ভয়ঙ্কর নেশার জালে স্কুলগামীরাও

আপডেট: 02:11:07 22/05/2018



img
img
img

সামিউল মনির, শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) : অষ্টম শ্রেণিতে লেখাপড়া করছে ব্যবসায়ী বাবার একমাত্র ছেলে ১৪ বছরের ওয়াসিম (ছদ্মনাম)। শ্যামনগর উপজেলা সদরের প্রানকেন্দ্র গোপালপুরের পৈত্রিক বাড়িতে পরিবারের সঙ্গে বসবাস তার। পড়ালেখা করছে উপজেলার সবচে’ প্রাচীন শতাধিক বছরের পুরনো নকিপুর এইচসি পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে।
সপ্তম শ্রেণিতে লেখাপড়ার পুরো একটি বছর স্কুলে অনিয়মিত হলেও সমবয়সী থেকে শুরু করে দু-তিন শ্রেণি উপরে অধ্যায়নরত বড়দের সঙ্গে আড্ডায় নিয়মিত ছিল সে। অসম বয়সীদের সঙ্গে তার এই সখ্য গড়ে উঠেছিল শুধু দলবদ্ধভাবে ইয়াবা সেবনের কারণে।
ভয়ঙ্কর হলেও সত্য, এমন স্বীকারোক্তি মিলেছে স্কুলপড়ুয়া কিশোরটির মুখ থেকে।
তার দাবি, সে বাবাকে বন্ধুদের সঙ্গে মিলে প্রায়ই ইয়াবা সেবন করতে দেখতো। শুরুতে বিষয়টি অসহ্য লাগতো। তবে এক পর্যায়ে সেও জড়িয়ে পড়ে এমন আত্মঘাতী নেশায়। এখন বাবার অনুপস্থিতিতে ফোনে বন্ধুদের ডেকে বাবার ব্যবহৃত সরঞ্জামাদি নিয়ে নিজ বাসায়ই আসর বসায় সে। এছাড়া সুযোগ হলে অন্য বন্ধুদের বাসায়ও মাঝেমধ্যে একত্রিত হয়ে ইয়াবা সেবন করার কথা অকপটে জানায় ওয়াসিম।
একই বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র সামাদ (ছদ্মনাম) জানায়, তার সহপাঠীদের অনেকেই এখন ইয়াবার নেশায় আসক্ত। নিজে মাঝেমধ্যে ইয়াবা সেবন করে স্বীকার করে সে জানায়, প্রায়ই বন্ধুরা তার সামনে এগুলো নিয়ে আলোচনা করতো। তার সামনে নিয়মিত এসব নিয়ে বন্ধুদের আলোচনায় একটা সময় আগ্রহ তৈরি হওয়ায় একপর্যায়ে সে-ও জড়িয়ে পড়ে এই চক্রে।
সামাদ আরো জানায়, গত ১৯ অক্টোবর প্রথম ইয়াবা সেবন করে সে। প্রথম অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে সামাদ জানায়, বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে এক সহপাঠী তাকে ফোনে বলে, ‘গুটি মিলেছে, তবে মাত্র দুটি’। নতুন অভিজ্ঞতা নেওয়ার মাহেন্দ্রক্ষণ এসে গেছে ভেবে ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে তৃতীয় এক বন্ধুর বাসায় পৌঁছে আসরে মেতে ওঠে তারা।
বন্ধুরা জানায়, সামাদ এ লাইনে নতুন হলেও প্রায় দুইবছর আগে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় প্রথম ইয়াবা স্পর্শ করে তাকে। টাকা পয়সার অভাবে ‘নিয়মিত চলে না’ উল্লেখ করে সে জানায়, মাঝেমধ্যে বন্ধুরা ভাগ-বাটোয়ারা করে আসর বসায়। তবে গত কয়েক মাস ধরে নিজে ইয়াবা থেকে দূরে রয়েছে বলে দাবি তার।
‘কয়েক মাস দুরে থাকলে ১৯ অক্টোবর বন্ধুর বাসার আসরে মিলিত হওয়া’ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে নিশ্চুপ থাকে রাজিবুল।
ওয়াসিম, সামাদ কিংবা রাজিবুলদের মতো বিদ্যালয়ের গণ্ডি না পেরুনো শ্যামনগর উপজেলার আরো অসংখ্য শিশু কিশোর এখন ইয়াবায় আসক্ত।
প্রায় সবারই বক্তব্য, ইয়াবা নেওয়ার পর ব্রেন/মাথা থমকে যায়, গলা শুকাতে থাকে, ঘুম হয় না, চোখ-মুখ জ্বালা করে। এমনকি প্রকৃতির ডাক সাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রেও প্রভাব পড়ে। তারপরও কেবল ‘প্যাশোনেট’ হতেই তারা এক-আধবারের জন্য ইয়াবা সেবনের কথা জানায়।
সুন্দরবন তীরবর্তী এ উপজেলার ঈশ্বরীপুর এ সোবহান মাধ্যমিক বিদ্যালয়, নওয়াবেঁকী মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ভুরুলিয়া সিরাজপুর কলেজিয়েট বিদ্যালয়, নুরনগর আশালতা মাধ্যমিক বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইয়াবা আসক্তের সংখ্যা কম না।
