‘তাহলে শাহজালালের চোখ তুললো কারা’

আপডেট: 08:28:37 17/01/2018



img
img

খুলনা অফিস : শাহজালাল নামে এক তরুণের চোখ উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে- একথা প্রতিষ্ঠিত সত্য। কিন্তু কে বা কারা তার চোখ উঠিয়েছে?
বাদীপক্ষের দাবি, পুলিশ এই কাজ করেছে। কিন্তু পুলিশের তদন্তে এই ঘটনায় যুক্তদের শনাক্ত করা যায়নি বলে বলা হচ্ছে। আবার বাদীপক্ষের অভিযোগ, দায় এড়াতে পুলিশ বাদীকে টাকার বিনিময়ে ম্যানেজ করার চেষ্টাও করে। সবমিলিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, চোখ তুলে ফেলার বিচার কি পাবেন শাহজালাল?
পিবিআই খুলনার পরিদর্শক মো. বাবলুর রহমান খান ১১৪ দিন পর সোমবার মহানগর আমলী আদালত গ অঞ্চলে এই ঘটনার প্রতিবেদন দাখিল করেন। মঙ্গলবার প্রতিবেদনটি আদালতের সংশ্লিষ্ট ফাইলে নথিভুক্ত হয়। আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি মামলার পরবর্তী দিন ধার্য রয়েছে। পিবিআই গেল বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর মামলার তদন্তভার গ্রহণ করে।
এদিকে, এ ধরনের প্রতিবেদনকে ‘দায়সারা, দায়িত্বে অবহেলা এবং পক্ষপাতদুষ্ট’ বলে উল্লেখ করেছেন শাহজালালের বাবা মো. জাকির হোসেন। তিনি চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘পুলিশের হেফাজতেই শাহজালালের চোখ তোলা হয়। যা আমার ছেলের সাক্ষ্যতেই প্রমাণ হয়েছে। সেখানে যদি পুলিশকেই নির্দোষ বানানো হয়, তাহলে শাহজালালের চোখ উঠালো কারা? এছাড়া এতদিন ধরে তদন্ত চালিয়েও যদি পিবিআই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করতে না পারে তাহলে তদন্তেরই বা প্রয়োজন কী ছিল?’
বাদীপক্ষের আইনজীবী মোমিনুল ইসলাম এ ধরনের প্রতিবেদনকে পরস্পরবিরোধী, মনগড়া এবং সর্বোপরি পুলিশকে বাঁচানোর উদ্দেশ্যেই ইচ্ছামাফিক তৈরি করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন।
তিনি সংক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, ‘বাদী পক্ষের আইনজীবী হিসেবে আমি এ প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করছি। মামলার পরবর্তী ধার্য্য তারিখে আদালতে নারাজি পিটিশন দাখিল করবো।’
মামলার তদন্ত প্রতিবেদনের ১৫ নম্বর কলামের মতামত অংশে পিবিআই খুলনার পরিদর্শক মো. বাবলুর রহমান খান উল্লেখ করেন, তদন্তকালে তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন, খসড়া মানচিত্র, সূচিপত্র ও ঘটনাস্থলের ছবি উত্তোলন, থানার জিডি, সিসি, হাজতি রেজিস্টার, আসামির চালান কপি, কোর্ট হাজতি রেজিস্টার ও জেলখানার আসামি রেজিস্টার এবং খালিশপুর থানা ও খালিশপুর ক্লিনিকের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ পর্যালোচনা করেছেন। এছাড়া বাদী ও ভিকটিমসহ আটজন, ‘নিরপেক্ষ’ ২৫ জন এবং ১৮ জুলাই খালিশপুর থানাহাজতে থাকা দুইজনসহ মোট ৩৫ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেন।
মামলার সার্বিক তদন্ত এবং ঘটনার পারিপার্শ্বিকতায় তিনি মতামত দিয়েছেন, মামলার প্রধান আসামি খালিশপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. নাসিম খানের বিরুদ্ধে পেনাল কোডের সংশ্লিষ্ট ধারাসহ নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন-২০১৩-এর ১৩/১৫ ধারার অভিযোগের সপক্ষে কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। একইভাবে আসামি এএসআই রাসেল, এসআই তাপসকুমার পাল, এসআই মো. মোরসেলিম মোল্লা, এসআই মো. মিজানুর রহমান, কনস্টেবল আল মামুন, আনসার সিপাহী মো. আফসার আলী, ল্যান্সনায়েক আবুল হাসেম, আনসার নায়েক রেজাউল হক, এসআই মো. নূর ইসলাম, এসআই সৈয়দ সাহেব আলী, সুমা আক্তার এবং মো. রাসেলের বিরুদ্ধেও অভিযোগের সপক্ষে কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।
