চৌগাছায় ভিজিএফের চাল কম দেওয়া হচ্ছে

আপডেট: 08:40:29 18/08/2018



img

চৌগাছা (যশোর) প্রতিনিধি : চৌগাছার স্বরূপদাহ ও সিংহঝুলি ইউনিয়নে ভিজিএফ-এর চাল বিতরণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বিতরণের সময় সরেজমিনে এই অনিয়মের সত্যতাও মেলে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চৌগাছা উপজেলায় ঈদুল আজহা উপলক্ষে ৪৯ হাজার ৮১৬ পরিবারে ভিজিএফএর ২০ কেজি করে চাল দেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় দুঃস্থ ও অতিদরিদ্রদের জন্য উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় এ চাল বিতরণ করার কথা। উপজেলার ফুলসারা ইউপিতে পাঁচ হাজার ২২০ জন, পাশাপোলে চার হাজার ২৮৮, সিংহঝুলিতে তিন হাজার ১২, ধুলিয়ানিতে তিন হাজার ১২০, চৌগাছা সদরে দুই হাজার ৬৮৯, জগদিশপুরে তিন হাজার ৫৮০, পাতিবিলায় তিন হাজার ১৪৩, হাকিমপুরে চার হাজার ৫০৪, স্বরূপদাহে পাঁচ হাজার ৭০৫, নারায়ণপুরে পাঁচ হাজার ৪২০ এবং সুখপুকুরিয়া ইউনিয়নে ছয় হাজার ৫৪ পরিবার এবং চৌগাছা পৌরসভায় তিন হাজার ৮১ পরিবার এ ভিজিএফের চাল পাবেন।
অভিযোগ উঠেছে, এই চাল বিতরণে অধিকাংশ ইউপি চেয়ারম্যানই মেম্বারদের সহায়তায় নানা অনিয়মের আশ্রয় নিচ্ছেন। তারা খাদ্যগুদাম থেকে সম্পূর্ণ চাল উত্তোলন করে নিলেও কার্ডধারীদের তিন থেকে চার কেজি করে কম দিচ্ছেন। আর চেয়ারম্যানদের এসব অনিয়মে প্রত্যক্ষ সহায়তা করছেন ট্যাগ অফিসাররা। তারা নিজেদের দায়িত্বপ্রাপ্ত ইউনিয়নে চাল বিতরণের সময় উপস্থিত না থেকে চেয়ারম্যানদের এসব অনৈতিক কাজ নির্বিঘœ করতে ভূমিকা রেখে চলেছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চৌগাছার স্বরূপদাহ ইউনিয়নে পাঁচ হাজার ৭০৫ জন কার্ডধারী দুঃস্থ ব্যক্তিকে ২০ কেজি করে চাল বিতরণের জন্য উপজেলা খাদ্য গুদাম থেকে ৩০ কেজি ওজনের তিন হাজার ৮০৪ বস্তা চাল ইউনিয়ন পরিষদে নিয়ে গিয়ে কার্ডধারীদের মধ্যে বিতরণের কথা। কিন্তু ইউপি চেয়ারম্যান শেখ আনোয়ার হোসেন খাদ্যগুদাম থেকে পুরো চাল উত্তোলন করলেও ইউনিয়ন পরিষদে নেন দুই হাজার ৮০০ বস্তা। এরপর শনিবার ইউনিয়ন পরিষদে খড়িঞ্চা ও মাধবপুর ওয়ার্ডের কার্ডধারীদের মধ্যে ভিজিএফএর চাল বিতরণ করা হয়।
জনপ্রতি ২০ কেজি করে চাল বিতরণের কথা থাকলেও তা না দিয়ে কার্ডপ্রতি চার থেকে পাঁচ কেজি চাল কম দেওয়া হচ্ছে এমন অভিযোগের ভিত্তিতে শনিবার বেলা ১১টার দিকে স্থানীয় সাংবাদিকরা স্বরূপদাহ ইউনিয়ন পরিষদের উদ্দেশে রওনা হন। স্বরূপদাহ গ্রামে পৌঁছালে খড়িঞ্চা ওয়ার্ডের কার্ডধারী কয়েকজন চাল কম দেওয়ার অভিযোগ করেন। এক পর্যায়ে চাল পাশের একটি দোকানে মেপেও দেখান তারা। সাংবাদিকরা দেখতে পান, ২০ কেজির বদলে কার্ডধারী আনোয়ারুলকে ১৬ কেজি ৮০০ গ্রাম, ফাতেমাকে ১৮ কেজি ১০০ গ্রাম, শাহানাজ খাতুনকে ১৭ কেজি ২০০ গ্রাম, আবুল কাশেমকে ১৫ কেজি ৮০০ গ্রাম, লিয়াকত আলীকে ১৮ কেজি ৫০০ গ্রাম এবং রাবেয়া খাতুনকে ১৭ কেজি ১০০ গ্রাম চাল দেওয়া হয়েছে।
