নবজাতকের স্বাস্থ্য : বাংলাদেশের অবস্থা ও করণীয়

আপডেট: 06:46:14 14/01/2018



img

ডা. রজত দাশগুপ্ত, ডা. ইয়ামিন মজুমদার, ডা. এএসএম শাহাব উদ্দিন

বাংলাদেশ বিশ্বের ৬২টি দেশের মধ্যে একটি যারা পাঁচ বছর বয়সের নিচের শিশুমৃত্যুর হার কমানোর জন্য সহস্রাব্দ উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা-৪ (মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল) অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। ১৯৯০ সালে বাংলাদেশে পাঁচ বছর বয়সের নিচের শিশুমৃত্যুর হার ছিল প্রতি হাজার জীবিত জন্মে ১৪৪; যা ২০১৪ সালে ৬৫ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ৪৬ জনে নেমে আসে। কিন্তু যে হারে পাঁচ বছর বয়সের নিচের শিশুমৃত্যুর হার হ্রাস পেয়েছে, সেই তুলনায় নবজাতকের (জন্মের ২৮ দিনের মধ্যে) মৃত্যুহার হ্রাস পেয়েছে অনেক কম। বর্তমানে দেশে পাঁচ বছর বয়সের নিচের যে সকল শিশু মারা যায় তার ৬১ শতাংশ নবজাতক। টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা (সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল) অর্জনের জন্য বাংলাদেশকে ২০৩০ সালের মধ্যে নবজাতকের মৃত্যুহার প্রতি হাজার জীবিত জন্মে ১২ জনে নামিয়ে আনতে হবে; যা বর্তমান হারের (২৮ জন) চেয়ে ৫৭ শতাংশ হ্রাসের সমতুল্য।
বাংলাদেশে নবজাতকের মৃত্যুর জন্য দায়ী প্রধান কারণগুলোর মধ্যে মারাত্মক সংক্রমণ, জন্মের সময় শ্বাস নিতে না পারা এবং অপরিণত জন্মজনিত জটিলতা অন্যতম। এই কারণগুলো প্রতিকারের জন্য সরকার ইতোমধ্যে কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। এই উদ্যোগগুলো বাস্তবায়নের জন্য দক্ষ সেবাদানকারীর হাতে প্রসব নিশ্চিত করা জরুরি। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো অর্ধেকের (৫০%) বেশি প্রসব হয় অদক্ষ ধাত্রীর হাতে।
বাংলাদেশে বর্তমানে নবজাতকের স্বাস্থ্যের অবস্থা, চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা এবং সামনের দিনগুলোতে দেশের প্রতিটি কোণায় কীভাবে নবজাতকের স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া যায়, সেই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করতে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যাক জেমস পি গ্র্যান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথের সেন্টার অব এক্সিলেন্স ফর দ্য সায়েন্স অব ইমপ্লিমেন্টেশন অ্যান্ড স্কেইল আপ গত ১৮ অক্টোবর ইউনিসেফের সহায়তায় ঢাকায় এক প্যানেল আলোচনার আয়োজন করে। 'বাংলাদেশে নবজাতকের স্বাস্থ্যসেবার মান' শীর্ষক এ আলোচনায় সরকার, বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা (ইউনিসেফ, ব্র্যাক, সেইভ দ্য চিলড্রেন, নিউট্রিশন ইন্টারন্যাশনাল, মেরি স্টোপস বাংলাদেশ) ও গবেষণা সংস্থার (আইসিডিডিআরবি, ব্র্যাক স্কুল অব পাবলিক হেলথ, জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ, সিআইপিআরবি) প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বক্তারা ২০৩০ সালের মধ্যে নবজাতকের মৃত্যুহার হ্রাস করে বাংলাদেশ কীভাবে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারে, সেই বিষয়ে আলোকপাত করেন। ওই আলোচনার আলোকে নবজাতকের স্বাস্থ্য সমস্যা ও করণীয় সম্পর্কে মতামত তুলে ধরতে চাই।