যশোরের রণাঙ্গন

আপডেট: 02:35:44 13/12/2017



img
img

সরোয়ার হোসেন

বাংলাদেশের সুমহান মুক্তিযুদ্ধে যশোর এক অনন্য ইতিহাস সৃষ্টিকারী জেলা। মুক্তি ও মিত্রবাহিনীর যৌথ আক্রমণ এবং মুক্তিকামী মানুষের প্রতিরোধে যশোর জেলা দেশের মধ্যে প্রথম শত্রুমুক্ত হয়। ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর মুক্তি ও মিত্রবাহিনীর সম্মিলিত আক্রমণে টিকতে না পেরে যশোর সেনানিবাস থেকে খুলনার দিকে পালিয়ে যায় পাকসেনারা। যশোরের মাটিতে ওড়ানো হয় বিজয়ের প্রথম পতাকা। মুক্তিকামী মানুষের গগনবিদারী ‘জয়বাংলা স্লোগান’-এ প্রকম্পিত হয়ে ওঠে আকাশ-বাতাস। হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন মুক্তির আনন্দে শামিল হতে আর পাক হানাদারমুক্ত প্রকৃতির নির্মল বাতাসে শ্বাস নিতে।
প্রথম শত্রুমুক্ত জেলা যশোর হলেও এটি অর্জন করতে কম মূল্য দিতে হয়নি যশোরবাসীকে। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই জেলাবাসী সংগ্রামের প্রস্তুতি নিতে থাকেন। বিশেষ করে ছাত্র ও যুবরা পাড়ায়-মহল্লায় গড়ে তোলেন মুক্তিবাহিনী। মুক্তিযুদ্ধকালে যশোর ছিল আট নম্বর সেক্টরের অধীন। বৃহত্তর যশোর ও কুষ্টিয়া জেলা, ফরিদপুর ও খুলনা জেলার কিছু অংশ নিয়ে এই সেক্টর গঠিত হয়েছিল। এর সদর দপ্তর ছিল যশোরের বেনাপোলে। এই সেক্টরের প্রথম কমান্ডার ছিলেন মেজর আবু ওসমান চৌধুরী।। আগস্ট মাস থেকে সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন মেজর এমএ মঞ্জুর। তাঁর অধীনে ছিলেন ক্যাপ্টেন আবু ওসমান চৌধুরী ও ক্যাপ্টেন নাজমুল হুদা। এই সেক্টরের অধীনে মুক্তিযোদ্ধাদের সামরিক প্রশিক্ষণ দেয়া হয়।
এর বাইরে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় ছিল বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স (বিএলএফ)। এই বাহিনীর প্রধান ছিলেন আলী হোসেন মনি এবং ডেপুটি প্রধান ছিলেন শেখ রবিউল আলম। রবিউল আলম জানান, বিএলএফ-এর নেতৃত্বে বৃহত্তর যশোর জেলায় (যশোর, ঝিনাইদহ, মাগুরা, নড়াইল) একাধিক সশস্ত্র মুক্তিবাহিনী গড়ে ওঠে। তাদেরকে বিভিন্নভাবে প্রশিক্ষিত করা হয়। এই বাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন ফ্রন্টে বীরোচিত লড়াই-এ অংশ গ্রহণ করেন।
এছাড়া পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল) জেলা কমিটির সিদ্ধান্তে দলের নেতাকর্মীরা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। প্রথমে পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল)-এর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা বাহিনীর নেতা ছিলেন নুর মোহাম্মদ। পরে এর দায়িত্ব গ্রহণ করেন বিমল বিশ্বাস। বিশিষ্ট লেখক মোস্তাফিজুর রহমান কাবুল জানান, পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যরা অক্টোবর পর্যন্ত বৃহত্তর যশোরের বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রতিরোধ যুদ্ধ গড়ে তোলেন। কিন্তু, ‘দুই কুকুরের লড়াই’ তত্ত্বে দলের কেন্দ্রীয় কমিটি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিলে অক্টোবর মাসে দলের নেতাকর্মীরা যুদ্ধবিরতি দেন।
