স্বল্পকালীন জোরালো যুগপৎ আন্দোলনের পথে বিরোধীরা

আপডেট: 01:02:10 13/08/2018



img

কাফি কামাল : নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন ও কারাবন্দি খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে আন্দোলনের রূপরেখা চূড়ান্ত করতে দলের নির্বাহী কমিটির সভা করবে বিএনপি। সবকিছু ঠিক থাকলে পবিত্র ঈদুল আজহার পর চলতি মাসের
শেষ সপ্তাহেই সভাটি ডাকা হবে। সে সভায় আগামী নির্বাচন ও কারাবন্দি চেয়ারপারসনের মুক্তির দাবিতে আন্দোলনের ধরন এবং বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের ব্যাপারে নেতাদের মতামত নেওয়া হবে। তার ভিত্তিতেই বিএনপির অবস্থান ও আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি চূড়ান্ত হবে। শনিবার দলের নীতিনির্ধারক ফোরামের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়। সেদিন মুলতবি হওয়া বৈঠকটি আজ বিকেলে ফের অনুষ্ঠিত হবে।
দলীয় সূত্র জানায়, চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিদেশে। এ অবস্থায় আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে যে কর্মকৌশল বা সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক না কেনো, তা দলের সকল পর্যায়ের নেতাদের মতামত নিয়েই করতে চান নীতিনির্ধারকরা। শীর্ষ দুই নেতার অনুপস্থিতিতে যে কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে ভুল ও সরকারের ফাঁদ এড়াতে সর্বস্তরের নেতাদের মতামত নিতেই নির্বাহী কমিটির এ সভা ডাকার সিদ্ধান্ত হয়।
বিএনপি চেয়ারপারসন কারাগারে যাওয়ার আগে ২০১৮ সালের ৩ জানুয়ারি সর্বশেষ দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির বৈঠক হয়।
বৈঠক সূত্র জানায়, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত দুই দিনব্যাপী মতবিনিময় সভায় জেলা ও মহানগর নেতারা যেসব মতামত ও পরামর্শ দিয়েছেন তা গুরুত্বের সঙ্গেই নিয়েছেন নীতিনির্ধারক ফোরাম। তাদের মতামতগুলোর সারসংক্ষেপ ইতিমধ্যে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানোর হয়েছে।
সূত্র জানায়, স্থায়ী কমিটির বৈঠকে অন্যতম প্রধান এজেন্ডা ছিল বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য। দেশের চলমান সংকট উত্তরণে দীর্ঘদিন ধরেই একটি জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে আসছে বিএনপি। কারাগারে যাওয়ার আগে খোদ ২০ দলীয় জোটের শীর্ষ নেত্রী খালেদা জিয়াই বারবার এ আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু বৃহত্তর রাজনীতিতে কিছু ইস্যু প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছিল বারবার। তবে সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মহাজোটের বাইরে থাকা বিভিন্ন মত ও পথের রাজনৈতিক দলগুলো উপলব্ধি করছে বর্তমান রাজনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের বিকল্প নেই। তারপর থেকেই রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে ইতিবাচক সাড়া মিলছে। পাশাপাশি সমপ্রতি দলের তৃণমূল নেতাদের মতবিনিময় সভা থেকেও তাগিদ এসেছে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের প্রক্রিয়া জোরদারের। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জোটের পক্ষ থেকে ইতিবাচক সাড়া এলেও থেকে যাচ্ছে কিছু প্রতিবন্ধকতা। সে জন্য নতুন একটি কৌশলে হাঁটছে বিএনপি।
নানা দল ও জোট নিয়ে বৃহত্তর প্লাটফরম নয়, বরং সংশ্লিষ্ট নানামহল থেকে আসছে ইস্যুভিত্তিক যুগপৎ আন্দোলনের প্রস্তাব। নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অংশগ্রহণমূলক, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের দাবিতে আন্দোলনে দ্বিমত নেই কারো। এক্ষেত্রে জোটের শরিক বা যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের নিয়েও নেই জটিলতা।
