একমঞ্চে কর্মসূচি পালন করবে ঐক্যফ্রন্ট

আপডেট: 01:55:45 15/10/2018



img
img

সুবর্ণভূমি ডেস্ক : এখন থেকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিক দলগুলো একমঞ্চ থেকে কর্মসূচি পালন করবে।
নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের  দাবিতে আত্মপ্রকাশ ঘটে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের। শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক পথচলা শুরু করে এ জোট মোর্চা। এ ফ্রন্ট গড়ে উঠেছে সাত দফা দাবি ও ১১ লক্ষ্যকে সামনে রেখে। কিন্তু ফ্রন্টের আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠান থেকে আসেনি সুনির্দিষ্ট কোনো যৌথ কর্মসূচির ঘোষণা। তবে আগামী দিনগুলোতে যৌথ কর্মসূচি নিয়ে পথচলার ঘোষণা এসেছে অনুষ্ঠানে। আগামী সপ্তাহে ফ্রন্টের তরফে যৌথ কর্মসূচির ঘোষণা আসবে।
এখন থেকে ফ্রন্টের শরিক দলগুলো কর্মসূচি নিয়েই এক মঞ্চে থাকবে।
জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা জানান, সারা দেশে বিভাগীয় সমাবেশের মাধ্যমেই শুরু হতে পারে ফ্রন্টের তরফে কর্মসূচিকেন্দ্রিক পথচলা। সবকিছু ঠিক থাকলে হজরত শাহজালাল (র.)-এর পুণ্যভূমি সিলেট থেকেই এই ধারাবাহিক বিভাগীয় সমাবেশের যাত্রা শুরু হবে। পাশাপাশি দেশের গুরুত্বপূর্ণ জেলাগুলোতেও সমাবেশ করবে ফ্রন্ট।
সংশ্লিষ্ট নেতারা জানান, আগামী ২১ অক্টোবর মিরপুরে নাগরিক ঐক্যের একটি সমাবেশ হওয়ার কথা ছিল। এখন ফ্রন্টের যাত্রা শুরু হওয়ায় সে সমাবেশটি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারেই অনুষ্ঠিত হবে। এ ছাড়া জেএসডির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীসহ প্রতিটি দলের একান্ত কিছু দিবসকেন্দ্রিক কর্মসূচি ছাড়া সব কর্মসূচিই পালিত হবে যৌথভাবে।
বিএনপি ঘোষিত সাত দিনের কর্মসূচি শেষ হলেই শুরু হবে ফ্রন্টের কর্মসূচি।
এদিকে বিকল্পধারা শেষ পর্যন্ত ঐক্যফ্রন্টে যুক্ত না হওয়ার বিষয়টিকে শাপেবর হিসেবে দেখছেন বিএনপি ও ২০ দলীয় জোটের নেতারা। তারা বলছেন, এখন ফ্রন্টের সামনে তিনটি কাজ। প্রথমত, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে কেন্দ্র করে যেকোনো তরফে ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে সতর্ক থাকা ও ঐক্য ধরে রাখা, দ্বিতীয়ত, জনমত জোরদার করে কর্মসূচিগুলোকে এগিয়ে নিয়ে সরকারকে দাবি আদায়ে বাধ্য করা এবং তৃতীয়ত, আসন নিয়ে আলোচনাসহ জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়া।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর এমাজউদ্দিন আহমেদ বলেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে বিকল্পধারার সভাপতি প্রফেসর ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী এলে ভালো হতো, সুবিধা হতো। কিন্তু তিনি আসেননি। তার না আসার কারণ কী সেগুলো এখন জনগণই বলাবলি করতে শুরু করেছে।
প্রবীণ এ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বলেন, ঐক্য প্রক্রিয়ায় সাধারণত দুইটি বিষয় প্রাধান্য পায়। একটি হচ্ছে, ঐক্য এবং অন্যটি হচ্ছে, কর্মসূচি। দুটো একসঙ্গে হতে হয়। এখন ঐক্য যতটুকু হয়েছে ভালো; কিন্তু জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠান থেকে কোনো কর্মসূচি আসেনি। কর্মসূচি থাকলে ঐক্য দৃঢ়তা পেতো, কারণ বৈঠকের পাশাপাশি কার্যক্রম না থাকলে ঐক্য শক্তিশালী হয় না। এখন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের তরফে কিছু যৌথ কর্মসূচি দেওয়া উচিত এবং সেসব কর্মসূচি বাস্তবায়নে জনগণের কাছে ছুটে যাওয়া দরকার।
বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘মৌলিক কিছু দাবিতে আমাদের দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া অনেক আগেই জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছিলেন। এতদিন আমরা যেসব দাবি জানিয়ে এসেছি এখন সেসব দাবি জাতীয় দাবিতে পরিণত হয়েছে। অন্য রাজনৈতিক দল ও জোট দাবিগুলোকে নিজেদের দাবি হিসেবে গ্রহণ করায় এখন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পথযাত্রা শুরু হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘এ ঘটনা কেবল আমাদের দলের নেতাকর্মীই নয়, সারা দেশের মানুষকে উজ্জীবিত করবে, সাহস যোগাবে।’
গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি সুব্রত চৌধুরী বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরেই ঐক্য প্রক্রিয়া নিয়ে আমাদের মধ্যে আলোচনা চলছিল। বিকল্পধারার নেতারা আমাদের এই ঐক্য প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করেছেন। জাতীয় নির্বাচনে ১৫০ আসন, প্রেসিডেন্ট-প্রধানমন্ত্রী, জামায়াত- এসব নিয়ে তাদের অনেক কথা আছে। জামায়াত যখন চারদলীয় জোটের শরিক ছিল তখন তো বিকল্পধারার নেতারা বিএনপির রাজনীতি করতেন, তখন তো সমস্যা ছিল না।’