অন্যদিকে, যশোরে পাকিস্তানি বাহিনীর মোতায়েন ছিল ১০৭ নম্বর ব্রিগেড। এর কমান্ডার ছিলেন বিগ্রেডিয়ার হায়াত খান। যশোর সেনানিবাস থেকে শত্রু বাহিনী ছয়টি জেলা নিয়ন্ত্রণ করত।
যশোরের মানুষ মুক্তিযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক শপথ গ্রহণ করেন ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ। এদিন যশোর কালেক্টরেটের সামনে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে যশোরবাসী শপথ নেন স্বাধীনতা যুদ্ধের। শহরের রাজপথে বের হয় জঙ্গি মিছিল। মিছিলটি শহীদ সড়কে (তৎকালীন কেশবলাল রোড) এলে হানাদার বাহিনী গুলি চালায়। এতে শহীদ হন চারুবালা ধর নামে এক নারী। তিনিই ছিলেন মুক্তি সংগ্রামে যশোরের প্রথম শহীদ। মুক্তিকামী মানুষ শহীদ চারুবালার লাশ নিয়ে শহরে জঙ্গি মিছিল চালিয়ে যান। এরপর থেকেই যশোরে সংগঠিত হতে থাকে প্রতিরোধ। নেতৃত্ব দেয় সংগ্রাম পরিষদ। ভোলা ট্যাংক রোডের তৎকালীন ইপিআর দপ্তরে সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে ছাত্রজনতার সশস্ত্র প্রশিক্ষণ শুরু হয়। মুক্তিযুদ্ধের প্রস্ততি হিসেবে ২৩ মার্চ কালেক্টরেট চত্বরে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী কুচকাওয়াজ করে। সেনানিবাসে সকল প্রকার সরবরাহ বন্ধ করে দেয়া হয়। ২৬ মার্চ রাতে পাকিস্তানি জল্লাদ বাহিনী তৎকালীন জাতীয় সংসদ সদস্য জননেতা মশিয়ূর রহমানকে তাঁর বাসভবন থেকে ধরে যশোর সেনানিবাসে নিয়ে গিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে।
২৯ মার্চ পাক হানাদার বাহিনী যশোর শহর ছেড়ে সেনানিবাসে চলে যায়। ৩০ মার্চ যশোর সেনানিবাসের বাঙালি সৈনিকেরা বিদ্রোহ ঘোষণা করেন ক্যাপ্টেন হাফিজের নেতৃত্বে। ৩১ মার্চ কমিউনিস্ট নেতা শেখ আবদুস সবুর ও আরও কয়েকজনের নেতৃত্বে নড়াইল অস্ত্রাগার থেকে সংগৃহীত অস্ত্রসহ বিশাল এক বাহিনী যশোর আসে। তারা তৎকালীন ইপিআর-এর সহযোগিতায় বিস্ফোরক সংগ্রহ করে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার অভিমুখে রওনা হয়। তারা কারাগারে অবস্থানরত প্রখ্যাত কমিউনিস্ট নেতা কমরেড অমল সেনসহ বহু রাজবন্দি ও সাধারণ বন্দিদের মুক্ত করেন জেলের তালা ভেঙে। পরে এই বাহিনী যশোর সেনানিবাস ঘেরাও করে। তিন দিন অবরুদ্ধ থাকার পর ক্যান্টনমেন্ট থেকে গোলা ছুড়তে থাকে পাকিস্তানি বাহিনী। এ সময় শেখ সবুরের নেতৃত্বাধীন হালকা অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়।
