কর্তৃত্ব নিয়ে নির্বাচন কমিশনে বিরোধ

আপডেট: 01:52:08 28/09/2018



img

মঈনুল হক চৌধুরী : ‘একক কর্তৃত্ব’ নিয়ে কে এম নূরুল হুদা নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনে ফের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, ইসি সচিবালয়ের কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজের বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশন সচিব ছাড়া অন্য নির্বাচন কমিশনারকে অবহিত করা হয় না।
সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ‘নির্বাচন কমিশন সচিবালয় আইন ও নির্বাচন কমিশন সচিবালয় বিধিমালা’ যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না বলেও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন নির্বাচন কমিশনাররা।
নির্বাচন কমিশন সচিবকে সব ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আইন ও বিধি বিধান অনুসরণ করার তাগিদ দিয়ে সম্প্রতি একটি ‘আন-অফিসিয়াল (ইউও) নোট’ দেওয়া হয়েছে।
সেখানে বলা হয়েছে- “অনেক বিষয় কমিশনের অনুমোদনের জন্য উপস্থাপিত হয় না। যেমন – নির্বাচন সংশ্লিষ্ট জনবলের প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত কার্যক্রম- যথা দেশে বিদেশে প্রশিক্ষণ, সেমিনার, কর্মশালা সংক্রান্ত বিষয়। নির্বাচন সচিবালয় আইন এবং এ সংক্রান্ত বিধিমালার ব্যত্যয় ঘটিয়ে সচিবালয়ের কার্য সম্পাদন আইন ও বিধির পরিপন্থী।
“এসব মতামতের প্রেক্ষিতে আইন ও বিধির সব বিধি-বিধান প্রতিপালন করে সব কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলো।”
নির্বাচন কমিশনের যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে ওই ‘ইউও নোট’ এর অনুলিপি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকেও দেওয়া হয়েছে বলে জানান নির্বাচন কমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম।
তিনি বলেন, “আমি একা কোনো বিষয়ে কাজ করি না; আমরা সবাই মিলে এ নোট দিয়েছি। নির্বাচন সংক্রান্ত (ইসি সচিবালয়ের) গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আমাদের অবহিত করতে বলেছি।”
নির্বাচন কমিশন সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ কমিশনারদের পাঠানো ‘ইউও নোট’ পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন। তবে ‘একক কর্তৃত্ব’ নিয়ে অভিযোগের বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি।
এ বিষয়ে সিইসি কে এম নূরুল হুদার বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
২০০৯ সালে নির্বাচন কমিশন সচিবালয় আইন হওয়ার পর তখনকার এ টি এম শামসুল হুদার কমিশনের দুই নির্বাচন কমিশনার আইন সংশোধনের দাবিতে সরব হয়েছিলেন।
নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের আইনের ৫ ও ১৪ ধারায় ইসি সচিবালয়ের কর্তৃত্ব সিইসির ওপর অর্পণ করা হয়েছে। তাতে আপত্তি জানিয়ে নির্বাচন কমিশনার মুহাম্মদ ছহুল হোসাইন ও এম সাখাওয়াত হোসেন সে সময়ে বলেছিলেন, ওই ধারা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
এর পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ইসি সচিবালয়ের ওপর ‘সিইসির নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব’ প্রতিষ্ঠার জন্য সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব করেন তখনকার প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এটিএম শামসুল হুদা।
