‘সাংবাদিকদের কমন সেন্স নেই’

আপডেট: 08:06:47 19/01/2019



img

মাগুরা প্রতিনিধি : ‘‘দেশে সাংবাদিক হিসেবে যারা লেখালেখি করতিছে, তাদের কোনো কমন সেন্সই নেই। লেহাপড়া শিখে সাংবাদিক হইছেন নাকি মাঠে-ঘাটতে আসে সাংবাদিকতা করতিছে; কোনো কিছু শুনলেই মনে করে মওকা পায়ে গিছি। এবার রাষ্ট্র স্বাধীন করে ফেলবো। সংবাদপত্র দেখে স্বাস্থ্য বিভাগের ডিজি সাহেব খুবই অবজ্ঞা করেন। উনি বলেন, সংবাদপত্রের কোন নিউজই সঠিক নয়। সাংবাদিকদের সম্পর্কে ডিজি সাহেবেরে ধারণা খুবই খারাপ। ডিজি সাহেবের সাথে আমার প্রায়ই কথা হয়। উনি বলেন, ‘সাংবাদিকদের কোন কথা শুনবেন না। আপনার দায়িত্ব আপনি পালন করেন।’’
সাংবাদিক ও গণমাধ্যম সম্পর্কে শনিবার দুপুরে এ ধরনের মন্তব্য করেন মাগুরা সদর হাসপাতাল থেকে সম্প্রতি অবসরে যাওয়া আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. মুক্তাদির রহমান।
গত ১৪ জানুয়ারি নিজে উপস্থিত না থেকে নার্সদের দিয়ে তার মালিকানাধীন ‘পলি ক্লিনিকে’ মাগুরা সদরের আবালপুর গ্রামের আব্দুর রাজ্জাকের স্ত্রী তনু বেগমের (৩৮) জরায়ু টিউমার অপারেশনের ব্যবস্থা করেছিলেন ওই ডাক্তার।
সে সময় নার্সরা ওই নারীর পেট কেটে জরায়ু ও টিউমারে অতিরিক্ত চর্বি দেখতে পেয়ে ভয়ে ডাক্তার মুক্তাদিরকে ফোন করেন। ডা. মুক্তাদির গিয়ে রোগীর অবস্থা খরাপ দেখে পেটে সেলাই দিয়ে দ্রুত ফরিদপুর ডায়াবেটিক হাসপাতালে রেফার করেন। ডায়াবেটিক হাসাপাতাল হয়ে বর্তমানে ওই নারী ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন।
ওই রোগিনীর স্বামী আব্দুর রাজ্জাকের অভিযোগের বিষয়ে মোবাইল ফোনে শনিবার দুপুরে স্থানীয় এক সাংবাদিক অতি বিনয়ের সঙ্গে তার বক্তব্য জানতে চাইলে ডাক্তার মুক্তাদির সাংবাদিক ও সংবাদপত্র সম্পর্কে এ ধরনের মন্তব্য করেন।
আব্দুর রাজ্জাক অভিযোগ করেন, তিনি ১৪ জানুয়ারি তার স্ত্রীর জরায়ৃুর সমস্যা নিয়ে ডাক্তার মুক্তাদির রহমানের কাছে পরামর্শ নিতে যান। ডাক্তার মুক্তাদির তাকে বলেন, ‘কোনো সমস্যা নেই। গাইনি বিশেষজ্ঞ ও সার্জন দিয়ে কালই অপরেশন করে রোগী সুস্থ করে দেবো।’
পরদিন তার পলি ক্লিনিকে নিজে উপস্থিত না থেকে ওটিতে পাঠিয়ে নার্সদের দিয়ে ওই রোগিনীর পেট কেটে জরায়ুর টিউমার অপারেশনের চেষ্টা করেন। কিন্তু রোগিনীর জরায়ু ও টিউমারে অতিরিক্ত চর্বি থাকায় নার্সরা ঘাবড়ে গিয়ে ডাক্তার মুক্তাদিরকে ফোন দেন। তিনি মিনিট ১৫ পরে এসে রোগিনীর অবস্থা খারাপ দেখে পেট সেলাই করতে নার্সদের নির্দেশ দেন। ওটি থেকে বেরিয়ে ডা. মুক্তাদির বলেন, ‘রোগীর অবস্থা ভালো না। দ্রæত ফরিদপুর ডায়াবেটিক হাসপাতালে নিয়ে যান।’
এর পরই তিনি ক্লিনিক ত্যাগ করেন। বাধ্য হয়ে আব্দুর রাজ্জাক তার স্ত্রীকে ফরিদপুর ডায়াবেটিক হ্সাপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু অবস্থা খারাপ বুঝে ডায়াবেটিক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রোগিনীকে সেখানে থেকে ফিরিয়ে দেন। পরে স্ত্রীকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন রাজ্জাক। বর্তমানে আশংকাজনক অবস্থায় সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ওই নারী।
