ভারতের সিদ্ধান্ত : আর নয় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র

আপডেট: 02:12:02 07/03/2017



img

মোহাম্মদ হাসান শরীফ

প্রবল প্রতিবাদের মধ্যেও যখন বাংলাদেশের রামপালে যৌথ উদ্যোগে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ এগিয়ে চলছে, তখন খোদ ভারতেই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে নীতিগত অবস্থানের ১৮০ ডিগ্রি পরিবর্তন ঘটেছে; অর্থাৎ পুরো পরিবর্তন হয়েছে এসংক্রান্ত পরিকল্পনায়। দেশটির সেন্ট্রাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটি (সিইএ) জানিয়েছে, পাঁচ বছর পরই তারা আর কোনো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্লান্ট স্থাপন করবে না। তারা বরং নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের দিকে যাবে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীলতা ক্রমাগত কমিয়ে আনা হবে।
ভারত কিন্তু বেশ ভাবনা-চিন্তার পরই কয়লা ছেড়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে যাচ্ছে। ২০২২ সালের পরে আর কোনো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণকাজ তারা করবে না। তবে দেশটিতে এখনো যে পরিমাণ কয়লার মজুত আছে, তা দিয়ে তারা ২০২৭ সাল পর্যন্ত অনায়াসে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে যেতে পারবে। কিন্তু তারপরও ওই অবস্থান থেকে তারা সরে আসছে।
এই পরিবর্তনের একটি বড় কারণ হলো পরিবেশ দূষণ। আবার দূষণকারী উপাদানগুলো দূর করতে প্রতিষেধকমূলক যেসব পদক্ষেপ নিতে হয়, সেগুলো নিতে গেলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায় অনেক বেশি। এই ব্যয়ভার মেটানো সম্ভব নয়। এ কারণেই  অত্যাধুনিক এবং পরিবেশ দূষণমুক্ত সরঞ্জাম দিয়ে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপানের চাহিদা কমে যাচ্ছে।  ভারতের ন্যাশনাল ইলেকট্রিসিটি প্লানে (২০১৭-২০২২) এ ব্যাপারে একটি রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে,  ২০২১-২২ এবং ২০২৬-২৭ সময়কালে মোট জ্বালানির যথাক্রমে ২০.৩ ও ২০.৩ ভাগ আসবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে।
কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর বেশির ভাগই তৈরি হয়েছে বেসরকারি খাতে। সরকারের এই নীতিগত পরিবর্তনের ফলে প্লান্টে বিনিয়োগে বড় ধরনের সমস্যা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সরকার সিইএ’র পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অগ্রসর হলে চার হাজার মেগাওয়াটের আল্ট্রা মেগা পাওয়ার প্লান্টের প্রয়োজন হবে না বলেও মনে করা হচ্ছে।
গত ডিসেম্বরে সিইএ’র খসড়া জাতীয় বিদ্যুৎ পরিকল্পনাটি প্রকাশিত হয়। বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের তদারকিতে এটা প্রণয়ন করা হয়। ভারতের দ্বাদশ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা (২০১২-১৭) অনুযায়ী, ওই সময়কালে দেশটিতে এক লাখ এক হাজার ৬৪৫ মেগাওয়াট নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদন হওয়ার কথা। এগুলোর ৮৫ ভাগই কয়লাভিত্তিক প্লান্ট থেকে আসবে বলে পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তবে এখন পরিকল্পনা করা হয়েছে, ২০২২ সালের পর আর কোনো কয়লাভিত্তিক প্লান্ট নির্মাণ করা হবে না। ২০২২ সাল থেকেই নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ প্লান্টের কাজ বড় আকারে শুরু হবে। ওই বছরে মোট ১৭৫ গিগাওয়াটের নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ প্লান্ট নির্মাণ করা হবে।
২০১৬ সালের মার্চে ভারতের মোট বিদ্যুতের প্রায় ৬১ ভাগ ছিল কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের, ১৪ ভাগ জলবিদ্যুৎ, ১৪ ভাগ নবায়নযোগ্য (বেশির ভাগই বায়ুভিত্তিক), আট ভাগ প্রাকৃতিক গ্যাস, দুই ভাগ পরমাণু এবং এক ভাগ ডিজেলভিত্তিক কেন্দ্রের।
বিদ্যুৎ স্বল্পতা দূর করা এবং প্রতিটি ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাপকভাবে বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ভারতে ১৯৫০ সালে বিদ্যুৎ সামর্থ্য ছিল এক হাজার ৭১৩ মেগাওয়াট, ২০১৬ সালের মার্চে তা দাঁড়ায় তিন লাখ দুই হাজার ৮৮ মেগাওয়াটে। ভারতের  দিক থেকে এটা বড় ধরনের সাফল্য হিসেবেই দেখা হচ্ছিল। কিন্তু এটা করতে গিয়ে পরিবেশের ভয়াবহ দূষণ ঘটে। কোনো কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে ভারতের রাজধানীকে বলা হয়েছে, বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত নগরী। ভারতের অবস্থানও একই পর্যায়ের। অবশ্য কেবল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্যই যে দূষণ ঘটছে, এমন নয়। তবে এটা অন্যতম কারণ।
আবার ভারতই নয়, পরিবেশ সুরক্ষার দিকে পরোয়া না করা দেশগুলোর তালিকায় দেশটির সাথে যেন প্রতিযোগিতা করছে চীন, ব্রাজিল প্রভৃতি রাষ্ট্র। পরিবেশ দূষণ ওইসব দেশেই সীমিত থাকছে না। বাংলাদেশের মতো দেশ তার শিকার হয়। সমুদ্র স্তরের উচ্চতা বেড়ে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা তলিয়ে যাওয়ার যে আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে, তার জন্য কিন্তু বাংলাদেশ দায়ী নয়। কিছুটা অগ্রসর দেশগুলো তাদের উন্নয়ন কার্যক্রম এগিয়ে নিতে গিয়ে এমন সব ব্যবস্থা নিচ্ছে, তার সুফল তারা এককভাবে পেলেও কুফলগুলো গরিব দেশগুলোকেও ভোগ করতে হচ্ছে।
এমন এক প্রেক্ষাপটে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনে ভারত ব্যাপক উদ্যোগ নিয়েছে। ২০১৬ সালের মার্চে যেখানে এই খাত থেকে বিদ্যুৎ আসতো ৫২৩ মেগাওয়াট, সেখানে ২০২২ সাল নাগাদ এই খাত থেকে ৫২৩ গিগাওয়াট করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই পরিকল্পনায় কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ৮৫ ভাগ থেকে কমিয়ে ৪৭.৫ ভাগ করার কথা বলা হয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির মধ্যে পানি, পরমাণু, বাতাস, সৌর বিদ্যুতের দিকেই বেশি নজর দেওয়া হবে।
(আমাদের বুধবার থেকে)