শিল্পী সুলতানের প্রতি সারজানের ভালোবাসা

আপডেট: 01:54:50 02/01/2018



img

মৌসুমি নিলু, নড়াইল : শিল্পী সুলতানের প্রতি অন্য রকম ভালোবাসা প্রদর্শন করলেন শহরের সারজান। সুলতানকে নিয়ে বিভিন্ন প্রিন্ট মিডিয়ায় প্রকাশিত প্রতিবেদন, ফিচার এবং তার কাছে সুলতানের লেখা কয়েকটি চিঠির ফটোকপি তিনি নিজ ওষুধের দোকানের সানে একটি ব্যানারে প্রদর্শন করেছেন।
শিল্পী সুলতানের ৯৩তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত সুলতানমেলা উপলক্ষে সারজান এ ব্যতিক্রমী কাজ করেছেন। মেলা প্রাঙ্গণ থেকে তার দোকানের দূরত্ব মাত্র কয়েকশ’ গজ।
২৬ ডিসেম্বর থেকে নড়াইলের সুলতান মঞ্চে সুলতানমেলা শুরু হয়েছে। চলবে ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত। সুলতান ভক্ত সারজানের এ প্রদর্শনীও চলবে একই দিন পর্যন্ত।
শিল্পী সুলতান সারা জীবনই কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে ওঠাবসা ও চলাফেরা করতেন। একই এলাকার মানুষ সারজান বয়সে ছোট হলেও অকৃতদার সুলতানের সঙ্গে তার সখ্য গড়ে ওঠে। শিল্পী জীবদ্দশায় প্রায় প্রতিদিনই এই সারজানের দোকানে এসে বসতেন এবং গল্প করতেন। প্রয়াত এই শিল্পীর যে কোনো অনুষ্ঠানের খবর পেলে সেখানে ছুটে যান সুলতানভক্ত সারজান। নিজের দোকানেও শিল্পীর ছবির পাশে নিজের একটি ছবি বাঁধাই করে রেখেছেন।
বরেণ্য চিত্রশিল্পী এস এম সুলতান অনেক সময় অভাব অনটনে দিন কাটিয়েছেন। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত অভাব তাকে তাড়া করে ফিরেছে। সুলতান নিজের ও পরিবারের জন্য, ওষুধ, প্রিয় শিশু ও পশু-পাখির জন্য, ঢাকায় যাওয়াসহ বিভিন্ন কারণে হাতে গোনা আপন যে দু’একজনের কাছ থেকে টাকা ধার করেছেন, তাদের একজন হলেন নড়াইল শহরের সারজান।
শিল্পী সুলতান শহরের রূপগঞ্জ এলাকার তাহিদুল ইসলাম সারজানের মিতালি ফার্মেসিতে দোকানে প্রায় প্রতি দিনই বসতেন। অত্যন্ত আপন মানুষের মতো তার সঙ্গে আর্থিক লেনদেন করতেন। অসুস্থতা বা কাজের কারণে অনেক সময় তিনি আসতে পারতেন না। শিল্পীর কাছে অর্থ না থাকলে তার (সুলতানের) কাছের মানুষ বলে পরিচিত বানছা বিশ্বাস বা ওসমান, কখনো দুলাল সাহা বা রহমানকে এই সারজানের কাছে একটি চিঠি লিখে বাজারের ব্যবস্থা করে দিতে বলতেন। সেসব চিঠির ভাষা আর পাঁচটি চিঠির ভাষার মতো না। সুলতানের মৃত্যুর এতগুলো বছর পরেও সারজান এসব চিঠি যতœ করে রেখে দিয়েছেন। শিল্পীর লেখা কয়েকটি চিঠিও প্রদর্শনীতে রাখা হয়েছে।
সুলতান একটি চিঠিতে লিখেছেন, ‘সারজান, পশু-পাখিদের যন্ত্রণা আমার সহ্য হচ্ছে না, নিতান্ত অর্থাভাবে আছি। কোনো রকম বাজার হচ্ছে না। কিছু ব্যবস্থা করো।’
মৃত্যুর কিছু দিন আগে ১৯৯৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর সুলতানের লিখেছেন, ‘সারজান, বিষ্ণুকে পাঠালাম। অন্তত তিন শত টাকার সাহায্য করিও।’
একই সালের সালের ১২ সেপ্টেম্বর লিখেছেন, ‘সারজান কিছু মনে করো না। এই অভাব একটু সুস্থ হলে আর থাকবে না। কারো কাছে বলা যায় না। চালিয়ে নিও।’
৯০ সালের ৩ এপ্রিল এক চিঠিতে লিখেছেন, ‘শূন্যহাত। বাজার খরচ নাই। দুলালকে (সুলতানের পালিত ছেলে) ঢাকা পাঠাইয়াছি। হয়ত শিল্পকলা একাডেমি থেকে এক মাসের টাকা পাওয়া যাবে। তিন দিন পর আসবে। তুমি অন্তত দুই শত টাকা ওসমানের (সুলতানের বাসার কেয়ারটেকার) মারফৎ সাহায্য করিও।’
অন্যের জন্য লিখেছেন, ‘সারজান, কুড়ি টাকা রহমানকে দিয়া দিবা। অন্যথায় ওর বাজার হবে না। কদিন তোমাকে বার বার বিরক্ত করছি। মনে কিছু করিও না।’
এর পর দিন অন্য এক চিঠিতে লিখেছেন, ‘সারজান, বানছা বিশ্বাস আমাদের বাড়িতে বছর ভরে কাজ করে। খুবই বিশ্বস্ত। ভালো মানুষ। ওর জন্য ৫০ টাকা প্রয়োজন।’
৯০ সালের ১২ সেপ্টেম্বর লিখেছেন, ‘সারজান চাল কিনতে হবে। জীবজন্তুর দুপুরে রান্না হবে না। কালকের মতো একটু কষ্ট করে একটা ব্যবস্থা করিও।’
একই বছরের ৩ অক্টোবর লিখেছেন, ‘সারজান, আজকের বাজারের কোনে ব্যবস্থা হলো না। একটু কষ্ট করে দ্যাখো দেখি সম্ভব হয় কিনা। অন্যথায় জীবজন্তু নিয়ে মুশকিল। ওদের জন্য একটু ভাবো কিছু করতে পার কিনা।’
এ রকম শতাধিক চিঠি ৫-৬ বছর ধরে শিল্পী সুলতান তার প্রিয় সারজানের কাছে লিখেছেন। এসব চিঠির যথাযথ সম্মান দেখিয়েছেন সারজান। এর জন্য তিনি গর্ববোধও করেন। অনেক চিঠি হারিয়ে ফেললেও ৩০টির মতো চিঠি তিনি লেমিনেশন করে বাঁধিয়ে রেখেছেন।
তাহিদুল ইসলাম সারজান বলেন, ‘সুলতান কাকু আমাকে নিজ সন্তানের মতো স্নেহ করতেন। মাঝে মধ্যেই তিনি টাকা ধার নিতেন। কিছু অর্থ পরিশোধ করেছেন। কিছু শোধ করতে পানেননি। সবচেয়ে বড় কথা হলো, একজন মহান ব্যক্তিকে সাহায্য করতে পেরে নিজেকে গর্ববোধ করি। তার প্রতি এই শ্রদ্ধাবোধ এবং ভালোবাসা থেকেই এ রিপোর্ট ও চিঠি প্রদর্শন করেছি।’

আরও পড়ুন