তাবলিগে বিভক্তির জেরে বিশ্ব ইজতেমা স্থগিত

আপডেট: 02:33:43 16/11/2018



img

সুবর্ণভূমি ডেস্ক : তাবলিগ জামাতের দুই পক্ষ পৃথক তারিখ নির্ধারণ করায় জানুয়ারিতে বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব স্থগিত করা হয়েছে।
তাবলিগের উভয় পক্ষের মধ্যে সমাঝোতার মাধ্যমে বিশ্ব ইজতেমার একটি তারিখ নির্ধারণে ছয় সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল ভারতের দেওবন্দে যাবে বলে বৃহস্পতিবার সিদ্ধান্ত হয়েছে সরকারের সঙ্গে এক বৈঠকে।
টঙ্গীতে বিশ্ব ইজতেমার আয়োজন নিয়ে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের সভাপতিত্বে এ বৈঠকে তাবলীগ জামাতের বিবদমান দুটি পক্ষের প্রতিনিধিরা ছাড়াও বিভিন্ন সংগঠনের আলেমরা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় উপস্থিত আওয়ামী লীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক শেখ মো. আবদুল্লাহ রাতে বলেন, সভায় তাবলিগ জামাতের দুই পক্ষকে এক জায়গায় আনার চেষ্টা করা হয়। উভয় পক্ষের সম্মতিতে কিছু সিদ্ধান্তও সেখানে হয়।
জাতীয় নির্বাচনের সময় বিপুল সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ভোটের কাজে নিয়োজিত থাকতে হয় উল্লেখ করে আবদুল্লাহ বলেন, দুই পক্ষ আলাদা আলাদা হয়ে দুই দফায় চারবার ইজতেমা করলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও বিঘ্নিত হতে পারে।
“সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় দুই পক্ষই জানুয়ারিতে ইজতেমা না করাতে সম্মত হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় উভয় পক্ষই একমত হয়েছে যে এটি পরে হবে।”
তাবলীগ জামাতের এক পক্ষ আগামী ১১, ১২ ও ১৩ জানুয়ারি এবং অন্যপক্ষ ১৮, ১৯ ও ২০ জানুয়ারি বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্বের তারিখ নির্ধারণ করেছিল।
আবদুল্লাহ জানান, সভায় সর্বসম্মতিক্রমে ছয় সদস্যের একটি কমিটি করা হয়েছে। এই কমিটি ভারতের দেওবন্দ মাদরাসায় গিয়ে খোঁজখবর নিয়ে বিভ্রান্তি নিরসনে কাজ করবে।
“কারণ সেখান থেকে যে বক্তব্য এসেছে তা নিয়েই বিভ্রান্তি। সেখান গিয়ে যদি আলোচনা করা যায় তাহলে ঝামেলাটা মিটে যাবে।”
তাবলিগের বিবদমান দুই পক্ষকে এক করে একই তারিখে বিশ্ব ইজতেমা আয়োজন করা সম্ভব হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল্লাহ।
সভায় উপস্থিত ধর্ম মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, “তাবলিগ জামাতের কেন্দ্রীয় শুরা সদস্য দিল্লির মাওলানা মোহাম্মদ সা'দ কান্ধলভি বিভিন্ন সময়ে তার দেওয়া বক্তব্যের জন্য ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চেয়েছেন বলে সভায় জানান তার অনুসারীরা। তবে অন্যপক্ষের দাবি, সা'দ ক্ষমাতো চানইনি, ভুলও স্বীকার করেননি।”
পরে উভয়পক্ষের সম্মতিতে ধর্মসচিব আনিছুর রহমান, মাওলানা মাহমুদুল হাসান, মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ, তাবলিগের শুরা সদস্য সৈয়দ ওয়াসিফুল ইসলাম, মাওলানা মুহাম্মদ যোবায়ের এবং আওয়ামী লীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক শেখ আবদুল্লাহকে নিয়ে একটি কমিটি করা হয় সভায়। এই কমিটি দুই পক্ষের বিরোধ মেটাতে ভারতে গিয়ে আলোচনায় বসবেন বলে জানান ধর্ম মন্ত্রণালয়ের ওই কর্মকর্তা।
উপমহাদেশে সুন্নি মতাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় সংঘ তাবলিগ জামাতের মূলকেন্দ্র ভারতের দিল্লিতে। মাওলানা সা'দের দাদা ভারতের ইসলামি পণ্ডিত ইলিয়াছ কান্ধলভি ১৯২০ এর দশকে তাবলিগ জামাত নামের এই সংস্কারবাদী আন্দোলনের সূচনা করেন।
স্বেচ্ছামূলক এ আন্দোলনের উদ্দেশ্য ইসলামের মৌলিক মূল্যবোধের প্রচার। বিতর্ক দূরে রাখতে এ সংগঠনে রাজনীতি ও ফিকাহ নিয়ে আলোচনা হয় না।
মাওলানা ইলিয়াছের মৃত্যুর পর তার ছেলে মাওলানা মোহাম্মদ ইউসুফ এবং তারপর মাওলানা ইনামুল হাসান তাবলিগ জামাতের আমিরের দায়িত্ব পালন করেন। মাওলানা ইনামুলের মৃত্যুর পর একক আমিরের বদলে সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার দেওয়া হয় একটি শুরা কমিটির ওপর।
মাওলানা জুবায়েরের মৃত্যুর পর মাওলানা সা'দ আমিরের দায়িত্ব নেন এবং একক নেতৃত্বের নিয়ম ফিরিয়ে আনেন। কিন্তু মাওলানা জুবায়েরের ছেলে মাওলানা জুহাইরুল হাসান তখন নেতৃত্বের দাবি নিয়ে সামনে আসেন এবং তার সমর্থকরা নতুন করে শুরা কমিটি গঠনের দাবি জানান। কিন্তু সা'দ তা প্রত্যাখ্যান করলে বিরোধ বড় আকার ধারণ করে। বিভিন্ন সময়ে মাওলানা সাদের বক্তব্য নিয়েও আলেমদের মধ্যে বিভক্তি তৈরি হয়।
নেতৃত্ব নিয়ে দিল্লির মারকাজ এবং দেওবন্দ মাদরাসার অনুসারীদের মধ্যে এই দ্বন্দ্ব প্রকট আকার ধারণ করে চলতি বছর জানুয়ারিতে ঢাকায় বিশ্ব ইজতেমার সময়।
কয়েক বছর ধরে বিশ্ব ইজতেমায় আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করে আসা সা'দ কান্ধলভি এবার ঢাকায় এসে বিরোধীদের বিক্ষোভের মুখে পড়েন। শেষ পর্যন্ত সরকারের মধ্যস্থতায় ইজতেমায় অংশ না নিয়েই তাকে ঢাকা ছাড়তে হয়। 
বাংলাদেশে তাবলিগ জামাতের প্রধান কেন্দ্র কাকরাইল মসজিদে  ওই বিরোধের জের চলে বছরজুড়ে। গত এপ্রিলে দুই পক্ষের অনুসারীদের মধ্যে হাতাহাতিও হয়। ওই সময়ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কামালকে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় নামতে হয়।
সূত্র : বিডিনিউজ