‘বৃক্ষমানব’ আর ফিরতে চান না ঢামেকে

আপডেট: 02:33:21 31/05/2018



img
img

এস এম আলাউদ্দিন সোহাগ, পাইকগাছা (খুলনা) : চিকিৎসা শেষ না করেই অবশেষে ব্যাপক হতাশা আর মনোকষ্ট নিয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন পাইকগাছার ‘বৃক্ষমানব’ আবুল বাজনদার।
তার অভিযোগ, ঢাকা মেডিকেলে তার ঠিকমতো চিকিৎসা হচ্ছিল না। স্টাফদের চিকিৎসায় নিরুৎসাহিত ও দুই বেলা খেতে না পারার অভিযোগ থেকে শুরু করে তাদের বিরুদ্ধে পুলিশের ভয় দেখানোরও অভিযোগ করেন তিনি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অবশ্য দাবি করছেন যে, কাউকে না জানিয়ে পালিয়ে গেছেন আবুল। এক্ষেত্রে আবুলের অভিযোগ উল্টো, কর্তৃপক্ষ তাকে স্বেচ্ছা ছাড়পত্রে স্বাক্ষর করতে বলেছিল। যাতে নাকি লেখা ছিল, তিনি স্বেচ্ছায় হাসপাতাল ছাড়ছেন এবং তিনি আর চিকিৎসা করাতে চান না।
আবুল জানান, গত দুই বছরে অন্তত ২৫ দফা অস্ত্রোপচার হয়েছে তার শরীরে। এরপরও তার হাত ও পায়ের কিছু কিছু জায়গায় ফের আধা ইঞ্চির মতো লম্বা শিকড়-বাকড়ের মতো ‘শ্বাসমূল’ গজিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে তার চিকিৎসকরা তাকে জানান, সমস্যাটি মূলত জেনেটিক এবং সারা জীবন নাকি তাকে এটা বয়ে বেড়াতে হবে।
আবুল বলেন, এর আগে চামচ দিয়ে তিনি খাবার উঠিয়ে খেতে পারছিলেন, সর্বশেষ সেটাতেও তার সমস্যা হচ্ছে। মূলত এসব কারণেই হাসপাতাল ছেড়েছেন বলে দাবি আবুলের। আবুল আরো জানান, ২ মার্চ হাসপাতাল ছেড়ে বাড়িতে এসে সর্বশেষ ১৫ মে হাসপাতালে ফিরলে সেখানে দায়িত্বরতরা বিরক্তি প্রকাশ করেন।
এর আগে এক প্রতিবেদনে আবুলের হাত-পায়ে ফের গাছের শিকড়-বাকড়ের মতো অদ্ভুত শ্বাসমূল জাতীয় বস্তু গজানোর বিষয়টি উঠে আসে। আর এতে নতুন জীবনে ডাক্তারদের পুনর্বাসনে মাথা গোঁজার ঠাঁই পাওয়া আবুলের মনে নতুন করে নানা আশঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে। সেবার ১৬ বারের সফল অস্ত্রোপচারে শরীরের পাঁচ কেজি ওজন কমেছিল তার। প্রতিবেদনে উঠে আসে, বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন আবুলের আশঙ্কার কথা, হয়তোবা বিরল ব্যাধি আমৃত্যু পিছু ছাড়বে না তার। এমন পরিস্থিতিতে সন্তানের হাত ধরে স্বাভাবিক চলাফেরার অভূতপূর্ব অনুভূতি বার বার আপ্লুত করছিল তাকে।
পাইকগাছা পৌরসভার সরল গ্রামের মানিক বাজনদারের চার ছেলে ও চার মেয়ের মধ্যে আবুল ষষ্ঠ। পারিবারিক সূত্র জানায়, দশ বছর বয়স থেকে সে বিরল রোগ হিউম্যান পাপ্পিলোমা ভাইরাসে (এইচপিভি) আক্রান্ত হলে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে গাছের শিকড়ের মতো লম্বা অংশ গজাতে থাকে। এক সময় চলাচল পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যায় তার। স্থানীয় পর্যায়ে নানা রকম চিকিৎসা করিয়ে সহায়-সম্বল ও সর্বশেষ বসতভিটে পর্যন্ত বিক্রি করে একেবারে নিঃস্ব হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে স্বজনরা তাকে নিয়ে ভ্যানে করে বাজারে বাজারে ভিক্ষা করে সংসারের খরচ ও স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা করাচ্ছিলেন। এমন পরিস্থিতিতে মিডিয়ায় তাকে নিয়ে ধারাবাহিক সংবাদ প্রকাশে সরকারি তত্ত¡াবধানে ২০১৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর তাকে ভর্তি করা হয় ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে।
