ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে পুলিশের অসীম ক্ষমতা

আপডেট: 02:28:05 20/04/2018



img

এম এ নোমান : প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৪৩ ধারায় পুলিশকে আদালতের পরোয়ানা ছাড়াই তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেফতারের ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। আইনটি মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হয়েছে। বর্তমানে এটি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে যাচাই-বাচাই হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার সরকারের তিন মন্ত্রীর বৈঠকে সংবাদপত্রের সম্পাদকদের সংগঠন বাংলাদেশ সম্পাদক পরিষদ প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের যে ছয়টি ধারা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে, তার মধ্যে একটি হলো এই ৪৩ ধারা। বাকিগুলো হচ্ছে- ২১, ২৫, ২৮, ৩১ ও ৩২।
বৈঠকে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমদ পলক উপস্থিত ছিলেন। অপরদিকে ১২ জন সম্পাদক তাদের অভিমত তুলে ধরেন। বৈঠক শেষে সম্পাদক পরিষদের  সাধারণ সম্পাদক ও দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম আপত্তিগুলোর কথা জানান।
আরেকটি ব্রিফিংয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হকও  সম্পাদক পরিষদ প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের যেসব ধারা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তা যৌক্তিক বলে মন্তব্য করেন।  এবং সম্পাদকরা এগুলো পরিবর্তনের যে দাবি জানিয়েছে তাও যৌক্তিক বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আইনমন্ত্রী আরো বলেন, ‘আমরা এই আইনটি করেছি ডিজিটাল নিরাপত্তার জন্য। এখন আইনটির ছয়টি ধারা নিয়ে সম্পাদক পরিষদ আপত্তি পেশ করেছে। আইনটি জাতীয় সংসদে পেশ করা হয়েছে। এখন সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। আগামী ২২ তারিখে আইসিটি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। ওই বৈঠকে সম্পাদক পরিষদের প্রতিনিধিদলকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য আমি তাদের (স্থায়ী কমিটি) বলব। তাদের (সম্পাদক পরিষদ) অংশ গ্রহণ যাতে নিশ্চিত করা হয় সেই ব্যাপারে আমি ব্যবস্থা গ্রহণ করব। সম্পাদক পরিষদকে ওই বৈঠকে একটি লিখিত প্রস্তাব নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেছি। আশা করি, তাদের এই প্রস্তাব সংসদীয় স্থায়ী কমিটি আমলে নিয়ে প্রতিকারের ব্যবস্থা করবে।’
এর আগে গত ১৯ জানুয়ারি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খসড়া অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। এর পর থেকে জাতীয় আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা এ আইনের খসড়া নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছে। সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের ১১টি দেশের ঢাকায় নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতরা আইনমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এই আইনের কয়েকটি ধারা নিয়ে প্রবল আপত্তি পেশ করেন। এরই মধ্যে আইনটি পাস করার জন্য জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করে আইসিটি মন্ত্রণালয়।
তবে প্রস্তাবিত আইনের অন্যান্য ধারাগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হলেও ৪৩ ধারা নিয়ে তেমনটা হয়নি।