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে গবেষণার মাধ্যমে প্রমাণিত কিছু সফল কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ সরকার বর্তমান স্বাস্থ্য, পুষ্টি এবং জনসংখ্যা উন্নয়ন কর্মসূচিতে নবজাতকের স্বাস্থ্য নিয়ে একটি বিশেষ প্রকল্প রেখেছে। গত শতকের নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে নবজাতকের স্বাস্থ্য কর্মসূচি পৃথক সেক্টর প্রোগ্রাম হিসেবে পরিকল্পনা করা হলেও নানা জটিলতার (Implementation Barrier) কারণে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। সেবা প্রদানের ওপর যতটা মনোযোগ দেওয়া হয়েছে, সেবা গ্রহণের ব্যাপারে অর্থাৎ সাধারণ জনগণের মাঝে নবজাতকের স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করার চেষ্টা সেইরকমভাবে পরিলক্ষিত হয়নি। নবজাতকের অত্যাবশ্যকীয় সেবা গ্রহণের হার বর্তমানে অনেক কম। অথচ জন্মের সঙ্গে সঙ্গে বুকের দুধ পান করানো, জন্মের পাঁচ মিনিটের ভেতর নবজাতকের শরীর মুছে শুকিয়ে রাখা, জন্মের পরের তিন দিন নবজাতককে গোসল না করানো, নবজাতকের নাভিতে কোনো কিছু না লাগানো এবং প্রসব ও নাভি কাটার ক্ষেত্রে নিরাপদ সামগ্রী ব্যবহার—এই পাঁচটি অত্যাবশ্যকীয় সেবা নিশ্চিত করতে পারলে নবজাতকের মৃত্যু অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিকার করা সম্ভব। এই সেবাগুলো বাসায় নবজাতকের বাবা মা কিংবা পরিবারের অন্য সদস্যদের দিয়েই দেওয়া সম্ভব। সচেতনতা সৃষ্টি করতে পারলেই এই ক্ষেত্রে সফলতা পাওয়া সম্ভব। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, নবজাতকের স্বাস্থ্যের সঙ্গে মায়ের স্বাস্থ্য ওতপ্রোতভাবে জড়িত। গর্ভকালীন সময়ে মায়ের নিয়মিত সেবা নিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ প্রসবের চিকিৎসার মান ভালো না হলে নবজাতকের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাই মাতৃস্বাস্থ্য ও নবজাতকের স্বাস্থ্যকে আলাদাভাবে না দেখে একই সঙ্গে সমন্বিতভাবে সেবা দেওয়া প্রয়োজন।
সরকারি পর্যায় ছাড়াও বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন এনজিও নবজাতকের সেবা প্রদান করে থাকে। সরকারি পর্যায় থেকে দেওয়া সেবার সঙ্গে এনজিওগুলোর এই কার্যক্রমগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধন করা দরকার। এই সমন্বয় সাধনের দায়িত্ব সরকারের ন্যাশনাল নিউবর্ন সেল নিতে পারে। সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে মানবসম্পদ, অর্থ এবং অন্য রিসোর্সগুলোর যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব।
বাংলাদেশে বেশিরভাগ নবজাতকের জন্ম বাড়িতে হয়। সেক্ষেত্রে মা বা নবজাতকের যদি কোনো জটিলতা দেখা দেয়, তখন তার চিকিৎসা দেওয়া দুরূহ হয়ে পড়ে। এছাড়া আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় রেফারেল নেটওয়ার্ক সুপ্রতিষ্ঠিত নয়। দুর্গম অঞ্চলে বাসা/বাড়ি থেকে হাসপাতালে যাতায়াত ব্যবস্থার মান খুবই খারাপ। এর ফলে প্রসবকালীন জটিলতাগুলোর ম্যানেজমেন্ট অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। আমাদের স্বাস্থ্য সচেতনতা বা কেয়ার সিকিং নির্ভর করে পরিবারের গুরুজনদের ওপর। বেশিরভাগ সময় দেখা যায়, শাশুড়ি, স্বামী বা বড় ননদ প্রসবকালীন সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে থাকেন। তাদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করলে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিরাপদ প্রসবের হারও বৃদ্ধি পাবে। জনমানুষের কাছে নবজাতকের স্বাস্থ্য সচেতনতা সৃষ্টির জন্য যথাযথ বিহেভিয়ার