চিকিৎসকরা জানান, বিশ্বে ওয়ার্ট রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা এখনো পর্যন্ত চার। এমন বিরল রোগ সাধারণত জিনগত কারণে হয়ে থাকে বলেই মনে করেন তারা। পাপ্পিলোমা ভাইরাস মানুষের শরীরে একশ উপায়ে আক্রমণ করতে পারে। এর মধ্যে ৩০ শতাংশই যৌনাঙ্গে আক্রমণ করে থাকে। সব ধরনের এইচপিভি ভাইরাসের কারণে শরীরে আঁচিল হতে পারে।
এর আগে ডিএমসিএইচ-এর বার্ন ইউনিটের প্রধান সমন্বয়ক ডা. সামন্তলাল সেন বলেন, এর আগে ২০০৭ ও ২০০৯ সালে মাত্র দুইজন এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার রেকর্ড রয়েছে। এদের একজন ইন্দোনেশিয়ার ও অপরজন রোমানিয়ার। এ ধরনের রোগীকে সাধারণত ‘বৃক্ষমানব’ বলা হয়ে থাকে।
২০১৫ সালে যে সময় আবুলকে ঢাকায় বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয় তার সপ্তাহখানেক আগে ইন্দোনেশিয়ায় বিরল রোগে আক্রান্ত কসওয়ারা দেদে নামে একজনের মৃত্যু হয়। ঠিক এমন পরিস্থিতিতে ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটের চিকিৎসকরা বাজনদারের চিকিৎসায় বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত বোর্ডের সফল অস্ত্রোপচারে আবুলের সাময়িক সুস্থতা চিকিৎসাজগতে বিরল সাফল্য ছিল বলে মনে করা হয়।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের সমন্বয়ক ডা. সামন্ত আবুলের চলে যাওয়া নিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘কে তার সাথে খারাপ আচরণ করেছিল কিংবা তার সমস্যাগুলো ঠিক কোথায় তা সে আমাকে জানাতে পারতো।’
এর আগে দু’দিনের জন্য বাড়িতে আসা আবুল বাজনদার তার প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছিলেন, অসুস্থ অবস্থায় অসহ্য যন্ত্রণা হতো আক্রান্ত স্থানে। একমাত্র ঠিকানা ভ্যানগাড়িতে শুয়ে কখনো তার ভাবা হয়নি নতুন জীবনে ফেরা হবে আর। তবে দুই বছরের চিকিৎসার পর ফের একই সমস্যায় আক্রান্ত নিয়ে তার আশংকা ছিল, দুঃসহ যন্ত্রণা কি তবে ফের থাবা বসাবে তার জীবনে? নতুন করে হাত-পায়ের আঙুলগুলো কি ঢেকে যাবে অদ্ভুত শিকড়ে? এমন আশংকায় আবুল ও তার পরিবারে নিত্য-নতুন ভবনার জন্ম দিচ্ছিল।
অন্যদিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মেডিকেল টিমের অন্যতম সদস্য অধ্যাপক ডা. কবির চৌধুরী জানতে পারেন যে, আবুলের বসবাসের কোনো জায়গা নেই। এরপর তিনি জমি কিনে বাড়ি করার জন্য আবুলকে সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসেন। চিকিৎসকের আর্থিক সহায়তায় আবুল ২০১৬ সালের জুনে পাইকগাছা শহরের চার নম্বর ওয়ার্ডের সরল মৌজায় শিক্ষক মাখন লাল গংদের কাছ থেকে প্রায় ১১ শতক জমি কিনে কোনো রকমে বসতবাড়ি নির্মাণ করে সেখানে গত তিন মাস ধরে বসবাস করছে তার পরিবার। তবে বাড়িতে যাতায়াতের পথ না থাকায় পরিবার-পরিজনের অবরুদ্ধ হয়ে পড়ার খবরে পাইকগাছা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আমিনুল ইসলাম বিপ্লবকে বিষয়টি অবহিত করলে তার হস্তক্ষেপে দখলমুক্ত হয় রাস্তাটি।
বিরল রোগে আক্রান্ত ভ্যানচালক আবুলের প্রতি তার চিকিৎসকদের যখন ছিল এমন ভালোবাসা তখন কী এমন ঘটল যে, রাতারাতি চিকিৎসা শেষ না করেই এক প্রকার পালিয়ে চলে আসতে বাধ্য হলেন আবুল?- এমন প্রশ্নের জবাব মেলাতে পারছেন না এলাকাবাসী।
আবুলের এখনকার করুণ আকুতি, তিনি উন্নত চিকিৎসা পেলে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠবেন বলে আশা করে। তবে আর ঢাকা মেডিকেলে নয়।

আরও পড়ুন