পশুহাটের কারণে সোমবার আধাবেলা স্কুল

আপডেট: 04:04:02 17/10/2017



img

তারেক মাহমুদ, কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) : ‘ভাই আজ সোমবার, গরুর হাট বসবে। তাই আধাবেলা ক্লাস হয়ে স্কুল ছুটি হয়ে গেছে’- কথাগুলো  কালীগঞ্জ উপজেলার গাজীরহাট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির এক ছাত্রের।
অরেক ছাত্র বলে উঠলো, ‘জানেন ভাই, অনেকদিন হলো স্কুলে সমাবেশ হয় না, জাতীয় সংগীতও হয় না। গরুর হাটের কারণে আমাদের স্কুল মাঠ ধুলো-কাদা আর গোবরে একাকার হয়ে থাকে সব সময়।’
সরেজমিনে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের মাঠে গরু-ছাগলে ভর্তি। পশুর জন্য জায়গা ছেড়ে দিতে হবে। যে কারণে আধাবেলা ক্লাস হয়ে স্কুল ছুটি হয়ে গেছে। ৫০ বছর ধরে প্রতি সোমবার এখানে একই অবস্থা বিরাজমান। এতে বিদ্যালয়ে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। খেলাধুলার পরিবেশ না থাকায় এলাকার ছেলে-মেয়েরা বিপথগামী পয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্কুল কর্তৃপক্ষ বলছেন, ১৯৬১ সালে প্রায় এক একর পাঁচ শতক জমির ওপর এই বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে ১৬ জন শিক্ষক, তিন জন কর্মচারী ও একজন গ্রন্থাগারিক রয়েছেন। শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৭০০। চারটি ভবনে ১৩টি শ্রেণিকক্ষ, দুইটি অফিসকক্ষ ও ছাত্রীদের জন্য একটি কমনরুম রয়েছে। প্রতি সোমবার সকাল ১০টা থেকে ২টা পর্যন্ত পাঠদান চলে। এর পর ছুটি।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রথম দিকে বাজার থেকে অনেক টাকা বিদ্যালয়কে দেওয়া হতো। যে কারণে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ গরু-ছাগলের হাট বসানোর অনুমতি দেন। যা আজো একইভাবে চলছে।
শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অভিযোগ, মাঠে পশুর হাট বসানোর কারণে বিদ্যালয়ে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। বৃষ্টি হলেই মাঠে কাদা জমে যায়। মাঠে খেলাধুলা তো দূরের কথা, চলাচল করাও কষ্টকর হয়ে পড়ে।
দেশের কোটি কোটি শিক্ষার্থী তথা তরুণ সমাজকে মাদক থেকে দূরে রাখতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মাঠে সবাই যেন খেলাধুলা করতে পারে, তা নিশ্চিত করতে সম্প্রতি মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রফেসর ড. এসএম ওয়াহিদুজ্জামান স্বাক্ষরিত একটি চিঠি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিবের কাছে পাঠানো হয়েছে।
কিন্তু ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী এ প্রতিষ্ঠানটিতে একটি বড় মাঠ থাকার পরও বিশেষ মহলের জন্য শিক্ষার্থীসহ এলাকার ছেলে-মেয়েরা খেলা করার সুযোগ পাচ্ছে না। ফলে উঠতি বয়সের এসব ছেলে-মেয়েরাদের বিপথগামী হওয়ার ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে বলে অভিভাবকরা অভিযোগ করছেন।
শিক্ষার্থীরা জানায়, মাঠে পশুর হাট বসানোর কারণে বিদ্যালয়ে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। বৃষ্টি হলেই মাঠে কাদা জমে যায়। তারা মাঠে খেলাধুলা করতে পারে না। অনেকদিন ধরেই বিদ্যালয়ের ক্লাস শুরুর আগে অ্যাসেম্বলি হয় না। তাই জাতীয় সংগীত পরিবেশন করাও বন্ধ হয়ে গেছে।
অভিভাবকরা জানান, বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি হাটের ইজারাদার হওয়ায় কেউ কোনো প্রতিবাদ করতে সাহস পান না। সরকার প্রতি বছর এই হাট থেকে প্রায় ৩০ লাখ টাকা রাজস্ব পায়। হাটটি এবারো ২৯ লাখ টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছে। তারপরও হাটটি বিদ্যালয় মাঠ থেকে সরানো হয় না। এছাড়া সভাপতির বিরুদ্ধে রয়েছে স্বেচ্ছাচারিতাসহ নানা ধরনের অভিযোগ।
এ সব বিষয়ে প্রধান শিক্ষক জালাল উদ্দিন বলেন, ‘স্কুল প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই এই গরুর হাট হয়ে আসছে। সে সময় স্কুলফান্ডে টাকা না থাকায় এলাকাবাসী হাটটি বসায়। এই গুরুহাটের টাকায় তখন শিক্ষকদের বেতনসহ স্কুলের যাবতীয় খরচ বহন করা হতো। স্কুলটি এমপিওভুক্ত হওয়ার পর থেকে এ হাট থেকে প্রতি বছর স্কুলফান্ডে কিছু টাকা আসতো। তবে সাগর বিশ্বাস স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হওয়ার পর থেকে এ হাট থেকে আগের তুলনায় বেশি টাকা স্কুলফান্ডে জমা হচ্ছে।’
এক প্রশ্নে তিনি স্বীকার করেন, মাঠে গরু-ছাগলের হাট বসানোর কারণে এবং বৃষ্টি হলেই মাঠে কাদা-ময়লা জমে যায়। যে কারণে সমাবেশ ও জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করাও সম্ভব হয় না।
তবে হাটের ইজারাদার ও বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি ওলিয়ার রহমান ওরফে সাগর বিশ্বাস হাটের কারণে বিদ্যালয়ের পাঠদানে কোনো সমস্যা হচ্ছে না বলে দাবি করেন।
তিনি বলেন, ‘হাটের জায়গায় হাট হচ্ছে আর স্কুলের জায়গায় স্কুল চলছে।’
অবশ্য পরে তিনি বলেন, ‘স্কুলমাঠের কিছু জায়গায় হাট বসছে। তাই হাট থেকে স্কুলফান্ডে টাকাও দেওয়া হচ্ছে। সপ্তাহের ছয় দিন সকাল ৯টা থেকে ৩টা পর্যন্ত বিদ্যালয়ে ক্লাস চলে। আর শুধু সোমবার গরুর হাটের কারণে সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত ক্লাস নেওয়া হয়। তবে এটা ঠিক, ছেলে-মেয়েরা বিদ্যালয়ের মাঠে খেলাধুলা করতে পারছে না।’
সাগর বিশ্বাসের দাবি, তিনি হাটের ইজারাদার ও বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হওয়ার পর থেকে প্রতি বছর হাট থেকে ৩০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয় বিদ্যালয়কে।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা কামরুজ্জামান গাজীরহাট মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে গরুর হাট বসার কথা স্বীকার করে বলেন, ‘স্কুলটির জন্মলগ্ন থেকে এই গরুর হাট চলে আসছে। তবে স্কুলমাঠে এই গরুর হাট বসানোটা ঠিক নয়। এ ব্যাপারে খুব তাড়াতাড়ি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তবে স্কুলটির ক্লাস শুরুর আগে অ্যাসেম্বলি হয় বা জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন কি না তা জানেন না শিক্ষা কর্মকর্তা।

আরও পড়ুন