আব্দুর রাজ্জাক ডা. মুক্তাদিরের উপযুক্ত বিচার দাবি করেন।
এদিকে, মাগুরা শহরের খানপাড়ার বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ডের জেলা যুগ্ম সম্পাদক ঠিকাদার সেলিম খান অভিযোগ করেন, অতি সম্প্রতি ডা. মুক্তাদির মাগুরা সদর হাসপাতাল থেকে অবসরে গেছেন। তবে ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। পাশাপাশি মাগুরা শহরে ক্লিনিক ব্যবসাও করেছেন নির্বিঘ্নে।
মাগুরা শহরের পলি ক্লিনিকের মালিক মুক্তদির রহমানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের অভিযোগ, নিজে ও দালালদের মাধ্যমে সরকারি হাসপাতালের রোগী ভাগিয়ে তার ক্লিনিকে নিয়ে অপারেশন করে চলেছেন। তিনি সার্জন না, সাধারণ মেডিকেল অফিসার। তবু রোগীদের শরীরে অস্ত্রোপচার করেন। ফলে তার হাতে মারা পড়া রোগীর সংখ্যা অনেক।
শুধু তা-ই না, সদর হাসপাতালে আরএমও হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে ব্যাপক ‘সার্টিফিকেট-বাণিজ্যের’ অভিযোগ ওঠে।
সেলিম খান বলেন, ‘এক সময়ের ইসলামী ছাত্রসংঘের সদস্য ডা. মুক্তাদিদের বাবা-চাচা রাজাকার ছিলেন। এক বড় ভাই একাত্তর সালে রাজাকার বাহিনীর কিলার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। স্কুলজীবনেই ডা. মুক্তাদির ওই বাহিনীর সদস্য হিসেবে বিভিন্ন হিন্দু বাড়িতে লুটপাট চালিয়েছেন। তার নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার বিচার চেয়েছি। কিন্তু কোনো ফল পাইনি। বরং দিনে দিনে ডাক্তার মুক্তাদির আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন।’
যোগাযোগ করা হলে ডাক্তার মুক্তাদির বলেন, সাংবাদিকদের সম্পর্কে তিনি ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডিজির যে কথা বলা হয়েছে, তা সবই সত্যি। সাংবাদিকরা ভালো না- এটাই সত্যি।
তিনি প্রশ্ন করেন, সাংবাদিকরা ভালো হলে সরকার কি ডিজিটাল আইন করতো? ‘সাংবাদিকদের শায়েস্তা করতেই সরকার এই আইন করেছে। সরকারেই তো সাংবাদিকদের ওপর আস্থা নেই। নিউজ করে যা পারেন করেনগে,’ বলেন এই ডাক্তার।
সার্জন না হয়েও শুধু মেডিকেল অফিসার হয়ে কেনো অপারেশন করেন?- এমন প্রশ্নে ডা. মুক্তাদির বলেন, ‘আমি অহংকার করে বলছি, আমার মতো সার্জন ফরিদপুর মেডিকেল কলেজেও একজন নেই।’
এ বিষয়ে সিভিল সার্জন ডা. মো. ছাদুল্লাহর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, ‘মাগুরা স্বাস্থ্য বিভাগের সাথে স্থানীয় সাংবাদিকদের সম্পর্ক অত্যন্ত চমৎকার। তবে কোনো চিকিৎসক যদি সাংবাদিকদের সাথে খারাপ আচরণ করেন, সেটা দুঃখজনক। ডিজি স্যারের নাম ব্যবহার করে তিনি (ডা. মুক্তাদির) যে মন্তব্য করেছেন, সেটি ঊর্ধ্বতন মহলে জানানো হবে।’

আরও পড়ুন