কলারোয়ায় ব্যাপকভাবে ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন

আপডেট: 07:00:14 16/11/2018



img

কে এম আনিছুর রহমান, কলারোয়া (সাতক্ষীরা) : কলারোয়ায় বছরে প্রায় ২০ লাখ টাকার ১৭০ টন পরিবেশবান্ধব জৈব সার ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদিত হচ্ছে। এতে বার্ষিক ছয় লাখ টাকার অধিক রাসায়নিক সার খরচ সাশ্রয় এবং ফসল উৎপাদন ২০% বেড়েছে।
কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি প্রচলনের শুরু থেকে কলারোয়ার জমিতে বছরে ৩-৪টি ফসল উৎপাদন করা হয়। সঙ্গে অনেক ক্ষেতে সাথী ফসলও থাকে। ক্রমান্বয়ে বছরে ৩-৪টি ফসল উৎপাদন এবং বেশি পরিমাণ রাসায়নিক সার ব্যবহারে জমির উর্বরা শক্তি দ্রুত কমছে। এতে জমি প্রায় জৈব পদার্থশূন্য হয়ে পড়ছে। ফলে ফসল উৎপাদন হ্রাসের সঙ্গে সঙ্গে ফসলে বিভিন্ন রোগ-বালাইয়ের প্রাদুর্ভাব দেখা দিচ্ছে। কিন্তু ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি এবং রোগ-বালাই থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য কৃষক ক্রমান্বয়ে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার বাড়িয়েই চলেছিলেন। এতে খরচ বাড়লেও ফসল উৎপাদন কোনোভাবে বাড়েনি। বরং রোগ-বালাই কৃষকের নিত্যসঙ্গী হয়ে পড়ছে। এতে প্রচণ্ড পরিশ্রমী কৃষক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।
এরকম বিপর্যস্ত কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থায় মো. মহসীন আলী নামে এক কৃষি কর্মকর্তা কলারোয়ায় যোগদান করেন। তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করে সমগ্র কলারোয়ার গ্রামগঞ্জের কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে প্রকৃত বিষয় অনুধাবন করেন। এরপর মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষায় পরিবেশবান্ধব ভার্মি কম্পোস্ট সার উৎপাদন ও ব্যবহার সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেন।
কৃষি কর্মকর্তা মো. মহসীন আলী জানান, কলারোয়ায় এসে দেখেন উত্তরণ নামে একটি এনজিও’র সহায়তায় এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে ২০১৫ সাল পর্যন্ত মাত্র দশটি ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন কেন্দ্র রয়েছে। তাদের বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা মাত্র দেড় টন। এই অবস্থায় তিনি ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে সাতক্ষীরা সদরের নেবাখালী থেকে এক হাজার ২০০ টাকা কেজি দরে দেড় কেজি কেঁচো এনে উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের আঙিনায় ১১টি চাড়ি বা নান্দায় ভার্মি কম্পোস্ট সার উৎপাদন শুরু করেন। ৬০ দিন পরে  ক্ষুদ্র আকারের এই ডিপো থেকে প্রথম পর্যায়ে ৪০ জন কৃষককে ভার্মি কম্পেস্টা উৎপাদনে বিনা মূল্যে আধা কেজি করে কেঁচো সরবরাহ শুরু করেন। পর্যায়ক্রমে এই ৪০ জন কৃষক ও উপজেলা সদর ডিপো থেকে বিনামূল্যে কেঁচো সরবরাহ করে বর্তমানে ৮৫০টি ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে। এখান থেকে বর্তমানে বার্ষিক ১৭০ টন ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদিত হচ্ছে; যার আর্থিক মূল্য প্রায় ২০ লাখ টাকা। এতে রাসায়নিক সার বাবদ বছরে ছয় লাখ টাকার বেশি সাশ্রয় হচ্ছে।
কৃষি কর্মকর্তা মো. মহসীন আলী আরো জানান,  গোবর আঙিনায় রেখে ২৫-৩০ দিন নাড়াচাড়া করে গন্ধমুক্ত করা হয়। কারণ দুর্গন্ধযুক্ত পচা গোবরের মধ্যে কেঁচো মারা যায়। এরপর চাড়ি বা নান্দায় দুর্গন্ধমুক্ত গোবর ভরে তার ভেতর কেঁচো ছেড়ে দেওয়া হয়। কেঁচো এই গোবর খেয়ে বিষ্ঠা ত্যাগ করে। কেঁচোর এই বিষ্ঠাই ভার্মি কম্পোস্ট। এই সার কৃষকরা নিজের ফসলে ব্যবহার ছাড়াও প্রতিবেশী কৃষককে উপহার দিচ্ছেন। এছাড়া সীমিত আকারে ভার্মি কম্পোস্ট বেচাকেনা শুরু হয়েছে।
বঙ্গবন্ধু কৃষি পদকপ্রাপ্ত কৃষক কলারোয়ার রামকৃষ্ণপুর গ্রামের ইউনুছ আলী জানান, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মহসীন আলীর উৎসাহে ২০১৬ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন শুরু করেন। বর্তমানে প্রতি মাসে তার চারটি চাড়ি বা নান্দা থেকে বার্ষিক প্রায় এক টন ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদিত হচ্ছে। এই ভার্মি কম্পোস্ট ধান, পাট এবং তরিতরকারি চাষে ব্যবহার করায় উৎপাদন আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় কমপক্ষে ২০ ভাগ বেড়েছে। আবার রাসায়নিক সার খরচ এক-তৃতীয়াংশ কমেছে।
চাষিরা বলছেন, ভার্মি কম্পোস্ট ব্যবহারের কারণে ফসলে রোগের প্রাদুর্ভাবও কমেছে। ফলে তারা বেশি লাভবান হচ্ছেন। সাফল্য দেখে অনেক কৃষক ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন শুরু করছেন স্বউদ্যোগে।

আরও পড়ুন