৪ এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে প্রচণ্ড যুদ্ধে লে. আনোয়ারসহ চারজন শহীদ হন। কুমিল্লার শাহরস্তি থানার সন্তান শহীদ লে. আনোয়ারের বীবত্বগাথা আজো অমলিন। যশোর-ঝিনাইদহ সড়কের বারীনগর বাজারের অদূরে কাজী নজরুল ইসলাম কলেজের সামনে এই বীর শহীদ শান্তিতে ঘুমিয়ে আছেন।
৪ এপ্রিল পাকবাহিনী ট্যাংক, সাঁজোয়া যান, কামানসহ শহরে হামলা চালায়। অত্যাধুনিক অস্ত্রের সামনে টিকতে না পেরে মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হঠতে বাধ্য হন। শুরু হয় পাক আর্মিদের নিষ্ঠুরতা। তারা শহরের নিরস্ত্র মানুুষকে নির্বিচারে হত্যা করতে থাকে। পাকবাহিনীর গণহত্যায় পুরো শহর পরিণত হয় বধ্যভূমিতে। শান্ত ভৈরবের পানি লাল ওঠে ওঠে শহীদের রক্তে। পাক বাহিনীর এই বর্বরতা অব্যাহত থাকে পুরো জুলাই পর্যন্ত। এরই মধ্যে স্বাধীনতা যুদ্ধের গতিধারা পাল্টে যায়। পাকবাহিনীর বর্বরতার পাশাপাশি পাল্টা আঘাত হানতে শুরু করেন মুক্তিযোদ্ধারা। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধারা যশোর শহর ও অন্যান্য এলাকায় হানাদার বাহিনীর অবস্থানগুলোতে প্রচণ্ড আক্রমণ চালাতে থাকেন। যশোরের রণাঙ্গনের সবচেয়ে বড় যুদ্ধটি সংঘটিত হয় চৌগাছার জগন্নাথপুর ও মশিয়ূরনগরে।
২০ নভেম্বর মুক্তি ও মিত্রবাহিনী ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনার বয়রা সীমান্তপথে যশোর সেনানিবাস দখলে অভিযান শুরু করে। ঝিকরগাছার ছুটিপুর থেকে মুক্তিবাহিনী যশোর সেনানিবাস লক্ষ্য করে কামানোর গোলা নিক্ষেপ শুরু করে। সেনানিবাসকে অবরুদ্ধ করতে বয়রা-কাবিলপুর-গরীবপুর হয়ে এগোতে থাকে ট্যাংকবাহিনী। এদিন ছিল ঈদ। সকালে চৌগাছার জগন্নাথপুরের মানুষ তৈরি হচ্ছিলেন ঈদ উদযাপনের জন্য। এমনই এক সময় হানাদার বাহিনীর ২০-২৫টি গাড়ি ঢোকে জগন্নাথপুর (বর্তমানে মুক্তিনগর) গ্রামে। ঈদের দিন নামাজ পড়বে, মিষ্টিমুখ করবে কী, বুকে গুলিবিদ্ধ হয়ে পাখির মতো লুটিয়ে পড়তে থাকে মানুষ। বর্বর পাঞ্জাবি সেনারা দেখামাত্রই গুলি চালাতে থাকে। একদিনেই তারা হত্যা করে ৩০ জনকে; যাদের সবাই নিরীহ, গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষ। সংসদ সদস্য মশিয়ূর রহমানের ভাই আতিয়ার রহমানসহ আরো দুজনকে ধরে এনে পুড়িয়ে মারে ওই দানবরা। বাড়ির পর বাড়ি আগুন জ্বালিয়ে ছারখার করে দেয়। অসহায় মানুষ তাদের প্রাণ বাঁচাতে যে যেদিক পারলেন, পালালেন। এরপরেও কিছু মানুষ বাপ-দাদার ভিটে আঁকড়ে পড়ে ছিলেন। সন্ধ্যায় ছদ্মবেশধারী চার মুক্তিযোদ্ধা এসে তাদেরও অন্যত্র চলে যাওয়ার পরামর্শ দিলেন। বললেন, রাতে বড় ধরনের যুদ্ধ হবে। জনমানবশূন্য নীরব নিস্তব্ধ জগন্নাথপুর গ্রাম সহসাই প্রকম্পিত হয়ে ওঠে গোলাগুলির শব্দে। শুরু হয় ভয়ংকর যুদ্ধ। মশিয়ূরনগরসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামও পরিণত হয় যুদ্ধক্ষেত্রে।
