সংবর্ধনা পেয়ে কাঁদলেন অন্ধ মুক্তিযোদ্ধা মান্নান

আপডেট: 02:09:23 20/07/2018



img
img

স্টাফ রিপোর্টার : সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে দাঁড়িয়ে অনুভ‚তি ব্যক্ত করতে গিয়ে অঝোর ধারায় কাঁদলেন মুক্তিযুদ্ধে দুই চোখ হারানো সাহসী যোদ্ধা আব্দুল মান্নান। কান্নাভেজা কণ্ঠে বললেন, ‘আমার আসলে আর কিছুই চাওয়ার নেই। শুধু মরার আগে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকায় নিজের নামটি রয়েছে- জেনে যেতে পারি। আপনারা যে সম্মান আজ আমাকে দিলেন, তা সারাজীবন স্মরণ করবো।’
শুক্রবার বেলা ১১টায় প্রেসক্লাব যশোর মিলনায়তনে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মান্নানকে ‘সুন্দর বাংলাদেশ চাই ফাউন্ডেশন’ (এসবিসি) নামে একটি সংগঠন এই সংবর্ধনা দেয়।
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক কাজী আনিসুজ্জামান আরজুর সভাপতিত্বে সম্মাননা ও সহযোগিতা প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন দৈনিক গ্রামের কাগজ সম্পাদক মবিনুল ইসলাম মবিন। অন্যদের মধ্যে বক্তৃতা করেন সংগঠনের উপদেষ্টা সাবেক সরকারি কর্মকর্তা মো. মুফাজ্জেল হোসেন, প্রেসক্লাবের দপ্তর সম্পাদক তৌহিদ জামান প্রমুখ।
অনুষ্ঠানে মবিনুল ইসলাম মবিন বলেন, ‘দেশের প্রতিটি অঞ্চলে অনেক মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন, যাদের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্তি হয়নি। তথ্য-উপাত্ত ঘেঁটে সাংবাদিকরা তা প্রকাশ করেন। তারই ধারাবাহিকতায় সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ, সংগঠন সহযোগিতার হাত বাড়ায়। আজ সুন্দর বাংলাদেশ চাই ফাউন্ডেশনও একই প্রক্রিয়ায় সুবিধাবঞ্চিত সেইসব মুক্তিযোদ্ধা কিংবা অবহেলিত মানুষের কল্যাণে হাত বাড়িয়েছে। এটি একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। আমরা চাই, এই ধারা অব্যাহত থাকুক। আব্দুল মান্নানের মতো আরো যেসব মহান মুক্তিযোদ্ধা অবহেলার শিকার হয়েছেন, সরকার তাদের প্রকৃত সম্মান দিক- এই প্রত্যাশা ও দাবি করছি।’
অনুষ্ঠানে অতিথিরা মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মান্নানের হাতে একটি সম্মাননা ক্রেস্ট এবং দশ হাজার টাকার প্রাইজবন্ড তুলে দেন। একইসঙ্গে তার নাম যাতে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় সন্নিবেশিত হয়, সেলক্ষ্যে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টার অঙ্গীকার করেন।

মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মান্নান
যশোর সদরের মুন্সেফপুর পশ্চিমপাড়ার বাসিন্দা। ১৯৫২ সালের ১ জানুয়ারি জন্ম এই সাহসী যোদ্ধা যখন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন, তখন তার বয়স ছিল ১৯ বছর।
ছয় ভাইবোনের মধ্যে সবার বড় আব্দুল মান্নানের বাবা খুলনায় ইস্টার্ন জুটমিলে চাকরি করতেন। ১৯৭১ সালের জুন মাসে তিনি হঠাৎ করেই বাড়িছাড়া হয়ে যান।
ওইসময় তার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু মথুরাপুরের মোশাররফকে নরেন্দ্রপুর এলাকার জল্লাদ আফসার নামে এক রাজাকার বন্দুকের বাট দিয়ে মারে এবং শাসায়- মুক্তিবাহিনীতে গেলে মেরে ফেলবে। এই ঘটনাটি মান্নানের মনে দাগ কাটে। মা-বাবা কিংবা বন্ধু মোশাররফকে না জানিয়ে তিনি মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেন।
তার প্রশিক্ষক ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল ওহাব মিন্টু। যশোর সদরের একডালা-বটতলা এলাকায় তিনি তরুণ যোদ্ধা রেজা কাজী, ফরিদ, শান্তি, আব্দুল মান্নানসহ ১৫-১৬ জনকে রাইফেল চালনা থেকে শুরু করে ক্রলিং, সেফটিনেট, গ্রেনেড নিক্ষেপ ইত্যাদির প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।
এখানে প্রশিক্ষণ নিয়ে মান্নান সোজা ভারতে চলে যান। বনগাঁর চাপাবাড়িয়া ট্রেনিং ক্যাম্পে অস্ত্রের প্রশিক্ষণ নেন।
ট্রেনিং শেষে দেশে ফেরার পর তার বাবা বলেন, ‘অবস্থা খুব খারাপ, তুই অন্য কোথাও চলে যা। এরপর ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল আজিজ নামে এক আত্মীয়ের মাধ্যমে ফের ভারতে গিয়ে আরেকদফা প্রশিক্ষণ নেন।’
নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ে কমান্ডার আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে তাদের ১১ জনের একটি দলকে দেশে পাঠানো হয়। ওই মাসের শেষের দিকে সকালে কোটচাঁদপুর এলাকার শুভদির মাঠে তারা অ্যাম্বুশ করেন। পাকিস্তানি সেনারা খুলনা থেকে দর্শনার দিকে ট্রেনে যাবে- এমন সংবাদ এসেছিল সোর্সের মাধ্যমে। ইতিমধ্যে সেখানকার একটি ব্রিজের আশপাশ রেকিও করা হয়েছে।
মান্নানদের উদ্দেশ্য ছিল, ব্রিজটাকে ট্রেনসহ উড়িয়ে দেওয়া। তারা দুজন বসে আছেন কাটিম চার্জ করার জন্যে। মূল দায়িত্ব ছিল মহেশপুর উপজেলার চোরকোল এলাকার এক মুক্তিযোদ্ধার (নাম স্মরণ করতে পারেননি)। কিন্তু ট্রেনটি বেশ কাছাকাছি এলেও সে ঠিকমতো তারে সংযোগ দিতে পারছিল না।
মান্নান বলেন, ‘তাকে সরিয়ে দিয়ে আমি তারের নেগেটিভ-পজেটিভ সংযোগ করতে সমর্থ হই। ঠিক সেই মুহূর্তে ট্রেনটি ব্রিজের উপরেই পৌঁছে। সেদিন ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে।’
তিনি বলেন, ‘নারিকেলবাড়িয়ার মুসাভাই ও আমি আখক্ষেতের মধ্যে গুলিতে আহত এক পাকিস্তানি সেনাকে ঘিরে ফেলি। তিনি পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন; কিন্তু রাইফেলটি ডান হাতে ধরে রেখেছিলেন। আমরা দুইজন তার হাত থেকে রাইফেলটি কেড়ে নিতে পারছিলাম না। পরে রাইফেলের বাট দিয়ে পিটিয়ে তাকে হত্যা করে পরে অস্ত্রটি নিয়ে যাই।’
৬ ডিসেম্বর কমান্ডার আনোয়ার হোসেন, ডেপুটি কমান্ডার লতার নেতৃত্বে চুয়াডাঙ্গার উথলিতে অবস্থান নেন আব্দুল মান্নান, বরিশালের হানিফ, নারকেলবাড়িয়ার মুসা, উথলির মান্নানসহ (২) ১১ জন।
উথলির একটি শালবাগান। বিকেল পাঁচটা থেকে পাকিস্তানিদের সঙ্গে গুলি বিনিময় হয়। প্রচণ্ড এই লড়াইয়ে তাদের কারোরই বেঁচে থাকার কথা ছিল না। কমান্ডার আনোয়ারের কাছ থেকে তার দূরত্ব ছিল ৫০ গজের মতো। হঠাৎ পাকিস্তানিদের একটি গ্রেনেডের আঘাতে সেখানেই শহীদ হন কমান্ডার আনোয়ার। আর সেই সময়ই কী যেন লাগে মান্নানের মুখমণ্ডলে। কপালে, মুখের নিচে এবং দু’চোখে খুব জ্বালা-যন্ত্রণা শুরু হয়। এরপর আর কিছু মনে নেই। পরে জানতে পারেন, দর্শনার একটি গোপন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে তাকে ভর্তি করা হয়েছে। এরপর থেকে দু’চোখে আর কিছুই দেখতে পান না তিনি।
মান্নান বলেন, ‘যখন যেখানে ছিলাম- তারা যে কাগজপত্র দিয়েছে, তা রেখে দিই। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হওয়ার পর আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। অনেক কাগজপত্র হারিয়ে গেছে। বঙ্গবন্ধু নেই, তাই স্বীকৃতিও পাবো না- এমন বিশ্বাসই ছিল। কিন্তু ১৯৯৬ সালে তার মেয়ে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় আমার আশা জাগ্রত হয়। যাচাই বাছাইতে আমার নাম তালিকাভুক্ত হওয়ার কথা থাকলেও কেনো যে বাদ পড়লো, জানি না। অনেক চেষ্টা করেও কিছুই করতে পারিনি। এরপর ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুক্তিযোদ্ধাদের কথা নতুন করে ভাবেন। তালিকা থেকে যারা বাদ পড়েছেন তাদের নিবন্ধনের ঘোষণা দেন। সংবাদ পেয়ে ওই বছরের ১৭ জুন নিবন্ধন করি। মনে হয়েছে, এবার হয়তো আমার কপালটা খুলতে পারে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে তা আর হওয়ার নয়।’
বছর ২৫ আগে মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মান্নান বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হন। দুই ছেলেমেয়ে। মেয়েটার বিয়ে হয়ে গেছে। ছেলে মাসুম বিল্লাহ (১৭) ঢাকায় দর্জির কাজ করে।
সংসার চলছে স্ত্রী রাশিদা বেগমের দৈনন্দিন মজুরির টাকায়। তিনি স্থানীয় একটি পানের বরজে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন; মজুরি এক-দেড়শ’ টাকা।

আরও পড়ুন