চেঞ্জ কমিউনিকেশন (বিসিসি) কর্মসূচির উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে বেসরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে মা ও নবজাতকের যে সেবা দেওয়া হয় এবং বিপুল পরিমাণ জনসাধারণ সেই সেবা গ্রহণ করেন তার গুণগত মান এবং অল্প খরচে যাতে জনসাধারণ তা গ্রহণ করতে পারে তা-ও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে নবজাতকের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রশিক্ষিত ধাত্রী বা মিডওয়াইফদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মিডওয়াইফদের ভূমিকা পর্যালোচনা করার সময় হয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে দেখা গেছে, মিডওয়াইফদের দিয়ে সেবিকাদের প্রথাগত কাজ করানো হয়। এতে করে স্বাস্থ্যখাতের জনবল অপচয় হচ্ছে। মিডওয়াইফদের মূল কাজ হচ্ছে—মা, নবজাতক ও শিশুকে নিবিড়ভাবে সেবা প্রদান করা। মা ও শিশুর সেবা ছাড়াও নারীর প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা, নারী ও শিশুর পুষ্টি, পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণে মিডওয়াইফরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকেন। মিডওয়াইফদের এই ভূমিকা বিশ্বের অনেক দেশেই মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু প্রতিকারে সহায়তা করেছে। এই জন্য নবজাতকদের স্বাস্থ্য কর্মসূচিতে মিডওয়াইফদের নিয়োগ দেওয়া উচিত। একই সঙ্গে নীতিনির্ধারণী মহলে মা, নবজাতক ও শিশুর সেবার ক্ষেত্রে মিডওয়াইফদের ভূমিকা নিয়ে অবহিত করা প্রয়োজন।
নবজাতকের স্বাস্থ্যসেবার টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন আরো প্রশিক্ষিত ও দক্ষ লোকবল, তৃণমূলে কমিউনিটিভিত্তিক সেবা, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ, উন্নয়ন সহযোগীদের সাহায্যের যথাযথ ব্যবহার করা। একই সঙ্গে গবেষণার ভূমিকাও অপরিহার্য। বাংলাদেশের সফল কিছু জনস্বাস্থ্য কর্মসূচি যেমন ওরাল রিহাইড্রেশন থেরাপি কর্মসূচি (ORS), পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি কিংবা সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (EPI) সফল হয়েছিল, তার মূলে ছিল কর্মসূচির পাশাপাশি গবেষণা। পূর্বের এই সফল কর্মসূচিগুলোর শিক্ষা নবজাতক স্বাস্থ্য কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নে সাহায্য করতে পারে। একটি কর্মসূচি বাস্তবায়নের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করার জন্য ইমপ্লিমেন্টেশন রিসার্চের ভূমিকা অনস্বীকার্য। ইমপ্লিমেন্টেশন রিসার্চের মাধ্যমে কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা এবং সেইসাথে সমস্যাগুলো সমাধানে বাস্তবসম্মত উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব। মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্যের জন্য ইমপ্লিমেন্টেশন রিসার্চের একটি ফ্রেমওয়ার্ক বা কাঠামো তৈরি করা যেতে পারে; যা পরে সরকার ও উন্নয়ন সহযোগীদের সাহায্য করবে। সকল খাতের সমন্বিত চেষ্টার মাধ্যমেই নবজাতকের মৃত্যু প্রতিরোধ করে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব।

লেখকত্রয় : ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যাক জেমস পি গ্র্যান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথের সেন্টার অব এক্সিলেন্স অন দ্য সায়েন্স অব ইমপ্লিমেন্টেশন অ্যান্ড স্কেইল আপ বিভাগে গবেষক হিসেবে কর্মরত