নবগঙ্গার গর্ভে পালপাড়া, হুমকিতে বাজারসহ বহু বসতবাড়ি

আপডেট: 03:36:20 16/08/2018



img
img
img

রূপক মুখার্জি, লোহাগড়া (নড়াইল) : টানা বৃষ্টি ও প্রবল স্রোতে প্রমত্তা নবগঙ্গার অব্যাহত ভাঙনে নড়াইলের কালিয়া উপজেলার নদী তীরবর্তী শুক্ত গ্রামের প্রায় ২০০ বছরের পুরনো পালপাড়া নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। নদী ভাঙনে প্রায় ৫০টি পাল পরিবারসহ শতাধিক পরিবার গৃহহীন হয়ে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছে। এছাড়া ভাঙনের হুমকির মুখে রয়েছে নদী তীরবর্তী ঐতিহ্যবাহী শুক্তগ্রাম বাজারসহ কয়েকশ’ পরিবারের বসতবাড়ি।
প্রতি বছরই বর্ষা মৌসুমে নবগঙ্গার পানি বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নদী ভাঙনের তীব্রতা বাড়ায় নদী তীরবর্তী অনেক গ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চলতি বর্ষা মৌসুমেও নদী তীরবর্তী শুক্তগ্রাম ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা পায়নি। নদীর শুক্ত গ্রাম পয়েন্টে অবৈধভাবে বালি উত্তোলন করায় এ বছর ভাঙনের তীব্রতা আরো বেড়েছে। এ এলাকায় বিভিন্ন সময়ে নদী ভাঙনে কয়েক হাজার হেক্টর ফসলি জমি ইতিমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। সহস্রাধিক পরিবার গৃহহারা হয়েছে। ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখিন হয়েছে লাখ লাখ টাকার ফলদ ও বনজ বৃক্ষ।
সরেজমিনে দেখা গেছে, নবগঙ্গার আগ্রাসনে শুক্তগ্রামের কুমারপাড়ার সব জায়গা-জমি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। গত ১৫ দিনের অব্যাহত ভাঙনে একে একে সবাই হারিয়েছে তাদের বাপ-দাদার ভিটেমাটি। যে যেভাবে পারছে বাড়িঘর ভেঙে সরিয়ে নিচ্ছে। রাতারাতি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে তাদের পারিবারিক মন্দির, কুমার শিল্পের চাকার ঘর, হাড়ি-কলসি পোড়ানের পাজা, নার্সারিসহ অসংখ্য ফলদ ও বনজ বৃক্ষ।
কালিয়া উপজেলার বাবরা-হাচলা ইউনিয়নের মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ও সাবেক ইউপি মেম্বর লায়েক হোসেন মোল্যা জানান, ওই গ্রামের অরুণ পাল, রতন পাল, কালিদাস পাল, মণিমোহন পাল, হরিদাস পাল, কার্তিক পাল, বিকাশ পাল, ঝন্টু পাল, লিমা বেগম, রতন শিকদার, হাসান শিকদার, আকবার খান, আকতার মণ্ডল, দীলিপ পাল, রবি পালসহ শুক্তগ্রাম বাজারের পুব পাশে অবস্থিত প্রায় পুরো এলাকাই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এভাবে আর কিছুদিন চলতে থাকলে ঐতিহ্যবাহী শুক্তগ্রাম বাজার ও কয়েকশ’ পরিবারের বসতবাড়িও বিলীন হয়ে যাবে।
শুক্তগ্রামের পালপাড়ার প্রবীণ ব্যক্তি ঝন্টু পাল (৭০) জানান, বাবার হাত ধরেই তিনি এ পেশায় এসেছেন প্রায় ৪৫ বছর আগে। স্ত্রী ও এক অন্ধ ছেলেসহ চার সন্তান এবং তাদের সন্তানসহ মোট ১১ জন সদস্য নিয়ে তার সংসার। ১৭ শতক জমিতে চারটি ছোট টিনের ঘর ও একটি মৃৎশিল্প তৈরির চাকা এবং পোড়ানের পাজা ছিল তাদের। তিনটি ঘর অন্যত্র সরিয়ে নিতে পারলেও বাকি সব নবগঙ্গায় বিলীন হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, তার কোনো সামর্থ নেই অন্যত্র জমি কিনে নতুন করে বাড়িঘর নির্মাণ করার। ১৫ দিন ধরে কাজ বন্ধ। যেসকল জিনিসপত্র তৈরি করা ছিল তাও সরাতে পারেননি। এই বৃদ্ধ বয়সে তিনি এখন কী করবেন সেকথা বলে অঝোরে কেঁদে উঠলেন।
নার্সারি ব্যবসায়ী বিলায়েত হোসেন মোল্যা জানালেন, তার ১৮ বিঘা জমির মাত্র বিঘা দুয়েক আছে। বাকি সবই সর্বনাশা নবগঙ্গা খেয়ে ফেলেছে। তার ওই জমিতে ছিল দুটি আমগাছের নার্সারি, দুটি মেহগনিগাছের নার্সারি, একটি আমবাগান এবং চারটি কুলের বাগান। সব হারিয়ে তিনি এখন পথের ভিখারি।
নড়াইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শাহ নেওয়াজ তালুকদার বলেন, ‘বিষয়টি আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে ভাঙনরোধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।’
নড়াইলের জেলা প্রশাসক মো. এমদাদুল হক চৌধুরী বলেন, ‘জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিবের সাথে কথা বলেছি। নবগঙ্গা নদীর ভাঙনকবলিত এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডকে ভূমি রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে।’
নড়াইল-১ আসনের এমপি মো. কবিরুল হক মুক্তি এ বিষয়ে বলেন, ‘বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আশা করি কর্তৃপক্ষ ভাঙনরোধে দ্রুত কাজ শুরু করবে।’

আরও পড়ুন