20:54 06/07/2017



img

আহসান কবির

ঘুমাইয়া ছিলাম ভালো ছিলাম, উইঠা দেহি ‘লুঙ্গি’ নাই
‘লুঙ্গি’ নাই!
অভিনেতা এবং গীতিকার মারজুক রাসেল তার ফেসবুকে এই স্ট্যাটাস দিয়েছেন। গানের আদলে লেখা এই স্ট্যাটাসে একটা গুম গুম ভাব আছে। আছে লুঙ্গি বা ইজ্জত গুম হওয়ার ভয়। বাংলাদেশের মানুষের কাছে ২০১৭ সালের জুলাই মাসের শুরুটা অর্থাৎ ঈদ পরবর্তী সময়টা শুরু হলো একটা গুম গুম ভাব দিয়ে। সুতরাং গুম বিষয়ক কৌতুক দিয়েই লেখাটা শুরু করা যেতে পারে।
ঘোড়ায় চড়ে টগবগ টগবগ করে ছুটে যাচ্ছে এক ওয়েস্টার্ন যুবক। তার মাথায় হ্যাট, কোমরে পিস্তল। ছুটতে ছুটতে সে খেয়াল করলো এক বুড়ো রাস্তা দিয়ে হাঁটছে। তার সামনে ফনা তুলেছে এক কাল কেউটে! ওয়েস্টার্ন যুবক কাল বিলম্ব না করে পিস্তলের গুলি দিয়ে কেউটের মাথা উড়িয়ে দিলো। বুড়ো অবাক হয়ে বললো- বাবা আমি সাধারণ মানুষ নই। ঈশ্বর প্রেরিত দূত! তুমি যে কোনও তিনটা জিনিস চাও। ভোর হলেই সেটা মিলে যাবে। এবার ওয়েস্টার্ন যুবক বিস্মিত। সন্দেহ ঝেড়ে ফেলে সে বললো -আমার চেহারা হবে টেলি স্যাভালাসের মতো (কোজাক সিরিয়ালের জন্য ন্যাড়া মাথার এই অভিনেতা ভীষণ জনপ্রিয় ছিলেন) আর ফিগার হবে আরনল্ড সোয়ার্জিনেগারের মতো। আমি আরো চাই আমার যৌবন হবে এই ঘোড়াটার মতো! বুড়ো বললো -ভোর পর্যন্ত অপেক্ষা করলেই পেয়ে যাবে! সকালে ঘুম ভাঙার পর দারুণ বিস্মিত সেই ওয়েস্টার্ন যুবক। তার স্লিপিং গাউন ছিড়ে গেছে। সে দৌড় দিয়ে আয়নার সামনে যেয়ে আরো বিস্মিত। কোজাকের মতো তার মাথায় চুল নেই। তার হয়েছে সোয়ার্জিনেগারের মত দারুণ পেশীওয়ালা ফিগার। এরপর নিচের দিকে তাকিয়ে সে চীৎকার করে কেঁদে উঠলো। কাঁদতে কাঁদতে তার মনে পড়লো গতকাল সে আস্তাবল থেকে একটা মাদী ঘোড়া নিয়ে বেরিয়েছিল! প্রিয় পাঠক, আপনারাই বুঝে নিন ওয়েস্টার্ন যুবকের কী গুম হয়ে গিয়েছে!
এদেশে কয়েক বছর ধরে গুমের কাল বা সিজন চলছে। তবে বেশির ভাগ মানুষ জানে না প্রকৃতি নিজেও কখনও সখনো গুম ভালোবাসে। আমার পুরোনো লেখা থেকে কয়েকটা উদাহরণ দিলেই বোঝা যাবে-
এক. প্রকৃতি ও পৃথিবীর দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য হচ্ছে গুম। প্রকৃতি নিজেই অতিকায় ডাইনোসরদের গুম করে দিয়েছে কিন্তু তেলাপোকাদের টিকিয়ে রেখেছে। গুম করে দিয়েছে অনেক অনেক প্রজাতির পশু, পাখি ও উদ্ভিদ! নদী ভাঙ্গনে গুম হয়েছে অনেক জনপদ আর মহামারিতে গুম হয়েছে অনেক সভ্যতা। তেলাপোকা নয় অনেকটা সিংহের মতোই টিকে আছে ঐতিহ্যবাহী গুম!
