ফ্রাংকেনস্টাইনের ফাঁদ

আপডেট: 02:14:40 03/04/2017



img

আহসান কবির

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছুই বদলে যায়। ছোটবেলা আমরা বইতে পড়েছি—‘খোকা ঘুমালো পাড়া জুড়ালো বর্গী এলো দেশে/ বুলবুলিতে ধান খেয়েছে খাজনা দেব কিসে?’ ছড়াটা বদলে এখন যা হয়েছে তা এমন—‘ঝড় উঠলো বোমা ফুটলো জঙ্গি এলো দেশে/ আইএসেতে দেশ যে খাবে খাজনা দেব কিসে?’
অবশ্য অফিসিয়ালি আমরা বলতে পারি না, বাংলাদেশে আইএসের অস্তিত্ব আছে। তবে আইএস আমাদের মতো নয়। তারা বোমা ফাটানোর সঙ্গে-সঙ্গে দায় স্বীকার করে। ছড়া  বদলে যাওয়ার মতো এদেশে জঙ্গিদের কার্যক্রমের ধরন হয়তো খানিকটা বদলেছে। শুধু বদলায়নি সরকার বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের ভাষ্য। বিএনপি সরকারের আমলে অনেকদিন ধরে বলা হয়েছিল—বাংলাদেশে জঙ্গিদের অস্তিত্ব নেই। জঙ্গি আছে মিডিয়ায়!
আওয়ামী লীগ আমলে বলা হচ্ছে, জঙ্গি আছে, আইএস নেই! জঙ্গিদের এখন ডাকা হয় নব্য জেএমবি নামে (ধরুন একটা হোটেলের নাম জল খাবার। মালিকানা দুই ভাগে ভাগ হওয়ার পর এক ভাই জল খাবার নামটা রেখে দিল। আরেক ভাই পাশে যে নতুন হোটেলটা খুললো, তার নাম রাখলো নিউ জলখাবার, এমন আর কি!)
‘জন্মই আমার আজন্ম পাপ’-এর মতো মুসলিম জঙ্গিবাদের প্রথম আত্মপ্রকাশ আমেরিকার হাত ধরেই। তবে সবসময়ে ধর্মাশ্রয়ী দলই যে জঙ্গি বা উগ্র মতবাদের প্রচারক হবে কিংবা সহিংসতার বিষ ছড়াবে, এমন কোনও কথা নেই। চরম জাতীয়তাবাদী দল থেকেও এমন হতে পারে, অতীতে হয়েছে, ভবিষ্যৎও হয়তো বাদ যাবে না। হোক সেটা জাপানের রেড আর্মি কিংবা ক্লু ক্লাক্স ক্লান। হোক সেটা প্রভাকরনের তামিল টাইগার কিংবা হিটলারের অনুসারীরা।
১৯৭৯ সালের শেষে আফগানিস্তানে সোভিয়েত হামলা হলে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে মুসলিম মুজাহিদরা সেখানে জড়ো হন আফগানিস্তানিদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করতে।পাকিস্তান ও ইরান (ইরানে সেই বছরই শাহকে হটিয়ে ইমাম খোমেনি ক্ষমতাসীন হন) হয়ে আফগানিস্তানে যাওয়ার এই প্রচেষ্টা শুরু হলেও ইরান এই প্রচেষ্টা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয়। পরের বছর অর্থাৎ ১৯৮০ সালের শেষ দিকে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ইন্টার সার্ভিস ইন্টেলিজেন্স)-এর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে এবং আমেরিকা ও সিআইএর ইন্ধনে তালেবান ও হরকাতুল জেহাদ গড়ে ওঠে। আফগানিস্তানের যুদ্ধ শেষ হলে এই ইসলামি জঙ্গিবাদ আমেরিকা ও পাকিস্তানের ইন্ধনে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রফতানি করার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
কথিত ইসলামি মৌলবাদ যা কিনা আফগান স্টাইল বলে পরিচিত, বিপ্লবের নামে আফগানিস্তানটাই শুধু একবার দখল করতে পেরেছিল। ফ্রাংকেনস্টাইন গল্পের দৈত্য যেমন শেষমেষ তার স্রষ্টাকেই খুন করে বসে, পাকিস্তান ও আমেরিকার হাত ধরে গড়ে ওঠা এই ফ্রাংকেনস্টাইন আমেরিকা ও পাকিস্তানকেও তেমন ছাড়েনি। সে কথায় না হয় পরে আসা যাবে। সারাপৃথিবী কিংবা বাংলাদেশে তাদের কর্মকাণ্ড কেমন?
