‘রাজাকারের’ ভাইয়ের নামে স্কুল, তোপের মুখে এমপি স্বপন

আপডেট: 12:47:30 04/06/2018



img
img
img

আনোয়ার হোসেন, মণিরামপুর (যশোর) : মণিরামপুরে কথিত এক রাজাকারের ভাইয়ের নামে স্থাপিত স্কুল উদ্বোধন নিয়ে সরকারি দলের মধ্যে চলছে চাপানউতোর। অটিস্টিক ও প্রতিবন্ধীদের জন্য স্থাপিত স্কুলটি গেল বৃহস্পতিবার উদ্বোধন করেন সংসদ সদস্য স্বপন ভট্টাচার্য্য।
স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়া স্বপন ভট্টাচার্য্য অবশ্য বলছেন, যার নামে স্কুল, তিনি রাজাকার ছিলেন কিনা তা তার (এমপির) জানা ছিল না। এছাড়া আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল নেতারা স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্য সুপারিশ করেছেন।
দলের একাংশের বক্তব্য, যেখানে স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে সেই স্থানটি মুক্তিযুদ্ধকালে টর্চার সেল হিসেবে ব্যবহার করতেন আফসার; মৃত এই ব্যক্তি রাজাকার ছিলেন বলে অনেকের অভিযোগ। স্কুলটি প্রতিষ্ঠার পেছনে প্রত্যক্ষ ভ‚মিকা রয়েছে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ইউসুফ আলী ও সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলামের।
কথিত রাজাকারের ভাইয়ের নামে স্কুল উদ্বোধন করে এখন দলের একাংশের আক্রমণের মুখে রয়েছেন সরকার দলীয় সংসদ সদস্য স্বপন ভট্টাচার্য্য। এমপির এমন কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে উপজেলা ছাত্রলীগ রোববার দুপুরে শহরে বিক্ষোভও দেখিয়েছে।
ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সম্পাদক আবুল বাসারের দাবি, শুধু আফসার আলী নয়, তার ভাই নেছার আলীও রাজাকার ছিলেন। আওয়ামী লীগ সমর্থিত স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আবুল হোসেনের দাবিও একই। চেয়ারম্যান বলেন, ‘বিষয়টি আগে থেকে আমি জানতে পারিনি। উদ্বোধনের দুই দিন আগে টের পেয়েছি। তখন বিভিন্ন মাধ্যমে এমপিকে বিষয়টি জানানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু তিনি তা উপেক্ষা করে স্কুল উদ্বোধন করেছেন।’
মুক্তিযোদ্ধা সংসদ উপজেলা কমান্ডের সাবেক কমান্ডার সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার (অব.) আলাউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আফসার আলী চিহ্নিত রাজাকার ছিলেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে তার ছোট ভাই নিছার আলী সম্পর্কে আমার ভালো জানা নেই।’
তিনি আরো বলেন, ‘একজন চিহ্নিত রাজাকারের বাড়িতে যদি আওয়ামী লীগের এমপি স্কুল উদ্বোধন করেন, সেটা মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অপমানের, লজ্জার। আমি এই কাজের তীব্র প্রতিবাদ করছি।’
মশ্মিমনগর ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান ও যশোর জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট এমএ গফুর সাংবাদিকদের বলেন, ‘নিছার আলী সরাসরি রাজাকার না হলেও মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে কাজ করেননি।’
তবে, নিছার আলী সম্পর্কে ভিন্নমত ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের। তাদের দাবি, নেছার আলী মোটেও রাজাকার ছিলেন না। তাদের পরিবার এখন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত।
কথিত রাজাকারের বাড়িতে স্থাপিত স্কুল উদ্বোধন করে তোপের মুখে পড়া এমপি স্বপন ভট্টাচার্য্য বলছেন, ‘নিছার উদ্দিন রাজাকার ছিল কিনা, সেটা আমার জানা ছিল না। স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাদের অনুরোধে আমি স্কুলটি উদ্বোধন করেছি। তাছাড়া যেখানে প্রধানমন্ত্রীর কন্যা পুতুল এই অটিস্টিক ও প্রতিবন্ধীদের জন্য স্কুলের পৃষ্ঠপোষক, যেখানে নিছার আলীর নামে স্কুল হোক সেই ব্যাপারে মণিরামপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি উপজেলা চেয়ারম্যান আমজাদ হোসেন লাভলু এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ফারুক হোসেনের স্বাক্ষর রয়েছে, সেখানে আমি স্কুল উদ্বোধন না করার কিছু দেখছি না।’
জানতে চাইলে মণিরামপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আমজাদ হোসেন লাভলু বলেন, ‘স্থানীয় মশ্মিমনগর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের নেতারা আমার কাছে অটিস্টিক ও প্রতিবন্ধীদের জন্য স্কুলটি হওয়ার জন্য সুপারিশের অনুরোধ করেছেন। তাদের অনুরোধে সুপারিশ করা হয়েছে। তাছাড়া যার নামে স্কুল হচ্ছে তার ব্যাপারে নেতৃবৃন্দ আমাকে স্পষ্ট করেননি।’
‘তবে যখন বিষয়টি প্রকাশ পেয়েছে, আমিও চাই ওই নামে যেন প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত না হয়,’ যোগ করেন লাভলু।
এই ব্যাপারে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ফারুক হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘পরে কথা বলছি।’
মশ্মিমনগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবুল হোসেন বলেন, ‘‘আমি দলের উপজেলা সেক্রেটারি ফারুক হোসেনের কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি বলেছেন, ‘নিছার আলী যে রাজাকার ছিলেন, বিষয়টি আমার জানা ছিল না।’’
এদিকে আন্দোলন-সমালোচনার মুখে অটিস্টিক ও প্রতিবন্ধী স্কুলটির নাম পরিবর্তন হওয়ার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। তবে বিধি অনুযায়ী সেটা হতে সময় দরকার বলে মশ্মিমনগর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের একটি পক্ষ জানিয়েছে। আর স্কুলের নাম পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে বলে জানিয়েছেন চেয়ারম্যান আবুল হোসেন। 
 
যেভাবে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করা হয়
কথিত রাজাকার আফসার আলী মোড়লের ছোটভাই মৃত নিছার আলীর ২০ শতক জমির ওপর নির্মাণ করা হয় ‘রান ডেভেলপমেন্ট নিছার আলী মেমোরিয়াল অটিস্টিক ও প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়’টি। স্থানীয়রা গত ২০ এপ্রিল সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন ‘রান ডেভেলপমেন্ট সোসাইটিতে’ ‘রান ডেভেলপমেন্ট নিছার আলী মেমোরিয়াল অটিস্টিক প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়’ স্থাপনের জন্য আবেদন করেন। আর এ আবেদনে সুপারিশ করেন উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আমজাদ হোসেন লাভলু ও সাধারণ সম্পাদক প্রভাষক ফারুক হোসেন। তাদের সুপারিশক্রমে রান ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের মহাসচিব গাউসুল আজম ওই প্রতিষ্ঠানটিতে পাঠদানের অনুমোদন দেন চলতি বছরের ১৬ এপ্রিল। সেই ভিত্তিতে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এটি পরিচালনায় ইতিমধ্যে গঠন করা হয়েছে ১১ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি। নিয়োগ করা হয়েছে ১২ জন শিক্ষক। স্কুলটিতে ৩১ জন অটিস্টিক ও প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে।

আরও পড়ুন