পরিবহন খাতে মাফিয়াতন্ত্র

আপডেট: 04:00:41 17/08/2018



img

এন ইসলাম

রাস্তায় লাশের স্তূপের জন্য দায়ী কে? এই প্রশ্নের উত্তরে দেশের শিক্ষিত-অশিক্ষিত, বুদ্ধিজীবী-এমপি, আমলা-মন্ত্রীসহ সমাজের এমন কোনো মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না যে চালককে দায়ী করবে না। বিগত দিনে বেশকিছু গবেষণাতেও উঠে এসেছে চালকদের অদক্ষতা ও গাফিলতির তথ্য। ফলে সর্বজনবিদিতভাবে প্রমাণিত যে, সড়কে লাশের স্তূপের জন্য চালকরাই দায়ী।
আমরা যারা প্রতিদিন গণপরিবহনে যাতায়াত করি আমাদের নতুন করে বলে দিতে হবে না পরিবহন শ্রমিকদের অমানবিক দুর্ব্যবহারের কথা। প্রায় সময় শ্রমিকদের অকথ্য ভাষা শুনলে লজ্জায় মাথা হেট হয়ে আসে, মুখে কাপড় দিয়ে অন্যদিকে মুখ করে থাকতে হয়, প্রতিবাদের ভাষা ও সাহস হারিয়ে যায়। মনে হয় ওরা কোনো বাপের ঔরস থেকে মায়ের পেটে জন্ম নেয়নি, এদের বাড়িতে স্ত্রী-পুত্র-কন্যা নেই। এবং এরা কোনো মনুষ্য সমাজে বসবাস করে না। রাস্তায় চলা আবাল-বৃদ্ধ, নারী-পুরুষ এমন কেউ নেই যে কিনা পরিবহন শ্রমিকদের অমানবিক আচরণের শিকার হয় না। এই অমানবিকতা এতটাই নির্মম যে, সামান্য বচসার জের ধরে চলন্ত গাড়ির টায়ারের তলে ফেলে হত্যা, মহিলাদের শ্লীলতাহানি, খালি বাসে মহিলা যাত্রীকে ধর্ষণ, এমনকি ধর্ষণ শেষে হত্যার ঘটনাও ঘটছে। এসব অপকর্মের কোনো প্রতিবাদ বা আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করলেই ধর্মঘট ও গাড়ি আাড় করে রাস্তা বন্ধ করে মানুষকে জিম্মি করা হয়। ফলে সাধারণ মানুষের মতো প্রশাসনও অসহায়, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারে না। যার ফলে মানুষ শ্রমিকদের উপর প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ ও ক্ষিপ্ত। সুযোগ পেলেই শ্রমিকদের গণপিটুনি ও গাড়ি ভাঙচুর করে মানুষ তাদের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। এসব ঘটনায় কেউ যদি শ্রমিকদের পক্ষে কথা বলে, মানুষ তাকেও তুলাধুনা করে ছাড়ে। এবং সেই মানুষটিও সভ্য! মানুষদের শত্রুতে পরিণত হয়।
গত ২৯ জুলাই রোববার বিমানবন্দর সড়কে দুই চালকের যাত্রী উঠানো নিয়ে বেপরোয়া প্রতিযোগিতায় ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র আবদুল করিম রাজীব (১৭) ও একাদশ শ্রেণির ছাত্রী দিয়া খানম মিম (১৬) নিহত হলে বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা শতাধিক গাড়ি ভাঙচুর ও ঘাতক গাড়িটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এবং পরদিন থেকে এ-ঘটনার প্রতিবাদে ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে হাজার হাজার কোমলমতি শিক্ষার্থী রাস্তায় নেমে আসে। প্রথমদিকে প্রশাসন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লেও পরবর্তীতে কোমলমতি শিশু-কিশোরদের উপর নানামুখী নির্যাতন নেমে আসে। সরকারের ভয়-ভীতি উপেক্ষা করে ছাত্রছাত্রীদের এই অভাবনীয় আন্দোলন দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করে। এবং এসব ছাত্রছাত্রীর বেশকিছু সাহসী কর্মকাণ্ড সর্বমহলে প্রশংসা কুড়ায়।
