চৌগাছায় কর্মসৃজন প্রকল্পে অনিয়ম চলছেই

আপডেট: 08:47:37 23/05/2018



img

চৌগাছা (যশোর) প্রতিনিধি : চৌগাছায় অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসৃজন প্রকল্পের (৪০ দিনের) প্রায় দুই কোটি টাকার বড় অংশ নয়-ছয়ের অভিযোগের বিষয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদে ১৯ এপ্রিল শনিবার প্রেসক্লাব যশোরে সংবাদ সম্মেলন করেন চৌগাছার সাত ইউপি চেয়ারম্যান। সেখানে তারা সাংবাদিকদের আহ্বান জানান ফের সরেজমিনে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনের জন্য।
সেই অনুযায়ী রোববার থেকে বুধবার পর্যন্ত সরেজমিন পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণ করা হয় সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নগুলোর প্রকল্প এলাকা। দেখা যায়, পরিস্থিতির ইতরবিশেষ ঘটেনি। লুটপাট, দুর্নীতি, ফাঁকিবাজি চলছে আগের মতোই।
এর আগে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা নূরুল ইসলাম সরেজমিন পরিদর্শন শেষে ‘অনিয়মের সত্যতা’ পেয়েছেন বলে সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেছিলেন।
এতকিছুর পরও থেমে থাকেনি অনিয়ম। ২৯ দিন কাজ শেষের পর উপজেলা শহরের পাশের কিছু প্রকল্প এলাকা এবং ইউনিয়ন পরিষদের আশপাশের দু-একটি প্রকল্পের সাইটে বুধবার সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছেমাত্র।
বুধবার পেটভরা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, ১৪ জন শ্রমিক কাজ করছেন। তবে এদিন সেখানে সাইনবোর্ড পাওয়া গেছে। এবিষয়ে ওই ওয়ার্ডের মেম্বার মোস্তাক আহমেদ দাবি করেন, ২০ জন কাজ করছেন। তবে বাস্তবের সঙ্গে তার কথার মিল পাওয়া যায়নি।
রোববার উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের নারায়ণপুর ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, তিনটি গ্রাম- নারায়ণপুর, ইলিশমারী, ভগবানপুরের তিন জায়গায় কাজ চলছে। ওয়ার্ডটিতে মোট ৪৩ জন শ্রমিক কাজ করার কথা। নারায়ণপুর গ্রামে কাজ করছেন ১৪ জন, ভগবানপুরে ছয়জন। এখানকার শ্রমিক সর্দার ইউসুফ আলী। তিনি নিজেও ছিলেন না কাজের সাইটে। নারায়ণপুর গ্রামের শ্রমিকরা জানান, তারা নিয়মিত ১৫ জন কাজ করছেন। অন্য শ্রমিকরা কাজ করছেন না কেনো- জানতে চাইলে তারা বলেন, এটা তারা বলতে পারবেন না।
একই ইউনিয়নের বাদেখানপুর গ্রামের প্রকল্পে কাজ করার কথা ২৯ জন শ্রমিককে। রোববার বেলা ঠিক ১২টার সময় গিয়ে কোনো শ্রমিককে পাওয়া যায়নি। পরে একজন শ্রমিকের বাড়িতে গিয়ে তার সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘আমরা নিয়মিত ১৮ জন এখানে কাজ করছি। আজ এইমাত্র কাজ ছেড়ে বাড়িতে চলে এসেছি।’
হাজিরা খাতায় সব শ্রমিককে হাজির দেখানো হয়েছে বলে দেখা যায়।
একই ইউনিয়নের পেটভরা ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, ২০ জন শ্রমিক কাজ করার কথা থাকলেও ১৪ জন কাজ করছেন। এখানকার শ্রমিকরা জানান, তারা নিয়মিত ১৫ জন কাজ করছেন। বাকি পাঁচজনের কথা জানতে চাইলে বলেন, ওগুলো মেম্বার জানেন। তবে ওই সব প্রকল্পের কোনো সাইটেই রোববার সাইনবোর্ড দেখা যায়নি।
একইদিন স্বরূপদাহ ইউনিয়নের খড়িঞ্চা গ্রামে গিয়ে কোনো শ্রমিককে কাজ করতে দেখা যায়নি। ইউপি সদস্য মমিনুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, শ্রমিকরা কর্মকারপাড়ায় কাজ করছে। তবে কর্মকারপাড়ায় গিয়ে কোনো শ্রমিককে কাজে পাওয়া যায়নি। পরে ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে দেখা যায়, মেম্বার পরিষদে রয়েছেন।
একই ইউনিয়নের টেঙ্গুরপুর-আন্ধারকোটা গ্রামে গিয়েও কোনো শ্রমিক পাওয়া যায়নি। গ্রামের লোকজন জানান, এখানে মাঝে-মধ্যে ৫-৭ জন কাজ করেন। এই প্রকল্পে ৩০ জন শ্রমিক কাজ করার কথা। অধিকাংশ দিনই কাজ হয় না। এই ওয়ার্ডের মেম্বার জাকির হোসেন ইউনিয়নের এক নম্বর প্যানেল মেয়র।