মুক্তি আর মিত্রবাহিনী অবস্থান নেয় জগন্নাথপুর গ্রামের একটি বাগানে। ট্যাংকবহর নিয়ে পাক বাহিনী গ্রামে ঢোকামাত্রই তাদের সাতটি ট্যাংক ধ্বংস করে দেয় মিত্রবাহিনী। এক পর্যায়ে পশ্চিমপাড়ার তেঁতুলতলায় অবস্থান নেয় মিত্রবাহিনী। সেখান থেকেই তারা গোলা ছুড়ছিল। সেসময় পাকবাহিনী ছিল বাঁশবাগানে। প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দের সাথে হাজারো সৈন্যের গগণবিদারি চিৎকার, আর চেচামেচি। দীর্ঘসময় ধরে যুদ্ধ চলায় গুলি তখন শেষের দিকে। দু’পক্ষই চলে আসে কাছাকাছি, একশ; গজের মধ্যে। জগন্নাথপুর স্কুল মাঠে শুরু হয় হাতাহাতি, মল্লযুদ্ধ। বেলা ১১টা পর্যন্ত চলে এই তাণ্ডব। ২২ নভেম্বর আবার বিমান হামলা চালায় পাকবাহিনী। মিত্রবাহিনীও পাল্টা বিমান হামলা চালিয়ে পাকিস্তানের তিনটি স্যাবর জেট জঙ্গিবিমান ভূপাতিত করে। ধ্বংস করে আরো সাতটি ট্যাংক ও বহু সাজোয়াঁ গাড়ি। পিছু হটতে বাধ্য হয় পাক বাহিনী। মিত্রবাহিনী শক্ত ঘাঁটি গাড়ে জগন্নাথপুরে। এই যুদ্ধে দুপক্ষের সহস্রাধিক সৈনিক মারা যায়। এরপর মুক্তিবাহিনী মিত্রবাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে হামলার পর হামলা চালাতে থাকে। এগিয়ে যেতে থাকে যশোরের অভিমুখে। ইতিহাসে এটি ‘জগন্নাথপুরের যুদ্ধ’ নামে খ্যাত।
হানাদার বাহিনী সলুয়া বাজারে তৈরি করে অগ্রবর্তী ঘাঁটি। এসময় যশোর সেনানিবাসের তিনদিকেই মিত্র বাহিনী ও মুক্তিবাহিনী শক্ত ঘাঁটি গেড়ে বসে। প্রতিরোধ যুদ্ধের শেষ অভিযান চলে ৩, ৪ ও ৫ ডিসেম্বর। এ তিনদিন যশোর অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে পাক হানাদার বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়। এ সময় মিত্রবাহিনীও সীমান্ত এলাকা থেকে যশোর সেনানিবাসসহ পাক আর্মিদের বিভিন্ন স্থাপনায় বিমান হামলা ও গোলা নিক্ষেপ করে। এক পর্যায়ে পর্যুদস্ত পাক বাহিনী ৫ ডিসেম্বর থেকে পালাতে শুরু করে। এদিন সকাল ও দুপুরে পাকিস্তানের নবম ডিভিশনের সঙ্গে ভারতীয় নবম পদাতিক ও চতুর্থ মাউন্টেন ডিভিশনের প্রচণ্ড লড়াই হয়। বিকেলেই পাক সেনা অফিসাররা বুঝে যান, যশোর দুর্গ আর কোনোভাবেই রক্ষা করা সম্ভব নয়। বেনাপোল অঞ্চলে দায়িত্বরত লে. কর্নেল শামসকে নওয়াপাড়ার দিকে দ্রুত সরে যাওয়ার নির্দেশ দেন ব্রিগেডিয়ার হায়াত। আর নিজের ব্রিগেড নিয়ে রাতের আঁধারে খুব গোপনে যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে তিনি পালিয়ে যান খুলনার দিকে। পালানোর সময় ৫ ও ৬ ডিসেম্বর শহরতলীর রাজারহাটসহ বিভিন্ন স্থানে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে তাদের প্রচণ্ড লড়াই হয়। ৬ ডিসেম্বর বিকেলে মিত্র বাহিনীর কমান্ডার জেনারেল বারাতের নেতৃত্বে মিত্র ও মুক্তি বাহিনী সেনানিবাসে ঢুকে দখলে নেয়।