ভুরুলিয়া সিরাজপুর কলেজিয়েট বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র নাইমের (ছদ্মনাম) বর্ণনা আরো সাংঘাতিক। তার দাবি, সাত-আট মাস আগে হঠাৎ একদিন তারই সহপাঠী আবিদ (ছদ্মনাম) তাকে বলে, ‘দোস্ত একটা সারপ্রাইজ আছে’। নাইম ‘সারপ্রাইজ’ দেখতে আগ্রহী হলে আবিদ পকেট থেকে দুটি ইয়াবা বের করে দেখায়।
এক পর্যায়ে বেলা একটার কিছু পরে তারা দুইজনে নাইমদের বাসায় যায় এবং নাইমের বাবা-মার বাইরে থাকার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সেখানে ইয়াবা সেবন করে তারা। এরপর থেকে মাঝেমধ্যে বন্ধুদের ডাকে সাড়া দিয়ে ‘ইয়াবা খাই’ জানিয়ে নাইম দাবি করে, তাদের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমিক থেকে দ্বাদশ শ্রেণিতে অধ্যয়নরত অনেকেই এখন ইয়াবায় আসক্ত।
উপজেলা সদরের ঐতিহ্যবাহী একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের উদাহরণ টেনে ছাত্ররা জানায়, ২০১৭ সালের শুরুর দিকে ওই প্রতিষ্ঠানের দশম শ্রেণিতে ছাত্র-ছাত্রী মিলিয়ে মোট শিক্ষার্থী ছিল প্রায় ২২০ জন। চারটি বিভাগে ওই শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় একশ জন ছাত্রী। বাকি ১২০ জন ছাত্রের মধ্যে ৩০ জন নিয়মিত এবং ৫০ জন অনিয়মিতভাবে ইয়াবা সেবনে অভ্যস্ত।
যদিও অপরাপর প্রতিষ্ঠানগুলোর চিত্র এখন পর্যন্ত এমন ভয়াবহ নয়।
বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরুনোর আগেই ইয়াবার মতো ভয়ঙ্কর নেশায় জড়িয়ে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার না করলেও আশঙ্কা উড়িয়ে দেননি প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তারা।
সিরাজপুর কলেজিয়েট বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ আজিয়ার রহমান বলেন, বিভিন্ন সময়ে গুটি কয়েক ছাত্রের বিরুদ্ধে ধূমপানের মতো অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি তাদের অভিভাবকদের অবহিত করে সতর্ক করা হয়েছে সন্তানের দিকে দৃষ্টি রাখার জন্য। তবে কেউ ইয়াবায় আসক্ত- এমন তথ্য তার জানা নেই।
ছাত্ররা বিদ্যালয়ে মাত্র কয়েক ঘণ্টা অতিবাহিত করে উল্লেখ করে তিনি বলেন, উঠতি বয়সীদের অনেকেই এখন এসব নেশায় জড়িয়ে যাচ্ছে বলে তথ্য রয়েছে। তাদের ফিরিয়ে আনতে পরিবারের বন্ধন সুদৃঢ় করার বিকল্প নেই।
নকিপুর এইচসি পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ড. আব্দুল মান্নান বলেন, তার প্রতিষ্ঠানের কেউ এমন নেশায় জড়িত বলে জানা যায়নি। তবে ইতিমধ্যে পুলিশ প্রশাসনসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে একাধিক কর্মশালার আয়োজন করে মাদকের ভয়াবহতা সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তিনি আবার অভিভাবক ও ছাত্রদের অংশগ্রহণে মাদকের কুফল নিয়ে সচেতনতামূলক মতবিনিময় সভার আয়োজন করবেন বলে জানান।
কাঁচড়াহাটি গ্রামের রাশেদুল এবং বল্লভপুর গ্রামের তপন বিশ্বাসসহ অনেকে জানান, মাঝেমধ্যে দুই-একজন মাদক ব্যবসায়ীকে পুলিশ আটক করে। কিন্তু আইনের মারপ্যাঁচে তারা অল্প দিনে কারাগার থেকে বের হয়ে এসে পুরোদমে পুরনো ব্যবসায় জড়িয়ে যায়।
ইয়াবা সরবরাহকারীদের আটক করা গেলে শিশুদের ভয়ংকর ও সর্বনাশা এ পথ থেকে ফেরানো যাবে বলে এসব অভিভাবক মত দেন।
শিশুদের মধ্যে মাদক বিশেষ করে ইয়াবার বিস্তার ঘটনাকে ‘সাংঘাতিক ও ভয়ঙ্কর’ উল্লেখ করে শিক্ষাবিদ অধ্যাপক জিএম ওসমান গনি বলেন, ‘পুলিশ কমিশনার মাহফুজুর রহমানের পরিবার ধ্বংস হয়েছে মাদকের বেড়াজালে জড়িয়ে। বাবা-মার ঘাতক ঐশীকে খুনি বানিয়েছে মরণনেশা মাদক। এমন ঘটনা রোধে আমাদের প্রত্যেকেকে নিজ নিজ সন্তানদের প্রতি আরো যত্নবান হওয়া জরুরি।’

আরও পড়ুন