সন্তানের পরিচয় দাবিতে কুমারী মায়ের লড়াই

আপডেট: 07:10:24 22/09/2017



img

আব্দুস সামাদ, সাতক্ষীরা : দেখতে দেখতে বয়স আড়াই বছর পার হয়ে গেছে। বিচার শালিস অনেক কিছুই তো হলো। অথচ মেয়ে মাহীর পিতৃত্বের দাবি পূরণ হয়নি আজো।
সন্তানের পিতৃপচিরয় দাবিতে শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী কুমারী মা আছিয়া খাতুন এখনো প্রশাসনের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরছেন। আছিয়া খাতুনের অভিযোগ, তাকে জোরপূর্বক পাশবিক নির্যাতনের পর শালিস-বিচারের নামে মাতবররা আসামির কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।
তার ভাষ্য, ‘আমরা টাকা নিইনি। আমরা মামলা করেছি। ডিএনএ টেস্ট রিপোর্ট নিয়েও জাল-জালিয়াতি হয়েছে। আমি আবার ডিএনও টেস্টের জন্য রক্ত দিয়েছি। এ রিপোর্ট কী হবে তা জানি না। আমি আমার মেয়ের পিতৃত্বের স্বীকৃতি চাই।’
আছিয়া খাতুন সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার আজিজপুর গ্রামের মোমিন গাজির মেয়ে।
আছিয়া খাতুন মেয়ে ও মা মসিরনকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবে। অস্পষ্ট বাচনভঙ্গিতে জানালেন নিজের কষ্টের কথা। আবেগে আপ্লুত হয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে আছিয়া জানান, ২০১৪ সালের ২৩ মে ভর দুপুরের কথা। বলেন, প্রতিবেশি নানি ফাতেমা খাতুন তাকে একই গ্রামের মোকছেদ আলির বাড়িতে নিয়ে যান। পরে কৌশলে একটি ঘরে মোকছেদ আলি (৪৮) ও তাকে ঢুকিয়ে দিয়ে বাইরে থেকে দরজায় শিকল লাগিয়ে দেন ফাতেমা খাতুন। এ সময় মোকছেদ আলি জোর করে তার ওপর পাশবিক নির্যাতন চালায়। এর ফলে কিছুদিন পর থেকে আছিয়ার শারীরিক অবস্থার পরিবর্তন দেখা দেয়। ডাক্তারি রিপোর্টে জানা যায়, আছিয়া অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েছেন। ওর বাবা বিষয়টি অভিযোগ আকারে স্থানীয় চেয়ারম্যান ও মেম্বারকে জানান। পরে মেম্বার আজগর আলির নেতৃত্বে এবং প্রতিবেশী মোজাম্মেল হক, আমির আলি ও আবদুল হামিদের উপস্থিতিতে শালিস বৈঠক হয়। সেখানে মোকছেদ আলিকে ধর্ষক সাব্যস্ত করে তাকে দুই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। জরিমানার ৫০ হাজার টাকা শালিসদার আবদুল হামিদ গ্রহণ করেন। শালিসের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তার গর্ভপাত করানোর জন্য চাপ প্রয়োগ করা হয়। কিন্তু আছিয়া, তার বাবা ও মা টাকা নিতে অসম্মতি জানান। তারা আছিয়ার গর্ভের সন্তান নষ্ট করতেও রাজি হননি।
অসহায় এই নারী জানান, পরে তার মামা সামজেদ হোসেন সাজু দেবহাটা থানায় একটি ধর্ষণ মামলা করেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক (এসআই) মেজবাহউদ্দিন মামলাটির চার্জশিট দেন। এতে ‘ধর্ষক’ মোকছেদ আলি ও সহযোগিতাকারী ফাতেমা খাতুনকে অভিযুক্ত করা হয়। পুলিশ ফাতেমাকে গ্রেফতার করে। ফাতেমা খাতুন তার জবানবন্দিতে ধর্ষণের ঘটনা তুলে ধরে স্বীকারোক্তি দেন।
মামলার বাদী আছিয়ার মামা সামজেদ হোসেন জানান, আসামিপক্ষের আবেদন অনুযায়ী ধর্ষিতা ও শিশুটির রক্ত ডিএনএ টেস্টে পাঠানো হয়। ডিএনএ টেস্টে নেগেটিভ রিপোর্ট আসায় আছিয়ার মেয়ের পিতৃত্বের দাবি ঝুলে যায়। এর ফলে দুই আসামিই খালাস পেয়ে যায়।
আছিয়ার মামা আরো বলেন, ‘আমি এই রিপোর্টে নারাজি দিয়েছি। সে অনুযায়ী দ্বিতীয় দফায় নিয়ম অনুযায়ী রক্ত দিয়েছে আছিয়া, তার মেয়ে মাহী ও আসামি মোকছেদ আলি। এখন পর্যন্ত এই রিপোর্ট সাতক্ষীরা আদালতে পৌঁছায়নি।’
আছিয়ার অভিযোগ, প্রথমে শালিসের নামে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। দ্বিতীয় দফায় ডিএনএ টেস্টে জাল জালিয়াতি করা হয়েছে।
পিতৃত্বের সঠিক পরিচয় নির্ধারণে এবারো এমন কোনো ঘটনা ঘটবে না তো?- এই প্রশ্ন প্রতিবন্ধী আছিয়া খাতুনের।

আরও পড়ুন