সংস্থাপন মন্ত্রণালয় প্রকাশিত ‘যশোর গেজেটিয়ার’-এ উল্লেখ করা হয়েছে, ‘৬ তারিখ সন্ধ্যা হতে না হতেই পাক বাহিনীর সবাই যশোর ক্যান্টনমেন্ট ত্যাগ করে পালিয়ে যায়। ৭ ডিসেম্বর বেলা সাড়ে ১১টা নাগাদ আট নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক মেজর মঞ্জুর ও মিত্র বাহিনীর নবম ডিভিশনের কমান্ডার মেজর জেনারেল দলবীর সিং যশোরে প্রবেশ করেন। তখনও তারা জানতেন না যে যশোর ক্যান্টনমেন্ট শূন্য। তারা আশ্বর্যান্বিত হন কোনো প্রতিরোধ না দেখে।’
মুক্তিযোদ্ধা সংসদ যশোর জেলা কমান্ডার রাজেক আহমদের মতে ‘৬ ডিসেম্বরেই আমরা যশোর শহর থেকে শত্রু সেনাদের বিতাড়িত করি। কিন্তু, সেদিন যশোর শহর ছিল জনশূন্য। ফলে পরদিন ৭ ডিসেম্বর বিজয় মিছিল বের হয়।’
প্রসঙ্গত স্বাধীনতার পর থেকে ৭ ডিসেম্বরকেই যশোর মুক্ত দিবস হিসেবে পালন করা হতো। কিন্তু, মুক্তিযোদ্ধা ও ইতিহাসবিদদের দেয়া তথ্যমতে ২০১০ সাল থেকে ৬ ডিসেম্বর যশোর মুক্ত দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে।
৮ ডিসেম্বর যশোর শহরের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিয়েছিল মুক্তিবাহিনী। ১০ ডিসেম্বর প্রথম শত্রুমুক্ত জেলা যশোরের জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন ওয়ালিউল ইসলাম। অফিস-আদালতে কার্যক্রম শুরু হয় ১২ ডিসেম্বর। এর আগে ১১ ডিসেম্বর প্রথম শত্রুমুক্ত জেলা যশোর টাউন হল ময়দানে আয়োজিত জনসভায় ভাষণ দেন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ। এটাই ছিল মুক্ত দেশে কোনো জেলা সদরে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর প্রথম জনসমাবেশ। ওই সমাবেশে অন্যান্যের মধ্যে প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী শহীদ জহির রায়হান, চরমপত্রখ্যাত এমআর আখতার মুকুলসহ বরেণ্য ব্যক্তিবর্গও উপস্থিত ছিলেন। উপস্থিত ছিলেন বিশ্বের নানা দেশ থেকে আসা সাংবাদিকেরা।
কৌশলগত দিক দিয়ে যশোর ক্যান্টনমেন্ট ছিল পাকবাহিনীর অন্যতম প্রধান সামরিক ঘাঁটি। মুক্তিযুদ্ধকালীন পাকবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় প্রধান মেজর জেনারেল নিয়াজী যশোর ক্যান্টনমেন্ট নিয়ে দম্ভোক্তি করে বলতেন, ‘যশোর সেনানিবাস হচ্ছে প্রাচ্যের লেনিনগ্রাদ’। আর এর প্রতিরক্ষাব্যুহ হচ্ছে ‘ম্যাজিনোলাইন’। এই দুর্গের পতনের পর পাকবাহিনীর মনোবল চরমভাবে ভেঙে যায়। পক্ষান্তরে মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল বেড়ে যায় বহুগুনে। যশোর সেনানিবাসের পতনের খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের এলাকাসহ সমগ্র দেশে। এর পর থেকেই মুক্তিবাহিনীর আক্রমণ বৃদ্ধি পায়। দেশের অন্যান্য এলাকাতেও পাকিস্তানি বাহিনীর পতন আর একের পর এক এলাকা হানাদারমুক্ত হতে থাকে। সে কারণে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে যশোর এক অনন্য নজির স্থাপনকারী জেলা হিসেবে পরিচিত।