দুই. কলেরা বা মহামারিতে গুম হতো মানুষ, যুদ্ধ, ভূমিকম্প কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগে গুম হতো জনপদ। গুম হতো গুটি বসন্তে। এখন কলেরা বা গুটি বসন্তই গুম হয়ে গেছে! নিঃসন্দেহে এই গুম জনস্বার্থে ঘটেছিল।
তিন. এক সময়ের অতিকায় মুসলিম লীগ কিংবা নেজামে ইসলামীর মতো দলগুলো গুম হয়ে গেছে তবে টিকে আছে জামায়াতে ইসলামী!
চার. এই উপমহাদেশে মোঘল সম্রাটদের প্রচলন করা খাবার মোগলাই পরাটা, কাবাব ও বিরানী টিকে আছে ঐতিহ্য নিয়েই তবে গুম হয়ে গেছে মসলিন। মসলিন কাপড় নাকি এতো সূক্ষ্ম ছিল যে একটা ম্যাচের বাক্সে সেটাকে ভাজ করে ঢুকিয়ে রাখা যেত। এতো মিহি আর সূক্ষ্ম বলে কী গুম করে ফেলা সহজ? তাহলে ডাইনোসর?
পাঁচ. মানুষের ইচ্ছেতেই  হয়তো গুম হয়ে গিয়েছিল কলেরা বা প্লেগের মহামারি কিংবা গুটি বসন্তের ব্যামো। তাহলে আর কী কী গুম হলে মানুষেরা শান্তি পাবে? সন্ত্রাস আর দুর্নীতি? অস্থিতিশীল রাজনীতি আর দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি? ক্যান্সার আর এইডসের মতো প্রাণঘাতি রোগ? লোডশেডিং আর শেয়ার বাজারের নিম্নগামী সূচক? যানজট আর স্বজনপ্রীতি? দেশবিরোধী শক্তি কিংবা একাত্তরের ঘাতক ও দালালরা? নাকি বেশি কিছু আশা করা ভুল? যে সব জিনিস গুমের জন্য মানুষেরা প্রার্থনা করে সেগুলো ঠিকই থেকে যায় মহাদর্পে । উল্টো গুম হয়ে যায় শ্রদ্ধাবোধ, সহনশীলতা, মানুষের প্রতি ভালোবাসাবাসি, মূল্যবোধ আর কিছু কিছু মানুষের বিবেক! মানুষের প্রতি বিশ্বাসও কী গুম হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ?
তবে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত থাকলেও গুম হয়ে যায়নি সেই পুরনো গল্প। র্যাব এবং পুলিশে অনেক গল্পবাজ মানুষ চাকরি করলেও প্রচলিত এই গল্পটা গুম হয়ে যাবার আপাত কোনও সম্ভাবনা নেই। এবার গল্প, লুঙ্গি, গুম, বিয়ে এবং ভাগ্যবান-ভাগ্যহীন বিষয়ক কিছু প্রশ্ন ও উত্তরের আয়োজন করা হচ্ছে-
প্রশ্ন : সবচাইতে বেশি প্রচলিত কিন্তু মানুষের কাছে ভিত্তিহীন ও মিথ্যা গল্প কোনটি?
উত্তর : ‘গতকাল দুপুরে র্যাবের হাতে গ্রেফতার হয় টিকটিকি আহসান। গভীর রাতে র্যাব তাকে নিয়ে অস্ত্র উদ্ধারে গেলে টিকটিকি আহসানের সহযোগীরা তাকে ছিনিয়ে নিতে চেষ্টা করে এবং র্যাব বাধা দেয়। এসময়ে দুপক্ষের মধ্যে গুলি বিনিময় হলে মারাত্মক আহত হয় টিকটিকি আহসান। মারাত্মক আহত আহসানকে হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন’। 
প্রশ্ন:  বিয়ে কী?