তারা অভিযোগ করেন, চাল কম দেওয়ার প্রতিবাদ করলে ইউপি মেম্বার আব্দুল মান্নানের নেতৃত্বে চৌকিদার-দফাদাররা তাদের মারতে তেড়ে আসেন। এসময় সাংবাদিকরা তাদের নিয়ে ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে ইউপি মেম্বার আব্দুল মান্নানকে প্রশ্ন করলে তিনি দুস্থদের অভিযোগ অস্বীকার করেন। পরে তাদের চাল মেপে দেখানো হলে তিনি সাংবাদিকদের সামনে চৌকিদার-দফাদারদের গালি দিয়ে বলেন, ‘আমি তাদের (কার্ডধারীদের) বলেছি, আপনাদের চাল বুঝে নেবেন। একগ্রাম কম হলেও নেবেন না।’
পরে সাংবাদিকরা অনুরোধ করলে মেম্বার ১৯ কেজি করে চাল বুঝিয়ে দিতে রাজি হন। কার্ডধারীরা জানান, এর আগেও সবাইকেই এভাবে তিন থেকে চার কেজি করে চাল কম দেওয়া হয়েছে।
চাল বিতরণের সময়ে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের ট্যাগ অফিসার উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার আকরাম হোসেনের উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও তাকে পাওয়া যায়নি। ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমার অফিসের অফিস সহকারী (আইসিটি) মাসুদের সেখানে থাকার কথা।’ কিন্তু সরেজমিনে মাসুদের দেখা মেলেনি। আর অফিসারের বদলে অফিস সহকারী কেনো থাকবেন- জানতে চাইলে ট্যাগ অফিসার কোনো জবাব দিতে পারেননি।
ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ আনোয়ার হোসেন বলেন, যাদের চাল কম দেওয়া হয়েছিল, তাদের পরে পূর্ণ করে দেওয়া হয়েছে। সেটাতো সাংবাদিকদের হস্তক্ষেপে হয়েছে জানালে তিনি আর কথা বাড়াতে চাননি।
তিন হাজার ৮০০ বস্তা ইউপি ভবনে নেওয়ার কথা থাকলেও দুই হাজার ৮০০ বস্তা চাল নেওয়া হয়েছে কেনো জানতে চাইলে চেয়ারম্যান বলেন, ‘সব চাল পরিষদে আনা হয়েছে।’
একইদিনে উপজেলার সিংহঝুলি ইউনিয়নে চাল বিতরণেও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ইউনিয়নটিতে তিন হাজার ১২ জন কার্ডধারীকে চাল বিতরণ করার কথা। শনিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে দেখা যায়, ভিজিএফ-এর বিতরণ করা চাল কিনেছেন স্থানীয় এক ব্যবসায়ী। তার হিসেবের খাতায় দেখা যায়, ইউনিয়নের জাহাঙ্গীরপুর গ্রামের আব্দুস সালামকে দেওয়া হয়েছে ১৭ কেজি, বাবুকে ১৬ কেজি, ঝরনার দুটি কার্ডের বিপরীতে ৩৩ কেজি, মুজামকে ১৬ কেজি চাল। সিংহঝুলি গ্রামের লিটনকে চারটি কার্ডের বিপরীতে ৬৮ কেজি, পলিমকে দুটি কার্ডের বিপরীতে ২৬ কেজি, অমলকে ১৭ কেজি, আব্দুর রাজ্জাককে ১৬ কেজি ৫০০ গ্রাম, আলীকে ১৭ কেজি, মিলনকে ছয়টি কার্ডের বিপরীতে ৯৫ কেজি ৫০০ গ্রাম, মনিরুলকে তিনটি কার্ডের বিপরীতে ছয় কেজি চাল দেওয়া হয়েছে।
তবে ওই চাল ক্রেতা দাবি করেন, বিক্রেতাদের বেশিরভাগই তাদের আসল নাম গোপন করেছেন।
সেখানে উপস্থিত কয়েকজন চাল পাওয়া ব্যক্তি নাম প্রকাশে অনিচ্ছা দেখিয়ে বলেন, তাদেরকেও একইভাবে ১৪ থেকে ১৬ কেজি করে চাল দেওয়া হয়েছে।
সিংহঝুলি ইউনিয়নেও চাল বিতরণের সময় ট্যাগ অফিসারকে পাওয়া যায়নি।
ভুক্তভোগীরা বলেন, চাল কম দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে ইউনিয়নের একজন গ্রাম পুলিশ তাদেরকে বলেছেন, ‘নালিশ করে কোনো লাভ নেই। উপর পর্যন্ত ঠিক করা আছে।’ ফলে গ্রামের দুস্থরা বাধ্য হয়েই সেই কম দেওয়া চাল নিয়েই বাড়ি ফিরেছেন।

আরও পড়ুন