কী আছে ৪৩ ধারায়
প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৪৩ ধারার শিরোনাম দেওয়া হয়েছে, ‘পরোয়ানা ব্যতিরেকে তল্লাসি, জব্দ ও গ্রেফতার’।
এতে বলা হয়েছে, “(১) যদি কোনো পুলিশ কর্মকর্তার এইরূপ বিশ্বাস করিবার কারণ থাকে যে কোনো স্থানে এই আইনের অধীন কোনো অপরাধ সংঘটিত হইয়াছে বা হইতেছে বা হইবার সম্ভাবনা রহিয়াছে বা সাক্ষ্য প্রমাণাদি হারানো, নষ্ট হওয়া, মুছিয়া ফেলা, পরিবর্তন বা অন্য কোনো উপায়ে দুষ্প্রাপ্য হইবার বা করিবার সম্ভাবনা রহিয়াছে, তাহা হইলে তিনি, অনুরূপ বিশ্বাসের কারণ লিপিবব্ধ করিয়া, নিম্নরূপ কার্য সম্পাদন করিতে পারিবেন, --
(ক) উক্ত স্থানে প্রবেশ করিয়া তল্লাশি এবং প্রবেশে বাধাপ্রাপ্ত হইলে ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ;
(খ) উক্ত স্থানে তল্লাশিকালে প্রাপ্ত অপরাধ সংঘটনে ব্যবহার্য কম্পিউটার, কম্পিউটার সিস্টেম, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, তথ্য-উপাত্ত বা অন্যান্য সরঞ্জামাদি এবং অপরাধ প্রমাণে সহায়ক কোনো দলিল জব্ধকরণ;
(গ) উক্ত স্থানে উপস্থিত যে কোনো ব্যক্তির দেহ তল্লাশি;
(ঘ) উক্ত স্থানে উপস্থিত কোনো ব্যক্তি এই আইনের অধীন কোনো অপরাধ করিয়াছেন বা করিতেছেন বলিয়া সন্দেহ হইলে উক্ত ব্যক্তিকে গ্রেফতার।’’
আইনের খসড়ার একই ধারার দুই নম্বর উপধারায় বলা হয়েছে, ‘উপধারা (১) এর অধীন তল্লাশি সম্পন্ন করিবার পর পুলিশ কর্মকর্তা তল্লাশি পরিচালনার রিপোর্ট ট্রাইব্যুনালের নিকট দাখিল করিবেন।’

আর যে পাঁচটি ধারায় সম্পাদকদের আপত্তি
২১ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি ডিজিটাল মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বা জাতির পিতার বিরুদ্ধে প্রপাগাণ্ডা, প্রচারণা ও মদদ দিলে সর্বোচ্চ শাস্তি ১৪ বছরের কারাদণ্ড; জরিমানা ৫০ লাখ টাকা।
২৫ ধারায় আছে, যদি কোনো ব্যক্তি ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে ইচ্ছাকৃতভাবে বা অজ্ঞাতসারে, এমন কোনো তথ্য প্রেরণ করে যা আক্রমণাত্মক বা ভীতি প্রদর্শকমূলক তাহলে তিনি অনধিক তিন বৎসর কারাদণ্ডে বা অনধিক  তিন লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
২৮ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ইচ্ছাকৃতভাবে বা জ্ঞাতসারে ধর্মীয় মূল্যবোধ বা অনুভূতিতে আঘাত করে এমন কিছু ডিজিটাল মাধ্যমে প্রচার করে, তাহলে সর্বোচ্চ দশ বছরের সাজা। জরিমানা ২০ লাখ টাকা।
৩১ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন, যা বিভিন্ন শ্রেণি বা সম্প্রদায়ের মধ্যে শত্রুতা, ঘৃণা বা বিদ্বেষ সৃষ্টি করে বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটায়, তাহলে তা ডিজিটাল অপরাধ। এই অপরাধের জন্য সাত বছরের কারাদণ্ড বা পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
৩২ ধারা, এতে বলা হয়েছে, ‘যদি কোনো ব্যক্তি বেআইনি প্রবেশের মাধ্যমে কোনো সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বিধিবদ্ধ সংস্থার কোনো গোপনীয় বা অতি গোপনীয় তথ্য-উপাত্ত কম্পিউটার বা ডিজিটাল ডিভাইস বা কম্পিউটার নেটওয়ারর্কে ধারণ, প্রেরণ, সংরক্ষণ করেন বা করতে সহায়তা করেন তাহলে সেটা হবে গুপ্তচরবৃত্তির অপরাধ।’
এ ছাড়া সম্পাদক পরিষদ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৪৩ ধারা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
সূত্র : এনটিভি

আরও পড়ুন