‘বুকের মানিক তুই কেন নেপাল গেলি?’

আপডেট: 03:10:17 13/03/2018



img
img

জিয়াউস সাদাত, খুলনা : ছেলে মারা গেছেন নেপালে। কখন আসবে মৃতদেহ? কখন শেষ দেখা দেখতে পাবেন- কিছুই জানেন না মা মণিকা পারভিন। শুধু জানেন, আর কোনোদিন ‘মা’ বলে তাকে ডাকবে না আলিফ।
নেপালে পৌঁছে মাকে ফোন দেওয়ার কথা ছিল আলিফের। কিন্তু সেই ফোনকল আর আসেনি। এসব কথা বলছেন আর চিৎকার করে কাঁদছেন ষাটোর্ধ্ব এ জননী।
বাড়ির অন্য সদস্যদেরও কান্না থামছে না। বাড়ি ছাড়িয়ে গোটা এলাকায়ই এখন শোকের পরিবেশ।
সোমবার নেপালের কাঠমান্ডুতে উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় অন্যদের সঙ্গে নিহত হন খুলনার আলিফুজ্জামান আলিফ (৩০)। আজ তার রূপসার বাড়িতে গিয়ে শোকের এই পরিবেশ দেখা যায়।
নিহতের বড় ভাই মো. আশিকুর রহমান হামিম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সরকার, ইউএস-বাংলা কর্তৃপক্ষ কিংবা হাই কমিশনের তরফ থেকে কেউই আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। শুধু খুলনা সিটি করপোরেশনের মেয়র মনিরুজ্জামান মনি সকালে বাড়িতে এসে আমাদের সান্ত¦না দিয়ে গেছেন।’
তিনি বলেন, ‘আমরা দ্রুততম সময়ের মধ্যে আলিফের মৃতদেহ ফেরত চাই।’ এ ব্যাপারে তিনি সরকারের জোরালো পদক্ষেপের দাবি জানান।
আলিফুজ্জামান আলিফ খুলনার রূপসা উপজেলার আইচগাতি গ্রামের বারোপূর্ণের মোড়-সংলগ্ন জিরোপয়েন্ট মসজিদের বিপরীতে (আইচগাতি স্কুল রোড) মোল্লা মো. আক্তারুজ্জামানের ছেলে। তিনি খুলনা বিএল কলেজ থেকে এবার মাস্টার্স পরীক্ষা দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি বঙ্গবন্ধু ছাত্র পরিষদ কেন্দ্রীয় সংসদের সহ-সভাপতি এবং মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড খুলনা জেলা শাখার তথ্য ও প্রচার সম্পাদক ছিলেন। পাশাপাশি তিনি ঠিকাদারি ব্যবসার সঙ্গেও সম্পৃক্ত ছিলেন।
তিন তলা বাড়ির দ্বিতীয় তলায় পরিবারের সঙ্গেই থাকতেন অবিবাহিত আলিফ। ঘরে ঢুকতেই চোখ পড়ে আলিফের ছোট চাচা মো. বাবর আলীর দিকে। আদরের ভাইপোর মৃত্যুশোকে মূহ্যমান তিনি। কেঁদেই চলেছেন আর আলিফের সঙ্গে তার বিভিন্ন স্মৃতির কথা আওড়াচ্ছেন। বলছেন, ‘আমাকে আর কে চাচা বলে ডাকবে? আমার বুকের মানিক তুই কেন নেপালে গেলি?...।’ একাধিকবার চেষ্টা করেও তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
আলিফের খালাতো বোন রাহিমা আক্তার শান্ত জানান, সংবাদ শোনার পর মঙ্গলবার সকাল আটটার ফ্লাইটে তার খালু শাহাবুর রহমান নেপালের উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন। তিনি পৌঁছানোর পরই সঠিক তথ্য জানার আশা করছেন স্বজনরা।
তিনি জানান, দুর্ঘটনার খবর শোনার পর আলিফের অসুস্থ বাবা আরো অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। আর মাও কারো সঙ্গে কথা বলার মতো অবস্থায় নেই। সবাই বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, আলিফ স্থানীয় বেলফুলিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং খুলনার আহসান উল্লাহ কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দেন। এরপর ২০০৭ সালে তিনি কাজের সন্ধানে সৌদি আরবে যান। সেখান থেকে ২০১০ সালে ফিরে আবার খুলনা সিটি কলেজে ভর্তি হয়ে ডিগ্রি পরীক্ষা দেন। সবশেষে তিনি বিএল কলেজ থেকে মাস্টার্স পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছিলেন। এখনো কয়েকটি পরীক্ষা বাকি রয়েছে।
বড় ভাই মো. আশিকুর রহমান হামিম জানান, আলিফ রাজনীতি এবং ঠিকাদারি করতেন। তার ইচ্ছা ছিল সংসদ সদস্য পদে নির্বাচন করা।
তিনি জানান, আলিফের বন্ধুরা নেপালে চলমান বাণিজ্যমেলায় স্টল দিয়েছেন। সেখানে বেড়াতে যাওয়ার জন্যই আলিফ চার দিনের সফরে নেপাল যান। কিন্তু দুর্ঘটনার পর থেকে তাদের সুখের সংসারে অমানিশার অন্ধকার নেমে এসেছে।
এদিকে, কাঠমান্ডুতে ইউএস-বাংলার উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় পড়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে আলিফদের আইচগাতির বাড়িতে আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশসহ বহু মানুষ ভিড় করেন। তারা বাড়িতে এসে আলিফের খবর জানার চেষ্টা করছেন।

আরও পড়ুন