কোনও নিয়মতান্ত্রিক বিপ্লব কিংবা আন্দোলনের সঙ্গে আল কায়েদা, বোকো হারাম, আইএসরা কখনও যুক্ত ছিল না, এখনও নেই। এই তিন সংগঠনের বাইরে পাকিস্তানভিত্তিক মৌলবাদী সংগঠনের কার্যক্রমও প্রায় একই রকম, হোক সেটা লস্কর-ই তৈয়বা কিংবা অন্য কোনও সংগঠন। পাকিস্তানকে একটা সাক্ষাৎ দোজখ বানানো ছাড়া পাকিস্তানভিত্তিক মৌলবাদী সংগঠনগুলো বড়জোর আফগানিস্তান আর ভারতে বোমা হামলার ঘটনা ঘটায়। তবে সন্ত্রাস আসল উদ্দেশ্য হলেও প্রথম থেকেই আল-কায়েদা বা আইএস এক ধরনের নেতিবাচক আন্তর্জাতিকতায় বিশ্বাসী ছিল। ওসামা বিন লাদেন মাঝে মাঝেই লুকোনো কোনও জায়গা থেকে তার ভাষণের অডিও বা ভিডিও আল জাজিরা বা অন্য দুই একটা টেলিভিশনে প্রচারের জন্য পাঠাতেন। আফগানিস্তানে তালেবানরা ক্ষমতা হারালে আল-কায়েদা আবারও গুপ্ত সংগঠনে পরিণত হয়। সৌদি আরব আর আমেরিকার সঙ্গে ওসামা কিংবা আল-কায়েদার সম্পর্ক এক ধরনের গোলক ধাঁধার মধ্যেই আটকে আছে। আল-কায়েদার সঙ্গে আইএসের সম্পর্ক কেমন তা স্পষ্ট নয়। অনেকটাই ভেঙে পড়া আল-কায়েদার সদস্যরাই আইএস গড়ে তোলেনি। কেউ কেউ হয়তো যোগ দিয়েছে, কেউ আনুগত্য স্বীকার করেছে। তবে আল-কায়েদা যেমন নৃশংস কিছু শিরশ্ছেদের  ভিডিও প্রচার করতো, ঠিক তেমনি আইএসের ভিডিও প্রকাশ অব্যাহত আছে, অব্যাহত আছে এর নেতাদের জিহাদের আহ্বানসংবলিত ভিডিও প্রচারও। স্বভাবও এই দুই সংগঠনের প্রায় একই রকম। আফগানিস্তানে তারা হাজার বছর আগের বৌদ্ধ মূর্তি ধ্বংস করে আর আইএস সিরিয়ার পালমিরা শহর ধ্বংস করে। এই দুই সংগঠনের আক্রমণের টার্গেট এক। তাদের আক্রমণের শিকার বিদেশি ও অন্য ধর্মাবলম্বী, কোনও সিনেমা হল, নাইট ক্লাব কিংবা বার। আক্রমণের ধরনও এক। গাড়ি বোমা কিংবা আত্মঘাতী বোমা নিয়ে তারা টার্গেটের দিকে এগিয়ে যায়। আল-কায়েদা নারী ও শিশুদের ওপর তেমন আক্রমণ করেনি বললেই চলে। তবে আইএস যেকোনও মূল্যে তাদের টার্গেট ধ্বংস করতে মরিয়া হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশে আইএস থাকুক আর আল-কায়েদা থাকুক, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম থাকুক আর নব্য জেএমবি, শহীদ হামজা ব্রিগেড কিংবা হরকাতুল জেহাদ থাকুক তাদের কার্যক্রম সামান্য কিছুটা বদলেছে। ১৯৯৬ সালের ১৯ জানয়ারি একে-৪৭ ও আরও কিছু অস্ত্রসহ হরকাতুল জিহাদের  ৪১ জন কর্মী গ্রেফতার হয়েছিল। একতরফা ও একদলীয় ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের জন্য বিএনপিবিরোধী আন্দোলনে দেশ তখন উত্তাল। রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের ফাঁক গলে এই ৪১ জনের ভেতর ৩৪ জন জামিনে বেরিয়ে আবারও হরকাতুল জিহাদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন সময়ে গ্রেফতার হয়। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই ৪১ জনের বিরুদ্ধে দেওয়া মামলা দেখভাল করার জন্য জামায়াতুল মুজাহেদীনের শায়খ আব্দুর রহমান দায়িত্ব নিয়েছিলেন, পরবর্তী সময়ে যার ফাঁসি কার্যকর করা হয়। ১৯৯৯, ২০০০ ও ২০০১ সালে হরকাতুল জেহাদ দেশের মাঝে বড় ধরনের কয়েকটি ঘটনা ঘটায়। এর ভেতরে গির্জায় বোমা হামলা, সিনেমা হলে বোমা হামলা এবং রমনা বটমূলে বোমা হামলার ঘটনায় সারাদেশে তোলপাড় হয়। শেখ হাসিনার জনসভায়ও বোমা হামলা চালানো হয়েছিল।
