রাজনৈতিক বিবেচনায় আরো তিন নতুন ব্যাংক

আপডেট: 07:22:49 12/03/2018



সুবর্ণভূমি ডেস্ক : রাজনৈতিক বিবেচনায় লাইসেন্স পাওয়া ফারমার্স ব্যাংক যখন দেউলিয়ার পথে, ঠিক সেই সময় আরও আরও তিন নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার সব প্রস্তুতি প্রায় শেষ। কিছু দিনের মধ্যে এই ব্যাংকগুলো কার্যক্রম শুরু করতে পারবে। ব্যাংক তিনটি হচ্ছে বাংলা ব্যাংক, পিপলস ব্যাংক ও সিটিজেন ব্যাংক লিমিটেড। বাংলাদেশ ব্যাংক এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ এক কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের আগামী পর্ষদ সভায় নতুন ব্যাংকের বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। ওই দিনই নতুন ব্যাংকের অনুমোদনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হতে পারে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি পেলেই ব্যাংক তিনটি তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে।
দেশে বর্তমানে ৫৭টি বাণিজ্যিক ব্যাংক কার্যক্রম চালাচ্ছে। নতুন তিনটি যুক্ত হলে এই সংখ্যা দাঁড়াবে ৬০টিতে। এখানে উল্লেখ্য, নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স পাওয়া সরকারের ইচ্ছের ওপর নির্ভরশীল হলেও বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার ও ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার পুরোপুরি এখতিয়ার বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘বর্তমানে আর্থিক খাতে এক ধরনের অস্থিরতা চলছে। সুশাসন না থাকার কারণে ফারমার্স ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংক খারাপ পর্যায়ে চলে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন কোনও ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পক্ষে কোনও যুক্তি নেই। আরও তিনটি ব্যাংক যুক্ত হলে এই খাতে আরও বিশৃঙ্খলা বাড়তে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এ ক্ষেত্রে শক্ত হওয়া জরুরি।’ তিনি বলেন, অর্থনীতির প্রয়োজন ছাড়া অন্য কোনও বিবেচনায় ব্যাংক দেওয়া হলে তার পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ফারমার্স ব্যাংকের মতোই হতে পারে।
নতুন কোনও ব্যাংকের অনুমতি দেওয়া ঠিক হবে না বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদও। তিনি বলেন, ‘আগের ৯টি ব্যাংক নিয়েই প্রশ্ন আছে। ওই ব্যাংকগুলোর মধ্যে তিনটির অবস্থা খুবই খারাপ। ফারমার্স ব্যাংক তো গ্রাহকদের টাকা ফেরত দিতে পারছে না। এমন পরিস্থিতিতে  নতুন করে ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়াও ঠিক হবে না।’
এর আগে, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পরই নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দিতে উদ্যোগী হয়। শুরুর দিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের আপত্তি থাকলেও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ ব্যাংক পিছু হটে। পরে ফারমার্স ব্যাংকসহ নতুন ৯টি ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার ব্যবস্থা করে সরকার। এরও পরে অবশ্য বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে (বিজিবি) ‘সীমান্ত ব্যাংক’ নামের আরেকটি ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়া হয়।
এদিকে, রাজনৈতিক বিবেচনায় লাইসেন্স পাওয়া আগের ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর মতো ঘটনা ঘটেছে। নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলতে গিয়ে দু’টি ব্যাংক আর্থিক অনিয়ম ও ঋণ কেলেঙ্কারিতে ডুবতে বসেছে। এরই মধ্যে ফারমার্স ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করতে হয়েছে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীরকে। তা সত্ত্বেও বর্তমান মেয়াদের শেষ সময়ে সরকার আরও তিনটি ব্যাংকের লাইসেন্স দিতে চায়। পুলিশ ব্যাংক নামে আরেকটি ব্যাংকের লাইসেন্সের জন্যও সরকারের কাছে আবেদন জমা দেওয়া রয়েছে।
ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতার কারণেই সাম্প্রতিক সময়ে নতুন ব্যাংক দেওয়ার প্রশ্নে বাংলাদেশ ব্যাংক শুরুতে আপত্তি জানিয়েছিল। তবে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে আগেও তারা পিছু হটেছে, যার পুনরাবৃত্তি ঘটছে এবারও। এরই মধ্যে নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
এর আগে, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত নিজেই বলেছিলেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংক দেওয়া হয়েছে। এসব ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণেও অনেক ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তারপরও নতুন ব্যাংকের অনুমতি দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, দেশের অনেক এলাকাই ব্যাংক সেবার বাইরে। তাই নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে।