যশোরের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লিখতে গেলে বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদের নাম না লিখলেই নয়। ইপিআরের এই ল্যান্স নায়েক মুক্তিযুদ্ধকালে আট নম্বর সেক্টরের অধীন গোয়ালহাটি, ছুটিপুর ঘাট, ছুটিপুর সেনাক্যাম্প, বরণী ইত্যাদি নিয়ে গঠিত সাবসেক্টরে যোগদান করেন। তাঁর কমান্ডার ছিলেন মেজর নাজমুল হুদা। বরণীতে জীবনবাজি রেখে কমান্ডার নাজমুল হুদার জীবন রক্ষা করেছিলেন। ৫ সেপ্টেম্বর নূর মোহাম্মদ শেখকে অধিনায়ক করে গোয়ালহাটিতে একটি পেট্রোল টিম পাঠানো হয়। সকাল সাড়ে নয়টার দিকে পাক বাহিনী তিনদিক থেকে ঘিরে ধরে তাদের উপর আকস্মিক আক্রমণ শুরু করে। পেছন থেকে নিজস্ব প্রতিরক্ষা বাহিনী থেকে মুক্তিযোদ্ধারা পাল্টা আক্রমণ শুরু করলেও পেট্রোল বাহিনীকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এক সময় সিপাহী নান্নু মিয়া গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। নূর মোহাম্মদ শেখ তাকে কাঁধে তুলে নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে থাকেন। তিনি এলএমজি দিয়ে পাক বাহিনীকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ করতে থাকেন। তাঁর এই বীরত্বে পাক বাহিনী পিছু হঠতে থাকে। হঠাৎ মর্টারের একটি শেল এসে বিদ্ধ হয় তাঁর বাম কাঁধে। এরপরও তিনি প্রিয় সহযোদ্ধার প্রাণ রক্ষায় পিছপা হননি। সহকর্মীর অস্ত্র নিয়ে শত্রুদের দিকে গুলি চালাতে থাকেন আর আহত নান্নু মিয়াকে নিয়ে নিরাপদে যাওয়ার জন্য অন্যদের নির্দেশ দেন। যতক্ষণ সহযোদ্ধারা নিরাপদে না পৌঁছাত ততক্ষণ নূর মোহাম্মদ শেখ বীরের মতো শত্রুর মোকাবেলা করেছেন। তাঁর কৌশল ছিল শত্রু সেনাদের মনোযোগ সম্পূর্ণ নিজের দিকে নিবদ্ধ রাখা। যুদ্ধ শেষে সহযোদ্ধারা পাশের একটি ঝাঁড় থেকে শহীদ নূর মোহাম্মদ শেখের লাশ উদ্ধার করেন। যুদ্ধের সময় তিনি শত্রুসেনাদের এমন ক্ষতিসাধন করেন যে শত্রুসেনারা বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে তাঁর চোখ দুটি বিকৃত করে দেয়। শার্শার কাশিপুর গ্রামে এই বীরের সমাধি মুক্তিযুদ্ধে তাঁর গৌরবগাথাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। পরবর্তীকালে বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ শহীদ নূর মোহাম্মদ শেখকে বাংলাদেশ সরকার মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের জন্য সর্বোচ্চ স্বীকৃতি ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ উপাধি প্রদান করে।