এরপর তাদের ভেতর আত্মঘাতী হওয়ার প্রবণতা চোখে পড়ে। গাজীপুর ও চট্টগ্রাম আদালত প্রাঙ্গণে তারা আত্মঘাতী হামলা চালায়। ২০০৯ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত দেশে বোমা বা গ্রেনেড হামলার মতো বড় ধরনের কোনও ঘটনা না ঘটলেও অভিজিৎ রায়সহ ব্লগার হত্যা, কথিত ইমাম মাহদী, মাওলানা ফারুকী কিংবা খিজির খানের খুনের ঘটনাগুলো ছিল প্রায় একই ধরনের। তাদের হত্যার সময়  ছুরি ও চাপাতি ব্যবহার করা হয়েছিল। ইতালির নাগরিক তাভেল্লা সিজার ও জাপানি নাগরিক ওসি কুনিও হত্যার ব্যাপারটা লক্ষণীয়। জবাই করে হত্যার পরিবর্তে তাদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। তাও এক মোটরসাইকেলে তিনজন এবং তিনটে করে গুলি। ঢাকার গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার ধরন ছিল আলাদা। হলি আর্টিজানে বিদেশিদের গুলি করার পর জবাই করা হয়েছিল, কাউকে কাউকে নির্বিচারে কোপানো হয়েছিল। এরপর আবার আত্মঘাতী বোমা হামলার ঘটনা ঘটে ঢাকা এয়ারপোর্ট ও র্যা বের ব্যারাকে।
বাংলাদেশে নব্য জেএমবি বা আইএস অথবা আনসারউল্লাহ বাংলা টিম তাদের সন্ত্রাস বা হত্যার ধরন যেভাবেই বদলাক না কেন, শুরু থেকে উগ্র ধর্মবাদ ও জঙ্গিবাদের নামে আসলে সন্ত্রাসকেই চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। সীমাহীন ঘৃণা ও বিশ্বাসের বিষবাষ্পকে ভাইরাস হিসেবে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে তুলনামূলক কমবয়সী কিছু মানুষের ভেতর। পৃথিবীর সবকিছু তারা ধর্মের নামে বিচার করতে চায় বললেও তারা আসলে বোমা আর তরবারির নিচেই মানুষকে নিয়ে যেতে চায়। সভ্যতাকে তারা আসলে সিরিয়ার পালমিরা শহরের মতোই ধ্বংস করে ফেলতে চায়। তারা পৃথিবী ও মানুষকে নিয়ে যেতে চায় মধ্যযুগের বর্বরতায়। যেভাবে একদা ধর্মের নামে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল পৃথিবীর প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় খ্যাত নালন্দাকে।
এ সবের শেষ কোথায়? টিকটিকির লেজের মতো করেই এসব সংগঠনকে যেন তৈরি করা হয়েছিল। বার বার কেটে গেলেও যেমন টিকটিকির লেজ গজায়, নব্য জেএমবি বা আইএসরা কোনও না কোনোভাবে তেমন করে যেন ফিরে আসে। জীবনানন্দের কবিতার পঙ্ক্তি ‘সুচেতনা তুমি এক দূরতর দ্বীপ’-এর মতো আমেরিকা দূর থেকে এসব দেখে মজা পায়। আমেরিকা কবে ফ্রাংকেনস্টাইনের পাল্লায় পড়বে এই পৃথিবীর মানুষ যেন সেদিনের অপেক্ষায় আছে। আর এদেশে যারা নব্য জেএমবি কিংবা আইএসকে সমর্থন দেয়, তারা আসলে বাংলাদেশকেই চায় না। এই বাস্তবতার মাঝে ফ্রাংকেনস্টাইন বিষয়ক সেই পুরনো গল্পটা শুনে বিদায় নেই।
এক বিজ্ঞানী ইয়া বড় এক দৈত্য বানিয়েছেন। দশাশই ফিগার, কুচকুচে কালো গায়ের রঙ। আধুনিক সব অস্ত্র থাকে দৈত্যের পকেটের ভেতর। তবে দৈত্য নিজে কিছু করতে পারে না। রিমোট কন্ট্রোল টিপে দৈত্যকে নিয়ন্ত্রণ করেন বিজ্ঞানী। তো বিজ্ঞানী তার প্রিয় বন্ধুকে নিয়ে এলেন তার সৃষ্ট দৈত্য দেখাতে। বিজ্ঞানী তার বন্ধুকে নিয়ে বিজ্ঞানাগারে ঢোকা মাত্র হো হো করে হেসে উঠলো দৈত্য। বিজ্ঞানী খেয়াল করলেন দৈত্যটা রিমোট কন্ট্রোল হাতে এগিয়ে হাসছে। বিজ্ঞানীর বন্ধু ভয়ার্ত কণ্ঠে জানতে চাইলেন—এখন আমরা কী করব?
বিজ্ঞানী উত্তর দিলেন—এখন যা করার দৈত্যই করবে। দৈত্যের হাতে মরার আগে যতটুকু সময় পাই, শুধু হাত তুলে প্রার্থনা করতে পারব!
[লেখক : রম্যলেখক, মিডিয়াকর্মী। বাংলা ট্রিবিউন থেকে]