একই সঙ্গে প্রতিবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা বাবলুর রহমান খান আরো উল্লেখ করেন, ‘তবে তদন্তকালে জানা যায়, ভিকটিম শাহজালাল ওরফে শাহ জামাল ওরফে শাহ গত ১৮ জুলাই রাত আনুমানিক সাড়ে ১১টার সময় খালিশপুর থানাধীন গোয়ালখালি বাসস্ট্যান্ডে ছিনতাইকালে হাতেনাতে ধৃত হয়ে বিক্ষুব্ধ জনগণ কর্তৃক মারপিটের শিকার হয়। এতে তার দুই চোখ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে স্থায়ীভাবে চোখ দুটি নষ্ট হয়ে যায়। যা পেনাল কোডের ১৪৩/৩২৩/৩২৬ ধারার অপরাধ। তদন্তকালে এ নৃশংস ঘটনায় কে বা কারা জড়িত তা শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।’
বাদী ও বাদীপক্ষের আইনজীবীর প্রতিক্রিয়া এবং প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যানের বিষয়ে কথা বলার জন্য তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই খুলনার পরিদর্শক মো. বাবলুর রহমান খানের সেল ফোনে যোগাযোগ করা হলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। এর আগে একাধিকবার রিং হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
আদালতে দাখিল করা শাহজালালের মায়ের এজাহারে উল্লেখ করা হয়, গত বছরের ১৮ জুলাই শাহজালাল নগরীর নয়াবাটি রেললাইন বস্তি কলোনির শ্বশুরবাড়ি থেকে রাত আটটায় শিশুকন্যার দুধ কেনার জন্য বাসার পাশের দোকানে যান। এ সময় খালিশপুর থানার ওসি নাসিম খানের নির্দেশে তাকে থানায় ডেকে নেওয়া হয়। পরিবারের সদস্যরা থানায় গেলে ওসি তাকে ছাড়ানোর জন্য দেড় লাখ টাকা দাবি করেন। দাবিকৃত টাকা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় রাত সাড়ে ১১টার দিকে পুলিশ কর্মকর্তারা শাহজালালকে পুলিশের গাড়িতে করে বাইরে নিয়ে যায়। পরদিন ১৯ জুলাই খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে তাকে দুটি চোখ উপড়ানো অবস্থায় দেখতে পান।
এ সময় শাহজালাল জানান, পুলিশ কর্মকর্তারা হত্যার উদ্দেশ্যে তাকে গাড়িতে করে গোয়ালখালি হয়ে বিশ্ব রোডের (খুলনা বাইপাস সড়ক) নির্জন স্থানে নিয়ে যায়। সেখানে নিয়ে তার হাত-পা চেপে ধরে এবং মুখের মধ্যে গামছা ঢুকিয়ে স্ক্রু ড্রাইভার দিয়ে দুটি চোখ উপড়ে ফেলে।
এ ঘটনায় শাহজালালের মা রেনু বেগম বাদী হয়ে ৭ সেপ্টেম্বর খুলনার মুখ্য মহানগর হাকিমের আমলী আদালতে মামলা করেন। মামলায় ‘দাবিকৃত টাকা না পেয়ে পুলিশ কর্মকর্তারা যোগসাজসে তার ছেলে মো. শাহ জালালের দুটি চোখ উৎপাটন করে’ বলে অভিযোগ করা হয়। মামলায় খালিশপুর থানার ১১ পুলিশ ও আনসার কর্মকর্তাসহ ১৩ জনকে আসামি করা হয়।
সবশেষ গত ৬ জানুয়ারি খুলনা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে করে শাহজালালের পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, মামলা তুলে নেওয়ার জন্য খালিশপুর থানার ওসি নাসিম খানসহ অন্য আসামিরা তাদেরকে সাত লাখ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। যা গ্রহণ না করায় হুমকি দেওয়া হচ্ছে।

আরও পড়ুন