‘যোনি-সর্বস্বতা’ নিয়ে তীব্র বিতর্ক

আপডেট: 01:52:04 30/01/2018



img

সুবর্ণভূমি ডেস্ক : দিনের শেষে তা হলে ‘যোনি-সর্বস্ব’ই হয়ে থাকতে হচ্ছে স্বরা ভাস্করকে!
খোলা চিঠিতে সঞ্জয় লীলা বানশালির দিকে আঙুল তুলে স্বরা বলেছিলেন, বানশালি আসলে শেষমেশ ‘মানুষ’ আর ‘মেয়েমানুষ’-এ ভেদ করা সমাজেরই প্রতিনিধিত্ব করে ফেলেছেন। প্রতিনিধিত্ব করে ফেলেছেন মেয়েদের যোনি-সর্বস্ব প্রাণী হিসেবে দেখা সমাজের। কেনো এ কথা তার মনে হয়েছিল তা খুব স্পষ্ট করেই লিখেছিলেন স্বরা। কিন্তু তার পর থেকে স্বরার ওই খোলা চিঠি এবং তিনি নিজে আক্রমণাত্মক আতস কাচের নীচে।
‘পদ্মাবত’-এর শেষ দৃশ্যে রানি পদ্মিনীর জহরব্রত পালনের দৃশ্য আলোড়িত করেছে বলিউডের এই উঠতি নায়িকাকে। আলোড়িত করেছে তার মননকে। কারণ, তিনি মনে করেন, প্রাচীন এই প্রথা কোনো অবস্থাতেই নারীকে গৌরবান্বিত করে না। স্বরা লিখেছেন, ‘আপনার ছবির শেষটা দেখে খুব অস্বস্তি হচ্ছিল। যেখানে একজন অন্তঃসত্ত্বা এবং একটি বাচ্চা মেয়ে আগুনে ঝাঁপ দিচ্ছেন।...আপনার মনে রাখা উচিত ছিল পাওয়ার অব সিনেমা কী!’
স্বভাবতই এই সব মন্তব্য প্রকাশ্যে আসার পরে সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রোলড হচ্ছেন স্বরা। অভিনেত্রী ও গায়িকা সুচিত্রা কৃষ্ণমূর্তি টুইট করেছেন, ‘পদ্মাবত নিয়ে এ ধরনের নারীবাদী বিতর্ক নেহাতই বোকামি নয় কি? এটা তো নিছকই একটা গল্প, জহরের ঢাক পেটানো নয়। যুদ্ধের জন্য তুমি আসল কোনো কারণ খোঁজো।’
সুচিত্রা লিখেছেন, ‘মজার বিষয় হলো, এক অভিনেত্রী, যিনি কখনো নৃত্যশিল্পী, কখনো যৌনকর্মীর ভূমিকায় অভিনয় করেছেন, এক রানির সিনেমা দেখে তার মনে হলো, আমি যেন যোনি-সর্বস্বতে পরিণত হয়েছি।’
এই কটাক্ষেরও জবাব দিয়েছেন স্বরা। তিনি টুইট করেছেন, ‘মজার কথা এতো বড় একটা চিঠি, যেটা নিয়ে গঠনমূলক বিতর্ক হতে পারে, সেখান থেকে মানুষ শুধু যোনি শব্দটাই মনে রাখলো!’
রাখলো। কারণ, এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে অনেকেই দুধ আর জল আলাদা করার মতো অজস্র শব্দাবলির মধ্য থেকে যৌনগন্ধী শব্দ বেছে নিতে অভ্যস্ত। অতএব, স্বরার এই খোলা চিঠি যে সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যুমেরাং হয়ে তার দিকেই ফিরবে, এটাও স্বাভাবিক।
