সাতক্ষীরায় বই পরিবহনের টাকা যাচ্ছে কোথায়

আপডেট: 10:59:16 18/07/2018



img

আব্দুস সামাদ, সাতক্ষীরা : সাতক্ষীরায় মাধ্যমিক ও সমমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিনামূল্যে বিতরণের জন্য সরকারের সরবরাহ করা বই পরিবহনের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে স্ব-স্ব উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারদের বিরুদ্ধে। ২০১৩ সাল থেকে বিনামূল্যে বই বিতরণ করার জন্য বইপ্রতি পরিবহন খরচ বাবদ দেওয়া হয় ১৫ পয়সা। এই হিসেবে চলতি বছর বই পরিবহনের জন্য প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কাগজে-কলমে এ টাকা বিতরণ দেখিলে আত্মসাৎ করেছেন স্ব-স্ব উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার।
সাতক্ষীরা জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য কর্মকর্তা ও সহকারী পরিদর্শক মেহেদী হাসান জানান, জেলায় সরকারি-বেসরকারি স্কুল, দাখিল মাদরাসা ও ভোকেশনাল ইনসটিটিউটসহ ৬৩২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ করা হয়েছে। এ পাঠ্যবই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যন্ত পৌঁছাতে সরকার থেকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকা।
তিনি আরো জানান, সাতক্ষীরা সদর উপজেলায় ১৩২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঁচ লাখেরও বেশি বই বিতরণ করা হয়েছে। যা পরিবহনের জন্য বরাদ্দ ছিল প্রায় এক লাখ ৩০ হাজার টাকা। তালা উপজেলায় ১১৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চার লাখ ৭২ হাজার ৯০০টি বই বিতরণ করা হয়েছে। পরিবহন বাবদ বরাদ্দ ছিল ৭০ হাজার ২৫৩ টাকা। কলারোয়া উপজেলায় ৯০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তিন লাখ ৫৫ হাজার ৬১০টি বই বিতরণ করা হয়েছে। পরিবহন বাবদ বরাদ্দ ছিল ৫৩ হাজার ৩৩৩ টাকা। দেবহাটা উপজেলায় ২৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দুই লাখ নয় হাজার ১৫০টি বই বিতরণ করা হয়েছে। পরিবহন বাবদ বরাদ্দ ছিল ২৫ হাজার ১৪৭ টাকা। শ্যামনগর উপজেলায় ১০২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঁচ লাখ ১২ হাজার ৬৯০টি বই বিতরণ করা হয়েছে। পরিবহন বাবদ বরাদ্দ ছিল ৭৫ হাজার ৭২০ টাকা। আশাশুনি উপজেলায় ৯১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চার লাখ ৬০ হাজার ৮০০টি বই বিতরণ করা হয়েছে। পরিবহন বাবদ বরাদ্দ ছিল ৬৯ হাজার ২৮৫ টাকা। কালিগঞ্জ উপজেলায় ৭২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চার লাখ ২৩ হাজার ১৬০টি বই বিতরণ করা হয়েছে। তবে কালিগঞ্জ উপজেলায় বই পৌঁছাতে পরিবহন বাবদ কোনো বরাদ্দ আসেনি বলে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের উদ্ধৃতি দিয়ে তথ্য কর্মকর্তা জানিয়েছেন। সব মিলিয়ে জেলায় প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকা বরাদ্দের প্রায় সব টাকাই খরচ দেখানো হয়েছে বলেও তিনি নিশ্চিত করেছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বছরের শুরুতে শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দেওয়ার লক্ষ্যে সরকার বিনামূল্যে বই দিয়ে থেকে। এসব বই উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যন্ত নিতে সরকার বরাদ্দ দেয়। আগে বরাদ্দের এ টাকার চেক উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে আসতো। তিনি ওই টাকা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের মাধ্যমে বিতরণের জন্য বলে দিতেন। কিন্তু চলতি বছরের টাকা সরকার সরাসরি উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার বরাবর পাঠিয়েছে। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসাররা বরাদ্দের এ টাকা কাগজে-কলমে বিতরণ দেখিয়ে কয়েক বছর ধরে তা আত্মসাৎ করে আসছেন। কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানদের সঙ্গে কথা বলে এই তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানরা জানান, তারা কোনো দিন বই পরিবহনের টাকা পাননি। বই পরিবহনের জন্য বরাদ্দ আছে তাও তারা জানতেন না। তাই স্ব-স্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিবহন ব্যয় বহন করে বলে তারা জানান।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি ঝাউডাঙ্গা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রেজাউল ইসলাম বলেন, ‘আমার প্রতিষ্ঠানে প্রায় এক হাজার ২০০ শিক্ষার্থী আছে। আজ পর্যন্ত এদের বই আনার জন্য কোনো খরচ পাইনি। বরাদ্দ আছে কি না তা সঠিকভাবে আমরা বলতেও পারি না। প্রতি বছর বই পরিবহনের জন্য স্কুলের ফান্ড থেকে টাকা দেওয়া হয়।’
সাতক্ষীরা সদর উপজেলা মাদরাসা শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও খাদিজাতুল কোবরা মহিলা দাখিল মাদরাসার প্রধান শিক্ষক আব্দুর রউফ বলেন, ‘২০১৩ সাল থেকে আমরা বিনামূল্যে বই পাচ্ছি। বর্তমানে আমার এখানে ৩০০ ছাত্রী আছে। তাদের বই পরিবহনের জন্য আজ পর্যন্ত কোনো টাকা পাইনি। বরাদ্দ আছে কিনা তাও জানতাম না। এ বছর শুনছি বরাদ্দ আছে বই প্রতি ১৫ পয়সা। তবে সে টাকা আমাদের হাত পর্যন্ত আসেনি।
২০১৬ সালে সাতক্ষীরা সদর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার হিসেবে যোগ দেন মো. জাহিদুর রহমান। কিন্তু আজ পর্যন্ত পাঠ্যবই পরিবহনের কোনো টাকা বিতরণ করেননি তিনি। কাগজে-কলমে এ টাকা বিতরণ দেখিয়ে উল্টো দোষ চাপাচ্ছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসারের ওপর। তার ভাষ্য, এ টাকা আসে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে। তিনি এ খবর ভালো বলতে পারবেন। 
এ বছর তো আপনি বরাদ্দ পেয়েছেন- এমন কথা পাড়লে তিনি বলেন, ‘সময়মতো টাকা পৌঁছে যাবে। তবে, আপনাকে কে বলেছে আগে তা আমার জানা দরকার।’
তালা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মো. আতিয়ার রহমান বই পরিবহন খরচ না দেওয়ার অভিযোগ খানিকটা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, বই সমন্বয় করতে হলে অনেক সময় টাকা থাকে না। তারপর অফিসে খরচ আছে। সব খরচ করে যদি টাকা থাকে তবেই বিতরণ করা হয়।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার তহমিনা খাতুন বলেন, ‘এরকম কোনো বরাদ্দের কথা এ মুহূর্তে আমার জানা নেই। তবে খোঁজ-খবর নিয়ে বিষয়টি দেখবো।’
এ বিষয়ে জেলা শিক্ষা অফিসার আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘পাঠ্যবই বিতরণের জন্য টাকা বরাদ্দ আছে- আমি এটা জানি। তবে বরাদ্দের টাকা সরাসরি উপজেলায় আসে। উপজেলা পরিষদের একটি কমিটি আছে, যার প্রধান উপজেলা নির্বাহী অফিসার। তিনি অনুমোদন দিয়ে এ টাকা খরচ করান। এ বছর কার নামে টাকা এসেছে সেটি আমার জানা নাই। খোঁজ নিয়ে দেখতে হবে। তবে বরাদ্দের এ টাকা যদি বিতরণ না করে আত্মসাৎ করা হয়ে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

আরও পড়ুন