কারা পাচ্ছে নতুন ব্যাংক
বাংলা ব্যাংক লিমিটেডের প্রধান উদ্যোক্তা বেঙ্গল গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান মো. জসিম উদ্দিন। তিনি দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই’র সহ-সভাপতি ছিলেন। পিপলস ব্যাংকের প্রধান উদ্যোক্তা চট্টগ্রামের বাসিন্দা যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী এম এ কাশেম, যিনি যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি। আর সিটিজেন ব্যাংকের উদ্যোক্তা হচ্ছেন গার্মেন্টস ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ইকবাল।
গত বছরের শেষ দিকে বাংলা ও পিপলস ব্যাংককে লাইসেন্স দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে সুপারিশ করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। এখন সিটিজেন ব্যাংকের বিষয়ে অনুমোদন চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর দফতরে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে।
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সিটিজেন ব্যাংকের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর দফতরের সম্মতি পাওয়া গেলে ওই ব্যাংককের অনুমোদন দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে সুপারিশ করা হবে।
অবশ্য, এর আগে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে নতুন ব্যাংক হিসেবে সিটিজেন ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়া যায় কি না, সে বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মতামত চাওয়া হয়েছিল। সে সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়, সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতকে আরও সুশৃঙ্খল করার উদ্দেশ্যে ২০১৩ সালে ৯টি ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়া হয়। কিন্তু এই ব্যাংকগুলোর মূলধন পর্যাপ্ততার হার, সম্পদের ওপর মুনাফার হার ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে। শুধু তাই নয়, এসব ব্যাংকের ইক্যুইটি মূলধনের ওপর মুনাফার হারও সন্তোষজনক পর্যায়ে উন্নীত হয়নি। প্রথম কয়েক বছরের মধ্যেই কয়েকটি নতুন ব্যাংকের বিরূপ শ্রেণিকরণ ঋণের হার বেড়েছে। এগুলোর মধ্যে নতুন দু’টি ব্যাংকের পরিস্থিতি নাজুক হয়ে পড়ায় তাদের ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। শুধু তাই নয়, নতুন ব্যাংকগুলো লাইসেন্সের শর্ত পরিপালন করছে না বলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের মতামতে তুলে ধরা হয়।
এতে বলা হয়, তিন বছরের মধ্যে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) ইস্যু, মোট ঋণ ও অগ্রিমের অন্তত ৫ শতাংশ কৃষি ও পল্লীঋণ খাতে বিনিয়োগ করার ইত্যাদি শর্তে নতুন ব্যাংকগুলোকে অনুমতি দেওয়া হলেও ব্যাংকগুলো তা পরিপালন করতে সক্ষম হয়নি। এই প্রেক্ষাপটে ও বিরাজমান আর্থসামাজিক পরিস্থিতিতে এখন আরও নতুন বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের লাইসেন্স প্রদান আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য সহায়ক হবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে অনুমোদন পাওয়া বাংলা ব্যাংক লিমিটেড ও পিপলস ব্যাংকের চূড়ান্ত অনুমোদনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে ব্যবসায়িক পরিকল্পনা চাওয়া হয়েছে। নিয়ম অনুনযায়ী, নতুন ব্যাংক পেতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে কিছু শর্ত দেওয়া হবে। উদ্যোক্তা শর্ত পরিপালন করে তাদের ব্যবসায়িক পরিকল্পনা বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেবে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে তা যাচাই-বাছাই করে পরিচালনা পর্ষদের কাছে পুনরায় ‘টেবিল মেমো’ জমা দেবে। পরিচালনা পর্ষদ পুনরায় অনুমোদন দিলে ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হবে। এরপর ৪০০ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধন জোগাড় করে কার্যক্রম শুরু করতে পারবে নতুন ব্যাংক। সূত্র : বাংলা ট্রিবিউন

আরও পড়ুন