১৯৩৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি নড়াইলের মহিষখোলা গ্রামে এক দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন নূর মোহাম্মদ শেখ। তাঁর পিতার নাম মোহাম্মদ আমানত শেখ, মায়ের নাম জেন্নাতুন্নেছা। দারিদ্র্যের কারণে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করতে পেরেছিলেন তিনি। ১৯৫৯ সালের ১৪ মার্চ যোগ দিয়েছিলেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস বা ইপিআর-এ। তাঁর ইপিআর ক্রমিক নম্বর ছিলো ৯৪৫৯। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে দিনাজপুর সেক্টরে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করায় তিনি ‘তকমা-ই-জং’ এবং ‘সিতারা-ই হারব’ মেডেল লাভ করেছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধকালে যশোরে যেসব বিদেশি সাংবাদিক দায়িত্ব পালন করেছেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম পুলিৎজার বিজয়ী আমেরিকান সাংবাদিক সিডনি এইচ সানবার্গ। তাঁর লেখা ‘বাঙালিজ ড্যান্স অ্যান্ড শাউট এ লিবারেশন অব যশোর’ শীর্ষক প্রবন্ধ ১৯৭১ সালের ৮ ডিসেম্বর নিউইয়র্ক টাইমস-এ ছাপা হয়। প্রতিবেদনে তিনি পাকবাহিনীর বর্বরতার বর্ণনা দিয়ে লেখেন, ‘যশোরের অদূরে রাস্তার পাশে একজনের মৃতদেহ পড়ে আছে। তার বাম হাত কাটা ছিল এবং বুক ছিল ক্ষতবিক্ষত। তার অপরাধ সৈন্যদের অবস্থান সম্পর্কে ভারতীয় সৈন্যদেরকে অবহিত করা। এই অভিযোগে পাকিস্তানি সৈন্যরা তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে।’
ওই বর্ণনায় সিডনি আরো উল্লেখ করেন, ‘ভারত সীমান্ত থেকে যশোরমুখি সড়কের প্রায় সবকটি সেতু পাকিস্তানি সৈন্যরা উড়িয়ে দেয়। সে সময় যশোর নগরীর মোট জনসংখ্যা ছিল ৩০ হাজার। এদের খুব কম সংখ্যক লোককে রাস্তায় দেখা যেত। এদের অনেকে নিরাপত্তাহীনতায় ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে চলে গিয়েছিল। অনেকে মারা যায়। বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্সনায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ, বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী হামিদুর রহমান, চারুবালা, সুনিরকুমার রায়, নারায়ণচন্দ্র সাহা, সুধিরকুমার ঘোষ, মশিয়ূর রহমানসহ শত শত নারী-পুরুষ আর কখনো নিজ বাড়িতে ফিরে আসেনি। মাতৃভূমির জন্য তারা আত্মোৎসর্গ করেন।’
যশোর শত্রুমুক্ত হওয়ার পর মুক্তিকামী মানুষের অভিব্যক্তি প্রকাশ সম্পর্কে সিডনি লিখেছেন, ‘বাড়ির ছাদে বাঙালিরা নৃত্য করছে। তারা রাস্তায় রাস্তায় স্বাধীনতার স্লোগান দিচ্ছে। তারা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে শুভেচ্ছা বিনিময় করছে। ভারতের সৈন্যদের সঙ্গে করমর্দন করছে।’
