জীবনসংগ্রাম একেই বলে

আপডেট: 03:33:07 19/02/2018



img

ঝিনাইদহ প্রতিনিধি : লড়াকু মেয়ে ফেরদৌসী খাতুন। মা-বাবা দু’জনকেই হারিয়েছিল ছোটবেলাতেই। একমাত্র বোন বিয়ের পর পৃথক সংসার করছেন। ছয় বছর আগে মায়ের মৃত্যুর পর যখন তিন বেলা খাবার জোটে না ফেরদৌসীর, তখন থেকেই অন্যের বাড়িতে পরিচারিকার কাজ করে। এতো প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও পড়ালেখা ছাড়েনি মেয়েটি। সে এখন ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর পৌর মহিলা ডিগ্রি কলেজের প্রথম বর্ষে পড়ছে।
ফেরদৌসী খাতুন জানায়, এক মাস হলো অন্যের বাড়িতে কাজ করা ছেড়ে দিয়েছে। এখন শহরের একটি মুদি দোকানের কর্মচারীর কাজ করে জীবন চালাচ্ছে। থাকে ওই দোকানের পাশেই একটি ছাত্রী মেসে। মাসে তিন হাজার টাকা বেতন। এতেই কোনো মতে লেখাপড়ার পাশাপাশি টিকে থাকার সংগ্রাম। আশা, পড়ালেখা শেষে নিশ্চয় একদিন ভালো চাকরি মিলবে।
ফেরদৌসী খাতুন (১৭) ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলার কুশনা গ্রামের মৃত হোসেন আলীর মেয়ে। তার বড় বোন রাজিয়া বেগমের বিয়ে হয়েছে ১৮ থেকে ১৯ বছর আগে। তখন তাদের বাবা বেঁচে ছিলেন। ফেরদৌসীর জন্মের বছরই মারা যান তার বাবা। এরপর মা শাহিদা বেগমের সঙ্গে মিলে চলছিল সংসার।  পাঁচ কাঠা জমির ওপর মাটির একটি বাড়িতে ছিল তাদের বসবাস। মা অন্যের বাড়িতে কাজ করতেন আর মেয়েকে পড়ালেখা করাতেন। মেয়ে ফেরদৌসীকেও মাঝে মধ্যে কাজে যেতে হতো। যা আয় হতো তা মায়ের হাতে তুলে দিতো ফেরদৌসী। মা ভীষণ কষ্টে সংসার চালানোর পাশাপাশি তাকে পড়িয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য ফেরদৌসীর। সে যখন পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী, তখন ব্লাড ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তার মা শাহিদা।
‘এরপর আমার সামনে ঘন কালো অন্ধকার। কী করবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। কিন্তু কোনোভাবেই হার মানতে চাইনি। এবার গৃহপরিচারিকার স্থায়ী কাজ নিলাম। সকালে কাজে চলে যেতাম। নয়টার মধ্যে ফিরে তারপর স্কুলে দৌড় দিতাম। কিন্তু গৃহপরিচারিকার কাজ গ্রামে মেলা মুশকিল। অনেক ভেবেচিন্তে চলে এলাম কোটচাঁদপুর শহরে। কুশনা মাধ্যমিক বিদ্যালয় ছেড়ে কোটচাঁদপুর শহরের একটি ডেন্টাল ক্লিনিকে কাজ পেলাম। ভর্তি হলাম কোটচাঁদপুর বালিকা বিদ্যালয়ে। ২০১৭ সালে এই স্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে জিপিএ-৪.২৭ পেয়ে পাস করলাম,’ জীবনসংগ্রামের কাহিনি এভাবেই বর্ণনা করছিল মেয়েটি।
ফেরদৌসী আরো জানায়, কোটচাঁদপুর পৌর মহিলা ডিগ্রি কলেজে এইচএসসি ভর্তি হয়ে শহরের একটি ছাত্রী মেসে ওঠে সে। কাজ নেয় ছেলেদের একটি মেসে রান্নার। গত ১ ডিসেম্বর পাশেই একটি মুদি দোকানে কাজ নিয়েছে সে। বাঁধন মালাকার নামে এক শিক্ষক তাকে এই দোকানে কাজটি দিয়েছেন। সকাল থেকে সেখানে কাজ করে আর মেসে ফিরে পড়ালেখায় মন দেয়। কলেজে ক্লাস করার সময় হয় না মেলায় প্রাইভেট শিক্ষকের কাছে পড়তে হয় তাকে।
ফেরদৌসী জানায়, এসএসসি পরীক্ষার আগে সাব্দার আলী আর নাসরিন সুলতানা নামে দুই শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়েছে সে। তারা কেউ কখনো টাকা নেননি ফেরদৌসীর কাছ থেকে। বর্তমানে জাহাঙ্গীর আলম, মনিরুজ্জামান ও হাবিবুর রহমান নামে তিন শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়ছে সে। তারাও কেউ টাকা নেন না। কলেজের ভর্তি ফরমে অভিভাবকের ঘরে লেখার মতো কোনো নাম পাচ্ছিল না ফেরদৌসী। তখন হাবিবুর রহমান নামে ওই শিক্ষক তার নিজের নাম বসিয়ে কলেজে ভর্তির ব্যবস্থা করেন এতিম মেয়েটিকে।
কলেজশিক্ষক হাবিবুর রহমান জানান, মেয়েটি খুবই অসহায়। তাই তিনি ভর্তি ও প্রাইভেট পড়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। একটু ভালোভাবে পড়ালেখা করতে পারলে সে ভালো ফল করতে পারবে- এমনটি আশা ওই শিক্ষকের।
ফেরদৌসী খাতুনের মেসের বান্ধবী ফাহমিদা ইসলাম ফেমাস জানায়, মেয়েটির কথা চিন্তা করে তারাও নানাভাবে সহযোগিতা করে। ভালো কোনো সহযোগিতা পেলে ফেরদৌসী আরো ভালো কিছু করতে পারতো বলে মনে করে ফেমাস।