তিনি বলেন, ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে বিকল্পধারা না আসায় আমরা হতাশ নই। বরং জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পথযাত্রা শুরুর পর কোনো জটিলতা হওয়ার চেয়ে আগে হওয়াই ভালো।’
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ‘রাজনীতিতে শেষ কথা বলতে কিছু নেই। প্রফেসর বি চৌধুরী একজন সাবেক প্রেসিডেন্ট ও বিএনপির প্রথম মহাসচিব হিসেবে এ ফ্রন্টে এলে ফ্রন্টের শোভা বাড়তো। তবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে যারা আসেননি তারা আগামীতে যে আসবেন না সেটার গ্যারান্টি কে দেবে? আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠান থেকে যে ঘোষণাপত্র পাঠ হয়েছে তাতে তো সবার প্রতি আহ্বান রয়েছে। আশা করি, এই ঐক্যফ্রন্টের পরিসর এবং গতি দুটোই বাড়বে এবং চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছাবে।’
জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার অন্যতম সদস্য ও সাবেক ডাকসু ভিপি সুলতান মুহম্মদ মনসুর আহমেদ বলেন, ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ইতিবাচকভাবেই এগিয়ে যাচ্ছে, আমরা কোনো নেতিবাচক চিন্তা করছি না।’
জামায়াত ইস্যুকে কেন্দ্র করে বিকল্পধারাকে জোটের বাইরে রাখার ষড়যন্ত্র হয়েছে বলে দলটির তরফে যে অভিযোগ তোলা হয়েছে, তা উড়িয়ে দিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, ‘এর পেছনে কোনো যুক্তি বা সত্যতা নেই। তারাই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে তারা আসবেন না। আগের দিনও তাদের সঙ্গে কথা হয়েছে, তাদের দাবি বা বক্তব্য আমাদের লক্ষ্যগুলোর মধ্যে চলে এসেছে। তারা সবাই একমত ছিলেন। সেখানে কীভাবে তারা নতুন ষড়যন্ত্র দেখতে পাচ্ছেন আমি জানি না। আমরা প্রথম থেকেই লক্ষ্য করেছিলাম কতগুলো বিষয়ে অযথা চাপ তৈরি করে একটা সমস্যা সৃষ্টি করা হয়েছে। যাই হোক, আমরা এ বিষয়ে বেশি কথা বলতে চাই না। আশা করি তারা ঐক্যে ফিরে আসবে।’
এদিকে বিকল্পধারার সরে দাঁড়ানোর ঘটনাকে জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়ায় নেতিবাচক লক্ষণ হিসেবে দেখছেন না বিএনপি ও ২০ দলীয় জোটের নেতারা। তারা বলছেন, বিএনপি চেয়ারপারসন ও জোটের শীর্ষ নেতা খালেদা জিয়া মুক্ত থাকাকালেও বিকল্পধারার নেতারা রহস্যময় আচরণ করেছেন। বিএনপির দিক থেকে সর্বোচ্চ ইতিবাচক আচরণের পরও নিজেদের নেতিবাচক অবস্থান থেকে নড়েনি বিকল্পধারা। সর্বশেষ তারা যেসব দাবি জানিয়ে আসছিল তার বেশির ভাগই ছিল বাস্তবতাবিবর্জিত।
তাদের মতে, বিকল্পধারার নেতারা প্রকাশ্যে ১৫০ আসনের কথা বলেছেন, অথচ বাস্তবতা হচ্ছে তাদের এর এক-দশমাংশ আসনে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো ভোটের মাঠে গ্রহণযোগ্য ও জনপ্রিয় নেতা নেই। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট-প্রধানমন্ত্রীর ভারসাম্যের ব্যাপারে তাদের দাবির সঙ্গে কোনো দ্বিমত প্রকাশ করেনি বিএনপি। এ ছাড়া জামায়াতের ব্যাপারে বিকল্পধারা এখন যে অভিযোগ তুলছে সেটা একধরনের হীনম্মন্যতা। চারদলীয় জোট সরকারের আমলে জামায়াত নেতাদের নিয়ে রাজনীতি করতে বা সরকারে থাকতে তো তৎকালীন বিএনপির অন্যতম শীর্ষ নেতা ডা. বি চৌধুরীর আপত্তি ছিল না। আর এখন তো জামায়াতের নিবন্ধনই নেই। তারা ঐক্যপ্রক্রিয়ার অংশীও নয়।
বিএনপি নেতারা বলেন, আসলে প্রথম থেকেই এই জাতীয় ঐক্যের ব্যাপারে বিকল্পধারার অবস্থান নেতিবাচক। দলটির একজন শীর্ষ নেতা মাহী বি চৌধুরী বক্তব্য-বিবৃতি, টকশো, বৈঠক ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যেসব বক্তব্য দিয়ে এসেছেন সেখানে অনেক বিষয়ই আপত্তিকর এবং ঐক্যবিরোধী।
বিএনপি ও জোট নেতারা বলেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে বিকল্পধারা শেষপর্যন্ত সংযুক্ত না হওয়ায় বরং শাপে বর হয়েছে। বিকল্পধারা নেতৃত্বের সঙ্গে জোটের একটি গুরুত্বপূর্ণ শরিক দলের শীর্ষ নেতার দূরত্ব রয়েছে। আগামীতে পথচলায় এ নিয়ে জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা ছিল। তাছাড়া জামায়াতের বিষয়টি নিয়ে পদে পদে যে জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা ছিল আপাতত সেই তা থেকে মুক্ত থাকলো জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট।
সূত্র : মানবজমিন

আরও পড়ুন