সিডনি ওই প্রতিবেদনে আরো লিখেছেন, ‘যশোর থেকে মাত্র চার মাইল দূরে অবস্থানকারী ভারতের সৈন্যরা খুলনা অভিমুখে যাত্রা করার নির্দেশের অপেক্ষা করছিল। এ সময় তারা তাদের সাজোয়াঁ যানের উপর দাঁড়িয়ে পতাকা দুলিয়ে আনন্দ প্রকাশ করে এবং সাজোয়াঁ যানের উপর থেকে ছবি তোলার জন্য পোজ দেয়। জিপে করে একদল বিদেশি সাংবাদিক ঝিকরগাছা থেকে যশোর যাচ্ছিলেন। সড়কের দু’পাশে দাঁড়ানো গ্রামবাসী তাদেরকে দেখে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেয় এবং এগিয়ে এসে বিদেশি সাংবাদিকদের সাথে করমর্দন করার চেষ্টা করে।’ তিনি আরো লেখেন, ‘বাসের ভেতর ও ছাদে জনতার উপচেপড়া ভিড়। বাসের যাত্রীরা স্বাধীন বাংলার স্লোগান দেয় এবং সে সময়ের পূর্ব পাকিস্তানের নেতা ও পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে আটক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে বিভিন্ন স্লোগান দেয়।’
মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে যশোরের অবস্থার করুণ বর্ণনা পাওয়া যায় মার্কিন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গের ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ শীর্ষক কবিতায়। ১৫২ লাইনের ওই কবিতায় তিনি দেখিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধকালে জীবন বাঁচাতে হাজার হাজার বাংলাদেশি শরণার্থী যশোর রোড ধরে সারি বেঁধে ছুটছেন ভারতে। তাদের আশ্রয় হচ্ছে শরণার্থী শিবিরগুলোতে। ভারতীয় শরণার্থী শিবিরে বাঙালি শরণার্থীদের চরম দুঃখকষ্ট, ক্ষুধার জ্বালায় কাতর অনাহারি মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা আর মুমুর্ষু বৃদ্ধার চোখেমুখে ‘উন্মাদপ্রায়’ হয়ে যাওয়ার ছবি এঁকেছেন তিনি তাঁর কবিতায়। তিনি একের পর এক শরণার্থী শিবির ঘুরে দেখেছেন হাজার হাজার অসুস্থ, ক্ষুধার্থ মানুষ গাদাগাদি করে মানবেতর জীবনযাপন করছে, কোনোরকম মাথা গোঁজার ঠাঁই করে নিয়েছে ঝুপড়িগুলোতে। খাবার নেই, পানি নেই, স্যানিটেশনের কোনো ব্যবস্থা নেই। নিরীহ-নিরপরাধ মানুষের এই করুণ পরিণতির জন্য যারা দায়ী, যারা টাকা দিয়ে, ইন্ধন দিয়ে পাাকিস্তানকে এই বর্বরতম কাজে উৎসাহ যোগাচ্ছে তাদের মুখোশ উন্মোচন করে বিশ্ববিবেককে জাগ্রত করার অভিপ্রায়ে আমেরিকায় ফিরে গিন্সবার্গ রচনা করেছিলেন তার ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতাটি। এই কবিতা এখন ইতিহাসের একটা অধ্যায়। স্বাধীনতাপরবর্তীকালে কবিতাটি নিয়ে অনেকে গান গেয়েছেন, হয়েছে নাটক। একটি কবিতাই একটি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে উপস্থাপন করেছে যেন।

তথ্যসূত্র
১.    ‘মুক্তিযুদ্ধে যশোর’। লেখক আসাদুজ্জামান আসাদ
২.    যশোর গেজেটিয়ার
৩.    ‘পুলিৎজার বিজয়ী সাংবাদিক সিডনির চোখে যশোরের মুক্তিযুদ্ধ’-৬ ডিসেম্বর ২০১৪, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা
৪.    বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত যশোরের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রকাশিত সংবাদ ও নিবন্ধ

লেখক : সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী

আরও পড়ুন