এরপর ইউনিয়ন পরিষদ-সংলগ্ন স্বরূপদাহ ওয়ার্ডে গিয়ে পাঁচজন শ্রমিককে কাজ করতে দেখা যায়। এই প্রকল্পে ৩০ জন শ্রমিকের কাজ করার কথা। তবে চেষ্টা করেও ওই ওয়ার্ডের মেম্বার ফখরুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। আর ইউপি চেয়ারম্যান শেখ আনোয়ার হোসেন সংবাদ প্রকাশ না করতে অনুরোধ করেন।
সোমবার উপজেলার পাতিবিলা ইউনিয়নের পাতিবিলা গ্রামের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান সহিদুল ইসলাম মিয়ার বাড়ির সামনে কাজ করছিলেন ছয় শ্রমিক। সেখানে কাজ করার কথা ১৮ জন। বুধবার ওই প্রকল্পে সাতজন শ্রমিক কাজ করতে দেখা গেছে। এদের মধ্যে দুইজন ভিক্ষুক শ্রমিক।
তবে একই ইউনিয়নের নিয়ামতপুর গ্রামে ২০ জন শ্রমিককেই কাজ করতে দেখা গেছে। সেখানে ২০ জনেরই কাজ করার কথা।
একই ইউনিয়নের চার নম্বর ওয়ার্ডের প্রকল্পে ১২ জন শ্রমিকের স্থলে দশজনকে কাজ করতে দেখা যায়।
মঙ্গলবার সিংহঝুলী ইউনিয়নের আট নম্বর ওয়ার্ডের হুদা ফতেপুর গ্রামে গিয়ে ১৪ জনের স্থানে চারজনকে কাজ করতে দেখা গেছে। একই ইউনিয়নে চার ওয়ার্ডের জগন্নাথপুর পশ্চিমপাড়া ওয়ার্ডে ১৪ জনের স্থানে ছয়জন এবং পাঁচ নম্বর ওয়ার্ডের জগন্নাথপুর পূর্বপাড়া ওয়ার্ডে ১৪ জন শ্রমিক কাজ করার কথা থাকলেও কাউকে কাজ করতে দেখা যায়নি।
বুধবার একই ইউনিয়নের এক নম্বর ওয়ার্ডের মসিয়ূরনগর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, ১৪ জন শ্রমিকের স্থলে আটজন কাজ করছেন। তবে এই ওয়ার্ডে বুধবার সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে।
ধুলিয়ানি ইউনিয়নের বিভিন্ন ওয়ার্ডে সরেজমিন ঘুরেও অনিয়মের নানা চিত্র পাওয়া গেছে। একই অবস্থা সুখপুকুরিয়া ইউনিয়নের বর্ণি, নগরবর্ণি, আন্দুলিয়া, বল্লভপুর, দৌলতপুর, পুড়াপাড়াসহ সবকয়টি ওয়ার্ড এবং হাকিমপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন ওয়ার্ডে। এসকল প্রকল্প এলাকার ভিডিওচিত্র ও স্টিল ছবি প্রতিবেদকের কাছে রয়েছে।
প্রসঙ্গত, ১৯ এপ্রিল প্রেসক্লাব যশোরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে চেয়ারম্যানরা প্রকল্পে অনিয়মের কথা প্রকারান্তরে স্বীকার করেছিলেন। তবে তারা দাবি করেছিলেন, বেশি অনিয়ম হচ্ছে টিআর, কাবিখা, কাবিটা ও সোলার প্যানেল কর্মসূচিতে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসের উপ-সহকারী প্রকৌশলী অনিক বিশ্বাসের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে কর্মসৃজন প্রকল্পে অনিয়ম, লুটপাট হচ্ছে বলে অভিযোগ। প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার অফিসকে ২০% টাকা দিতে বাধ্য হওয়া, ইউনিয়ন পর্যায়ে চেয়ারম্যান, মেম্বার, মহিলা মেম্বার, ইউপি সচিব ও চৌকিদার-দফাদারদের জন্য একজন করে লেবারের কোটা রাখায় এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ১১ ইউনিয়নের ৯৯টি ওয়ার্ডের ৯৯টি প্রকল্পে মোট দুই হাজার ৩৮৪ জন শ্রমিক কাজ করার কথা। এরমধ্যে ফুলসারা ইউনিয়নে ২৬০, পাশাপোলে ২৩০, সিংহঝুলীতে ১৪২, ধুলিয়ানিতে ১৪৭, চৌগাছা সদরে ১৪০, জগদিশপুরে ১৮৫, পাতিবিলায় ১৫৮, হাকিমপুরে ২৪৬, স্বরুপদাহে ২৭২, নারায়ণপুরে ২৯১ এবং সুখপুকুরিয়া ইউনিয়নে ৩১৩ জন শ্রমিক কাজ করার কথা। এসব শ্রমিক প্রকল্পের অধীন গ্রামীণ কাঁচা-আধাপাকা সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ করবেন। প্রতিটি ইউনিয়নের নয়টি ওয়ার্ডে ৯৯টি প্রকল্পে কাজ চলমান রয়েছে ১৫ এপ্রিল থেকে। বৃহস্পতি ও শুক্রবার বাদ রেখে পাঁচদিন কাজ করার কথা শ্রমিকদের। তবে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন, মাঝে বোরো ধান কাটার সময়ে কাজ বন্ধ রাখা হয়।
জানতে চাইলে ধুলিয়ানি ইউপির একটি ওয়ার্ডের একজন ইউপি সদস্য বলেন, ‘আমার ওয়ার্ডের প্রকল্প মূল্য ধরা হয়েছে দুই লাখ নব্বই হাজার টাকা। ওয়ার্ডটির প্রকল্পে ২১ জন লেবার কাজ করার কথা। কাজ করছেন ১৬ জন। বাকি পাঁচ জনের একটি ইউপি চেয়ারম্যান, একটি আমি মেম্বারের, একটি ইউপি সচিবের, একটি ইউনিয়ন অফিসের, একটি ইউনিয়ন পরিষদের চৌকিদার-দফাদারের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ এই পাঁচজন কাজ না করলেও টাকা উঠে যাবে।

আরও পড়ুন