উত্তর: বিয়ে হচ্ছে জনপ্রিয়তম পাবলিক টয়লেট। যে টয়লেটের ভেতরে থাকে সে যেমন বাইরে আসার জন্য ছটফট করে, যারা বাইরে লাইনে দাঁড়িয়ে আছে তারাও তেমন ভেতরে যাওয়ার জন্য ছটফট করে। তবে যারা লিভ টুগেদার করে তাদের বিষয় আলাদা।
প্রশ্ন: ব্যতিক্রম, ভাগ্যবান আর ভাগ্যহীন কারা?
উত্তর: গুম হয়ে যাওয়ার পরেও যিনি ফিরে আসতে সক্ষম হন তিনি ব্যতিক্রম! যেমন পরিবেশ এনজিও বেলার প্রধান নির্বাহী সৈয়দ রেজোওয়ানা হাসানের স্বামী আবু বকর সিদ্দিক। আর ভাগ্যবান হচ্ছে তারা গুম হবার পরেও যাদের লাশ পাওয়া যায়! (অনেকটা সেই কৌতুকের মতো- মারব মিরপুরে, লাশ পড়বে আজিমপুরে!) আর ভাগ্যহীনদের কখনও কেউ খুঁজে পাবে না। বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর স্বজনদের মতো কান্না আর স্মৃতিই ভাগ্যহীনদের আত্মীয়স্বজনের প্রাপ্তি! তবে কবি, প্রাবন্ধিক ও চিন্তাবিদ ফরহাদ মজহারের কথিত ‘অপহরণ’ এবং তার ফিরে আসাটাও ব্যতিক্রমী কিনা তা এখনই বলা যাচ্ছে না! কারণ কে যে কখন গুম হয়ে যায়!
প্রশ্ন : ক্রসফায়ার আর গুমের ভেতর পার্থক্য কী?
উত্তর : ক্রসফায়ার এখন একটি পুরোনো পন্থা। সেকেলে! লেটেস্ট প্রেস্টিজিয়াস জিনিস হচ্ছে গুম। গুম অনেক ওপরের ব্যাপার!
প্রশ্ন : লুঙ্গি ডান্স লুঙ্গি ডান্স গানটা এতো জনপ্রিয় কেন?
উত্তর : ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলংকা, নেপাল ও ভুটানের অনেক মানুষ লুঙ্গি পরেন বলেই লুঙ্গি ডান্স গানটা খুব জনপ্রিয়। লুঙ্গি পরাটাও একটা টেকনিকের ব্যাপার।
তবে বিখ্যাত কবি সাহিত্যিকদের কিছু রোমান্টিক লাইন আছে। যেমন-কত শত সুন্দর গোলাপ কোথায় হারিয়ে যায়? সুন্দর মেঘমালা কোথায় চলে যায়? সুন্দর পাখিগুলো সন্ধ্যায় চলে যাবার পর সকালে কি সব ফিরে আসে? এইসব পাখি, ফুল, নদী আর মেঘও কী মানুষের মতো গুম হয়ে যায়? যারা ফিরে আসে, ফেরার পর তারা কেমন যেন হয়ে যায়। কেন?