সূত্র জানায়, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের ইস্যুতে কারো দ্বিমত না থাকলেও তার সঙ্গে বিএনপি চেয়ারপারসনের মুক্তির দাবি যুক্ত করার ব্যাপারে এখনো কিছুটা দ্বিধা রয়েছে কোনো কোনো দলের। অন্যদিকে জোট বা বৃহত্তর প্লাটফরমের অতীতের কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখছে বিএনপি। এছাড়া বৃহত্তর জোট বা জোটের মোর্চা হলে সরকার সেখানে ভাঙন ধরানোর কৌশল নিতে পারে। সেটা হলে আন্দোলনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। কিন্তু যুগপৎ আন্দোলন করতে গিয়ে মাঝপথে কেউ সরে গেলেও খুব একটা প্রভাব পড়বে না। ফলে রাজনীতির বৃহত্তর স্বার্থে আপাতত ঐক্যের অংশটুকু নিয়েই এগোতে চায় বিএনপি।
দলটির নেতারা বলছেন, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি আদায় হলে খালেদা জিয়াকে কারাবন্দি করে রাখার সুযোগ থাকবে না সরকারের। আর খালেদা জিয়ার কারাভোগের বিনিময়ে যদি দেশে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ও সুষ্ঠু একটি নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার পরিবেশ তৈরি হয় সেক্ষেত্রে তাকে ছাড়া নির্বাচনে অংশগ্রহণের ব্যাপারে আপত্তি করবেন না বিএনপি চেয়ারপারসন।
ইতিমধ্যে তিনি তেমন ইঙ্গিতও দিয়েছেন।
তবে ২০ দলীয় জোটের বাইরে বৃহত্তর ঐক্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি দলের তরফে পরিষ্কার জানিয়ে দেওয়া হয়েছে তারা নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের পাশাপাশি খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে প্রস্তুত রয়েছেন। কারণ গণতন্ত্রের স্বার্থে আন্দোলনের কারণেই আজ তিনি কারাভোগ করছেন।
বৈঠক সূত্র জানায়, ২০ দলীয় জোটের শরিক দল জামায়াতের ব্যাপারে আপত্তি রয়েছে কিছু রাজনৈতিক দলের। জোটের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে সিলেট সিটি নির্বাচনে অংশগ্রহণের কারণে বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে ক্ষোভ। জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি নতুন করে ভাবার পরামর্শও দিয়েছে দলের তৃণমূল নেতারা। তবে সিলেট সিটি নির্বাচনে জামায়াতের স্বতন্ত্র নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়টি অন্য অর্থে ইতিবাচক হিসেবে বিবেচনা করছে বিএনপি। আগামীতে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক হবে ভোটের মাঠে নির্ণিত হওয়া জামায়াতের সত্যিকারের অবস্থান ও জনপ্রিয়তা। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, জোটের রাজনীতিতে দেনদরবারের সুযোগ নিজেরাই সংকুচিত করে ফেলেছে জামায়াত।
বিএনপি স্থায়ী কমিটির এক সদস্য বলেন, ২০ দলীয় জোটের ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে জামায়াত যে নেতিবাচক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তা আগামীতে বিএনপিকে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে।
বৈঠক সূত্র জানায়, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন ও খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে বিএনপি আন্দোলনে যাবে এখানে কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু সে আন্দোলনের দিনক্ষণ, ধরন ও গতিপ্রকৃতি কেমন হবে তা এখনো আলোচনার পর্যায়ে। জাতীয় নির্বাচনের তফসিলকে কেন্দ্র করে আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটতে পারে।
সরকারের চেহারা ও আচরণের ওপর নির্ভর করবে আন্দোলনের ধরন ও কৌশল। তবে একাধিক নেতা জানিয়েছেন, আন্দোলন হবে কার্যকর কর্মসূচির মাধ্যমে জোরালো কিন্তু স্বল্পকালীন। বিএনপি স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বলেন, আমরা বিড়াল তাড়িয়ে বাঘ ডেকে আনতে চাই না। আমাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হচ্ছে- গণতান্ত্রিক উপায়েই গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা।
সূত্র জানায়, আন্দোলনের প্রস্তুতির পাশাপাশি আলোচনার একটি পথও খোলা রাখবে বিএনপি। সেজন্য সরকার সংলাপের প্রস্তাব দিলে বিএনপির তরফে ইতিবাচক সাড়া দেয়া হবে। তবে সে সংলাপ হতে হবে সুনির্দিষ্ট এজেন্ডানির্ভর। সংলাপের টেবিলে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন ও খালেদা জিয়ার মুক্তির ব্যাপারে অনড় থাকবে বিএনপি।
সূত্র : মানবজমিন

আরও পড়ুন