শিক্ষার্থীদের ক্ষুব্ধ হবার আরো একটি কারণ পরিবহন শ্রমিকনেতা নৌপরিবহনমন্ত্রীর এ ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় মিডিয়াতে দাঁত কেলানো হাসির ছবি ইন্টারনেটে ভাইরাল হওয়া। আপামর জনসাধারণও তার এই দাঁত কেলানো হাসিতে শুধু যে ক্ষুব্ধ হয় তাই নয়, তীব্র নিন্দা ও ধিক্কার জানায়। একই সাথে নতুন করে সড়ক দুর্ঘটনার কারণ ও প্রতিকারের পুরনো বিষয়টি সামনে চলে আসে। দেশের আমজনতাসহ বাঘা বাঘা বুদ্ধিজীবী ও বিশেষজ্ঞরা খুনি চালকদের গ্রেফতার ও ফাঁসির দাবিতে মিডিয়াগুলো সরগরম করে তুলতে থাকে।
অবস্থা বেগতিক বুঝে ঘাতক জাবালে নূর গাড়ির মালিকসহ সব স্টাফকে গ্রেফতার ও ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ঘটনার তদন্তে উচ্চ পর্যায়ের কমিটিও গঠন করা হয়। দুর্ঘটনারোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে দেশের প্রধান বিচারালয় থেকেও একের পর এক নির্দেশনা ও রুল জারি করা হয়।
দেশের শীর্ষস্থানীয় এনজিও ব্র্যাকের গবেষণা মতে, ‘সড়ক দুর্ঘটনার জন্য চালকের বেপরোয়া মনোভাব, ত্রুটিপূর্ণ রাস্তাঘাট, ১৮ লাখ অবৈধ চালক, ৯০ শতাংশ চালকের বেপরোয়া গাড়ি চালানো ও ৫৭ শতাংশ ত্রুটিপূর্ণ রাস্তাঘাট দায়ী।’
দৈনিক ইত্তেফাকের পক্ষ থেকে একজন বর্ষীয়ান চালকের কাছে দুর্ঘটনার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, বেশিরভাগ সড়ক দুর্ঘটনার জন্যে চালকদের অতিরিক্ত পরিশ্রমজনিত ঘুম দাযী। তার মতে, অতিরিক্ত  ডিউটি, ইঞ্জিনের গরমে চালকরা ক্লান্ত হয়ে পড়েন। এরকম অতিরিক্ত পরিশ্রমের কারণে ঘুমে ঢলে গিয়ে তিনি নিজেও একবার দুর্ঘটনা ঘটিয়েছিলেন।
তার মতে, অতিরিক্ত পরিশ্রমের পাশাপাশি ত্রুটিপূর্ণ রাস্তা ও ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকে ওভারটেক করতে গিয়েও অনেক দুর্ঘটনা ঘটে।
অতিরিক্ত জোরে গাড়ি চালানো, যখন তখন ওভারটেক করা, প্রশিক্ষণ না থাকা, আইন কানুন না মানা- এসব কতোটা দায়ী জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি আইন জানলেও দেখা গেছে অটোবাইক বা সিএনজি চালক বা রিকশাওয়ালা নিয়ম জানে না। তাদের যখন তখন ওভারটেক করার কারণে ওই গাড়ি হয়তো বেঁচে গেল, কিন্তু তখন একটা গাড়ি হয়তো আরেকটা গাড়িকে মেরে দিলো।’
আমরা সকলেই জানি পরিবহন সেক্টর দেশের অর্থনীতির চালিকা শক্তি। পরিবহন শুধু নিজে চলে না, দেশের অর্থনীতিকেও চালিত করে। বৃহৎ এই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয় অশিক্ষিত অল্পশিক্ষিত একদল শ্রমিকের দ্বারা। তাই সড়ক দুর্ঘটনার কারণে পৌঁছাতে হলে প্রথমে নজর দিতে হবে পরিবহন সেক্টরে শ্রমিকদের মজুরি পরিশোধের নিয়ম ও কর্মঘণ্টার দিকে।
