সাতক্ষীরায় যুদ্ধাপরাধ মামলায় সাক্ষ্য দেওয়ায় হামলা!

আপডেট: 12:43:01 25/11/2017



img

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে সাক্ষ্য দেওয়ায় এক সাক্ষীকে পিটিয়ে হাত ভেঙে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে আশাশুনি উপজেলার পাইথালী বাজার এলাকায় এ হামলার ঘটনা ঘটে।
অভিযোগ, ওই সাক্ষী শুক্রবার সকাল ১১টার দিকে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে ভর্তি হলে সেখানে আবার হামলা হতে পারে- এমন খবরে তিনি দুপুরে পালিয়ে গেছেন।
আহতের নাম আকবর আলী (৬২)। তার বাড়ি আশাশুনি উপজেলার বুধহাটা গ্রামে।
এমামলার বাদী সাতক্ষীরা শহরের রাজারবাগান এলাকার মুক্তিযোদ্ধা আলাউদ্দিন সানা জানান, ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে মুক্তিযুদ্ধচলাকালে আশাশুনি উপজেলার চাপড়া গ্রামের সদরউদ্দিন সরদারের ছেলে লিয়াকত আলী (৭৫), তার ভাই মুজিবর রহমান সরদার (৭০) ও একই গ্রামের তাহের সরদারের ছেলে আবুল হাশেম সরদার (৬৮) রাজাকার বাহিনী গঠন করে চাপড়া গ্রামের আমিনউদ্দিন সরদারের বাড়িতে ক্যাম্প স্থাপন করেন। ওই ক্যাম্পে অবস্থানকারী প্রায় ৫০ জন রাজাকার লিয়াকত আলী, মুজিবর ও হাশেম সরদারের নির্দেশনায় হত্যা, খুন, ধর্ষণ, বাড়ি লুটপাট, অগ্নিসংযোগসহ বিভিন্ন অপকর্ম করতে থাকে। তাদেরই নির্দেশনায় উপজেলার স্বরাপপুর গ্রামের মনোহর দাশের ছেলে কৃষ্ণপদ দাশ, চণ্ডীচরণ দাশের ছেলে মেঘনাথ দাশ, একই গ্রামের তারাপদ দাশকে বাড়ি থেকে তুলে এনে কুল্ল্যা তিন রাস্তার মোড়ে দিনের বেলা প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে। একইভাবে লিয়াকত সরদারের নির্দেশে চাপড়া গ্রামের নিজামউদ্দিন সরদারের ছেলে আনিছুর রহমানকে গুলি করে হত্যা করা হয়। দয়ারঘাট গ্রামের গোরাচাঁদ ঠাকুরের মেয়ে নমিতারানি ঠাকুরকে অপহরণ করে ধর্ষণে বাধা দেওয়ায় বাবা ও মেয়েকে গুলি করে হত্যা করে। নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ে আশাশুনি গ্রামের আফতাবউদ্দিনের ছেলে আব্দুর রকিবের বাড়িতে হামলা ও লুটপাট শেষে অগ্নিসংযোগ করা হয়। একই গ্রামের আব্দুল হাকিমের ছেলে আব্দুর রাজ্জাককে ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়ে গুলি করে হত্যা করা হয়।
বাদীর অভিযোগ, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ওই বছরের ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত তারা আশাশুনির বিভিন্ন স্থানে নির্মম অত্যাচার চালান। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে তারা বিভিন্ন প্রভাব খাটিয়ে পূর্বের অপকর্ম ধামাচাপা দিয়ে বাঁচার চেষ্টা করেন। দীর্ঘ সময় পার হওয়ার পর তিনি বাধ্য হয়ে বিবেকের কারণে গত ৪ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরার আমলী আদালত-১ এ মামলা করেন। মামলায় 'রাজাকার কমান্ডার' লিয়াকত আলী সরদার, তার ভাই মুজিবর সরদার ও একই গ্রামের হাশেম সরদারকে আসামি করা হয়। এমামলায় সাতজনকে সাক্ষী করা হয়।
বিচারক হাবিবুল্লাহ মাহমুদ মামলাটি বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে ওকালতনামাসহ মামলার নথি বাদীকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য নির্দেশ দেন।
অভিযোগ করা হচ্ছে, খবর পেয়ে আসামিরা ওই মামলার সাক্ষী আবুল হোসেন, আব্দুর রকীব, সেলিম রেজা, আব্দুস সাত্তার, মিজানুর রহমান সানা ও রিয়াজউদ্দিন মোড়লকে হুমকি-ধামকি দিয়ে তাদেরকে আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য না দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করেন।
বাদী আরো বলছেন, গত ১১ সেপ্টেম্বর তিনি আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে গিয়ে মামলা দাখিল করেন। এতে সাতক্ষীরা আদালতে দায়ের করা মামলার একমাত্র সাক্ষী নুরুল ইসলাম বাবুলসহ আরো নতুন সাতজনকে সাক্ষী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বিচারক মামলাটি তদন্ত করে সিডিসহ প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন। এরই সূত্র ধরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুরালের সহকারী পরিচালক আব্দুর রাজ্জাক গত মঙ্গলবার ও বুধবার সাতক্ষীরা সার্কিট হাউজে এসে আটজন সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ করেন।
বাদী অভিযোগ করে বলেন, 'এই মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন এমন খবর পেয়ে বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে পাইথালী বাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে বুধহাটার আকবর আলীর (৬২) ওপর হামলা চালান আসামি হাশেম আলী সরদার, কবীর হোসেনসহ কয়েকজন। তারা লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে আকবর আলীর বাম হাত ভেঙে দেন। হামলায় তিনি মারাত্মক জখম হন। রাতে তাকে স্থানীয় চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। তারই পরামর্শে শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে আকবর আলীকে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
আকবর আলীর স্বজনরা জানান, মামলায় সাক্ষ্য দেওয়ায় তারাও হুমকির মুখে। অপর সাক্ষী সাদেক আলীকে হুমকি দেওয়ায় তিনি শুক্রবার দুপুর দুইটার দিকে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আকবর আলীকে জানালে তারা দুইজন মিলে হাসপাতাল ছেড়ে পালিয়ে যান।

আরও পড়ুন