পরিবেশ এনজিও বেলার প্রধান নির্বাহী রেজওয়ানা হাসানের স্বামী আবু বকর সিদ্দিককে নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের একটা পেট্রোল পাম্প থেকে গুম চেষ্টা বা অপহরণ করা হয়েছিল ২০১৪ সালের এপ্রিলে। একাধিক পত্রিকার ভাষ্য অনুযায়ী চট্ট-মেট্রো-১৭-৮৩২৭ নম্বরের একটা গাড়ি থেকে সুঠামদেহী ছোটচুলের অধিকারী কয়েকজন অস্ত্রধারী লোক সিদ্দিক সাহেবকে তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন। ৩৫ ঘণ্টা পরে তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল! বাসায় যাওয়ার জন্য তাকে তিনশত টাকাও দেওয়া হয়েছিল। ফিরে আসার পর সিদ্দিক সাহেব শুধু এইটুকুই বলেছেন- তিনি কাউকে চিনতে পারেননি! এইটুকুই! এরপর তার দীর্ঘ নীরবতা। ব্যতিক্রমী অর্থাৎ যারা ফিরে আসতে পেরেছেন, যেমন মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া সালাহউদ্দীন কাদের চৌধুরীর ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরী, বিএনপি নেতা সালাহউদ্দীন আহমেদ কিংবা ফরহাদ মজহাররাও কাউকে চিনতে পারেন না। এরপর তারা হয়ে যান নিশ্চুপ! ফরহাদ মজহার অবশ্য নাম বদলে গফুর হয়ে যান! খুলনা শহরের নিউ মার্কেট এলাকার কাছে অবস্থিত গ্রিল হাউসে তিনি ভাত মাছ খান। হানিফ পরিবহনের যে বাসে করে ঢাকায় ফেরেন সে বাসে অল্প কয়েকজন যাত্রীই থাকেন, তিনি নিজেই টিকেট কেটেছেন নাকি কেউ তাকে ভাত খাইয়ে টিকেটটা ধরিয়ে দিয়েছে  সেটাও জানা যায় না! যারা ভাগ্যহীন, যারা কখনোই ফিরে আসেননি, যাদেরকে তুলে নেওয়ার সময় মানুষ বা পুলিশ দেখে ফেলেছিল, সেইসব ভাগ্যহীনদের কারা তুলে নিয়ে গিয়েছিল, গত আট বছর ধরে ঘটতে থাকা একটি মাত্র ঘটনার রহস্যও সরকার উদ্ঘাটন করতে পারেনি!
রাষ্ট্রের যে কোনও নাগরিক ক্ষমতাসীনদের সাথে ভিন্নমত পোষণ করতে পারেন, ব্যক্তিগতভাবে বিতর্কিতও হতে পারেন কিন্তু তার নামে বদনাম ছড়িয়ে তার সাথে ঘটে যাওয়া হত্যা, গুম বা অপহরণচেষ্টা জাস্টিফাই করার কোনো অবকাশ নেই। আর যদি কোনও ব্যক্তি কোনও নাটক তৈরি করেন কিংবা কোন হীন উদ্দেশ্য নিয়ে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার চেষ্টা করেন সেটাও সরকারকেই খোলাসা করতে হবে।
গুম নিয়ে লেখার শেষটা কেমন যেন সিরিয়াস হয়ে যাচ্ছে। প্রিয় পাঠক চলুন একটা গল্প শুনে বিদায় নিই।
কোনো এক দেশের প্রধানমন্ত্রী এক বিদ্যালয় পরিদর্শনে গেলেন। ১০ম শ্রেণির এক ক্লাসে তিনি ছাত্রদের কাছে জানতে চাইলেন কারও কোনও প্রশ্ন আছে?  ইভান নামের এক ছাত্র হাত তুলে বলল-  মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমার ৩টি প্রশ্ন আছে।
১. আপনারা যারা রাজনীতি করেন তারা একে অন্যকে সহ্য করতে পারেন না কেন?
২. আপনারা যখন সরকারি দল তখন সব কিছুতেই বিরোধী দলের ষড়যন্ত্রের গন্ধ পান কেন?
৩. গুম বা অপহরণের ঘটনা আসলে কারা ঘটাচ্ছে?
এমন সময় টিফিনের ঘণ্টা বেজে উঠলো! টিফিনের পরে আবার ক্লাস শুরু হলে অন্য আর এক ছাত্র হাত তুলে বলল-  মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমার ৫টি প্রশ্ন আছে।
১. আপনারা যারা রাজনীতি করেন তারা একে অন্যকে সহ্য করতে পারেন না কেন?
২. আপনারা যখন সরকারি দল তখন সব কিছুতেই বিরোধী দলের ষড়যন্ত্রের গন্ধ পান কেন?
৩. গুম বা অপহরণের ঘটনা আসলে কারা ঘটাচ্ছে?
৪. আজকে টিফিনের ঘণ্টা কেন ২০ মিনিট আগেই বেজে উঠলো?
৫. আপনাকে প্রথমে যে প্রশ্ন করেছিল সেই ইভান এখন কোথায়?

[লেখক : মিডিয়াকর্মী, অভিনেতা, রম্যলেখক। বাংলা ট্রিবিউন থেকে।]

আরও পড়ুন