অতএব বলিউডের কোনো কোনো মহল অবশ্য স্বরার সাম্প্রতিক এই ভাষ্যের একটা অতি সরলীকরণও করে ফেলেছেন। তাদেরই কারো কারো ধারণা, স্বরাকে অভিনয়ের সুযোগ দেননি সঞ্জয়, সেই রাগে এখন তার কাজের সমালোচনা করে প্রচারের আলোয় আসার চেষ্টা করছেন এই অভিনেত্রী। যেমন পরিচালক অশোক পণ্ডিত। তার টুইট : ‘সত্যিই কি স্বরা রেগে গিয়েছেন? গুজারিশ ছবিতে সঞ্জয় ওকে ছোট্ট একটা রোল দিয়েছিলেন বলেই কি স্বরার এতো রাগ?...এখন কি সঞ্জয়কে জ্ঞান দেওয়ার মতো এক্সপার্ট হয়ে উঠল স্বরা? সঞ্জয় তো বটেই, ওর সঙ্গেই আমাদের সব পরিচালক এবং লেখকের ওর কাছ থেকে লেকচার নেওয়া উচিত? এফটিআইআই-এর মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলো তা হলে বন্ধ হয়ে যাক।’
প্রযোজক মণীশ মুন্দ্রা টুইট করেছেন, ‘কেউ যদি ফিকশনকে সিরিয়াস ভেবে খোলা চিঠি লেখে, তা হলে কী বলব।’
সত্যিই তো, নিছক ফিকশন! অতএব, সেই ‘ফিকশন’ থেকে জীবনের গভীরতর কোনো অর্থ খুঁজতে চাওয়া বিলাসিতা মাত্র! আরো নিবিড় কোনো প্রশ্ন যদি কেউ তোলেন যে, এভাবে প্রাচীন কোনো প্রথার দৃশ্যায়ন আসলে সেই প্রথাকে গরিমান্বিত করে, নারিত্বের সম্মানকে প্রকারান্তরে ধূলায় নামাতে চায়, তা হলে তার অর্থ স্রেফ প্রচারের আলোয় আসা? ‘বড় রোল’ না পাওয়ার ক্ষোভ?
এখনো পর্যন্ত স্বরার খোলা চিঠির উত্তর দিয়েছেন ‘পদ্মাবত’ টিমের দুই সদস্য সিদ্ধার্থ এবং গরিমা। তারা ‘পদ্মাবত’ ছবির একটি গানের গীতিকার। সোশ্যাল মিডিয়ায় তারা বলেছেন, ‘যৌনতায় নারী-পুরুষের সমানাধিকার নিয়ে বিতর্কের অবকাশ আছে কি? একজন নারীর যোনি রয়েছে। যেটা জীবনের দরজা। তা তো কোনো পুরুষের থাকতে পারে না। যত চেষ্টাই করুক, পুরুষের যোনি থাকতে পারে না। এখানেই তো সমানাধিকারের প্রশ্নের সমাধান হয়ে গেল।’
ফের সরলীকরণ! কত সহজেই শতাব্দীর পর শতাব্দী চলে আসা বৈষম্য দূর হয়ে সমানাধিকারের প্রশ্নের সমাধান হয়ে যায়!
প্রায় আত্মকথনের ঢঙে স্বরা বলে চলেছেন, ‘কাউকে সতী বানানো আর কাউকে ধর্ষণ করা একই মানসিকতার এপিঠ-ওপিঠ। একজন ধর্ষক চেষ্টা করে মহিলাটির জননাঙ্গে আঘাত করতে, জোর করে পেনিট্রেট করতে, ছিন্নভিন্ন করে নিজের ক্ষমতা দেখাতে অথবা তাকে মেরে ফেলতে। সতী-জহরের সমর্থকেরা একজন নারীকে মেরে ফেলতে চায় কারণ তার যৌনাঙ্গের পুরুষ মালিকটি আর নেই। দুটো ক্ষেত্রেই চেষ্টা ও ভাবনাটা হলো, মেয়েদের শুধু যৌনাঙ্গের যোগফলে নামিয়ে রাখা।
এই বোধ কি শুধুই স্বরার? শুধুই বলিউডের এক উঠতি নায়িকার? না কি আরো বহু স্বরা ভাস্করের?
হাজার হোক, তারা তো আর ‘ছোট রোল’ চাইতে পরিচালকদের দরজায় দরজায় ঘোরেন না!
সূত্র : আনন্দবাজার