তার যুক্তি ছিল, ইসির কাজের বিষয়ে ৯০ শতাংশ সিদ্ধান্ত হয় কমিশনের সভায়। বাকি ১০ শতাংশ প্রশাসনিক কাজ সিইসির নিয়ন্ত্রণে সচিবের তত্ত্বাবধানে হয়। প্রশাসন পরিচালনা ও সমন্বয়ের স্বার্থে ইসি সচিবালয়ে একাধিক ব্যক্তি সমন্বয়ে গঠিত কমিশনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ‘সম্ভব নয় কিংবা প্রয়োজনীয় নয়’।
এরপর কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ নেতৃত্বাধীন ইসিতেও ক্ষমতার বিরোধ দেখা দিয়েছিল। কমিশনারদের মধ্যে কার পরে কে ফাইলে সই করবেন, সেই ক্রম নিয়ে আপত্তি তুলেছিলেন নির্বাচন কমিশনার মো. শাহনেওয়াজ।
কে এম নূরুল হুদা নেতৃত্বাধীন ইসি দায়িত্ব নেওয়ার দেড় বছরের মাথায় আবার ফিরে এলো একক কর্তৃত্বের বিতর্ক।
এবার এমন এক সময়ে বিষয়টি আলোচনায় এলো, যখন একাদশ সংসদ নির্বাচন আয়োজনের জন্য কমিশনের হাতে আছে আর মাস তিনেক সময়।
ইসি সচিবালয় আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়ে ইসি সচিবকে দেওয়া ইউও নোটে বলা হয়েছে, সংবিধানের ১১৮ (৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন সম্পূর্ণ স্বাধীন। আর ইসি সচিবালয় আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে ২০১০ সালে নির্বাচন কমিশন কার্যপ্রণালী বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে।
আইনের ৪ ধারা অনুযায়ী ইসি সচিবালয় কমিশনের প্রয়োজনীয় সব সাচিবিক দায়িত্ব পালন করবে এবং ইসি কর্তৃক আরোপিত যাবতীয় দায়িত্ব সম্পাদন করবে।
“কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে আইনি ও বিধির যথাযথ বাস্তবায়নে ব্যত্যয় পরিলক্ষিত হচ্ছে বলে প্রতীয়মান হয়।”
আইনের ৫ ধারায় বলা হয়েছে, সচিবালয়ের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ প্রধান নির্বাচন কমিশনারের উপর ন্যস্ত থাকবে এবং সচিব সচিবালয়ের প্রশাসনিক প্রধান হবেন।  তবে ইসি সচিবালয়ের নিয়ন্ত্রণ একক কোনো ব্যক্তির ওপর ন্যস্ত করা হয়নি এ আইনে।
আইনের ১৪ (১) ধারায় বলা হয়েছে- সচিবালয়ের দায়িত্ব সম্পাদনের জন্য সচিব প্রধান নির্বাচন কমিশনারের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনের কাছে দায়ী থাকবেন।
আইনের ১৪ (২) ধরায় বলা হয়েছে, ইসি সচিবালয়ের সব কর্মকর্তা-কর্মচারী নির্বাচন কমিশনের সার্বিক নিয়ন্ত্রণে সচিবের কাছে দায়ী থাকবেন। তবে এখানেও ‘একক নিয়ন্ত্রণে’ সচিবালয়ের কর্মকর্তারা কাজ করছেন বলে মন্তব্য করা হয়েছে ইউও নোটে।
বলা হয়েছে, কমিশনের নিয়ন্ত্রণে থাকা তো দূরের কথা, অনেক ক্ষেত্রে কমিশনের সব সদস্যকে সিদ্ধান্তের বিষয়ে অবহিতও করা হয় না।
আইনের ১৬ ধারায় বলা হয়েছে, ইসি সচিবালয়ের জন্য অনুমোদিত বাজেটের আওতায় অর্থ ব্যয় সংক্রান্ত চূড়ান্ত অনুমোদন নির্বাচন কমিশনই দেবে। কিন্তু এ বিষয়গুলো কখনোই কমিশনের অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হয়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে ইউও নোটে।
সেখানে বলা হয়, কমিশনের কাছে উপস্থাপিত বিষয়গুলো সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে নিষ্পত্তি করার বিধান থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তা লঙ্ঘিত হয়েছে।
এসব মতামতের প্রেক্ষিতে আইন ও বিধির সব বিধি-বিধান প্রতিপালন করে সব কার্যক্রম  পরিচালনার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে ইউও নোটে।
পাঁচ সদস্যের নির্বাচন কমিশনের আরেক সদস্য মাহবুব তালুকদার বলেন, “কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আমাদেরকে সব সময় অবহিত করতে এ সংক্রান্ত নোট দিয়েছি।  আশা করি আইন ও বিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হবে।”
সূত্র : বিডিনিউজ