এই সেক্টরের শ্রমিকদের জন্য কোনো মজুরি কাঠামো নেই।  খাতাপত্রে বহু আইন বিধিমালা ও অধ্যাদেশ জারি আছে, কিন্ত বাস্তবে তার কোনো বাস্তবায়ন ও প্রয়োগ নেই। এখনো পর্যন্ত শ্রমিকদের মজুরি পরিশোধ হয় খোরাকি হিসেবে এবং কর্মঘণ্টা নির্ধারিত হয় আপ-ডাউন হিসেবে। শুধুমাত্র দূরপাল্লার গাড়ির স্টাফরা মালিকের তরফ থেকে মোটামুটি চলার মতো খোরাকি পায়। লোকাল ও মাঝারি পাল্লার বাস, মিনিবাসগুলো চলে কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে, কনডাকটরের দায়িত্ব তেল খরচ, রোড খরচ, টারমিনাল ও কাউন্টার চার্জ, মালিক সমিতি, শ্রমিক ইউনিয়ন, হস্তান-মস্তানের দৈনন্দিন চাঁদা পরিশোধ করার পর ড্রাইভার, হেলপার ও নিজের খোরাকি রেখে মালিককে সন্তোষজনক ক্যাশ বুঝে দেওয়া।
কখনো কখনো মালিকের ক্যাশ কম হলে তাদের চাকরি থাকে না। তাই চাকরি বাঁচাতে মালিককে সন্তুষ্ট রাখার জন্য নিজেদের খোরাকি থেকেও মালিকের ক্যাশ পূরণ করে দিতে বাধ্য হয় শ্রমিকরা। মালিককে  বেশি ক্যাশ দেখিয়ে নেক নজরে থাকার প্রতিযোগিতাও নেহাত কম হয় না।
ট্রাকচালকরা মজুরি পায় কমিশন সিস্টেমে। কোনো কোনো মালিক দৈনিক হারে চুক্তি করে দিয়ে থাকেন। পরিবহন সেক্টরে সব থেকে বড় চাঁদাবাজিও হয় ট্রাকে। আবার ট্রাকের ভাড়া পাওয়া না পাওয়া নির্ভর করে সারাদেশে গড়ে উঠা দালাল সিন্ডিকেটের উপরে। ফলে ট্রাকচালকদেরও আগে গেলে আগে ভাড়া পাওয়ার  প্রতিযোগিতায় নামতে হয়। এই প্রতিযোগিতার কবলে পড়ে প্রাণ যায় অনেকের। সেই সাথে বাড়তি পয়সার ধান্ধা করতে গিয়ে নাওয়া-খাওয়া, ঘুম হারাম হয়ে যায় ট্রাকচালকদের।
অপরদিকে, বাসমালিকরা যে খোরাকি নির্ধারণ করে দেয় তাতে সংসার চলে না। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মালিকের মুনাফা ও যাত্রীসেবা দিয়ে চুরির টাকায় চুরির বদনাম নিয়েই তাদের সারাজীবন চলতে হয়। তার উপরে রাস্তায় যাত্রী না থাকলে চুরি তো দূরে থাক খোরাকির টাকাও জোটে না। ফলে শ্রমিকরা বাধ্য হয় রাস্তায় প্রতিযোগিতায় নামতে। তার আগের গাড়ি যদি সামনের স্টপেজে আগে পৌঁছায় তাহলে সে যাত্রী পাবে না। সঙ্গত কারণেই যত প্রতিযোগিতা হয় সব যাত্রী উঠানো নিয়ে।
প্রতিযোগিতার আরো একটি কারণ টাইমিং, শ্রমিকদের ভাষায় ‘টাইমের গাড়ি’ এমনিতেই অধিকাংশ ফিটনেসবিহীন ডেট এক্সপায়ার্ড গাড়ি, তার উপরে ভাঙাচোরা খানাখন্দকে ভরা অপ্রশস্ত রাস্তা, রাস্তার উপর হাটবাজার বসার কারণে যানজট লেগে থাকে। রিকশা, ইজিবাইক, টেম্পু, নসিমন, সিএনজি, মোটরসাইকেল, বাইসাইকেল, পথচারী ঠেলে ঠিকমতো গাড়ি চালানো যায় না। মালিকদের বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারলে আবার জরিমানা গুনতে হয়।
অন্যদিকে গাড়ি যদি স্লো চলে তাহলে যাত্রীদেরও নানান কটু কথা শুনতে হয়। বেপরোয়া গাড়ি চালানোর বিরুদ্ধে যে ব্যক্তি রাস্তায় গলা ফাটায়, টক শোতে বসে টক-টক কথা বলে শ্রমিকদের বিরুদ্ধে মানুষের মন মেজাজ টক করে তোলে, প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখে চালকদের মুণ্ডপাতের দাবি করে, সেই লোকটিও হয়তো গণপরিবহনে উঠে আস্তে গাড়ি চালানোর দায়ে চালককে ভর্ৎসনা করতে থাকে।
গণপরিবহন খাতের চরম অব্যবস্থাপনা, মাস্তানি, চাঁদাবাজি, রাস্তার বেহাল দশা, অনিয়ন্ত্রিত ট্রাফিক ব্যবস্থার কারণে নির্ধারিত গতিসীমাতেই গাড়ি চালানো যায় না। তারপরেও টাইমলি গন্তব্যে পৌঁছানোর যে প্রতিযোগিতা হয় তা শুধু নিছক আগে পৌঁছানোর প্রতিযোগিতা নয়। এ হলো, শ্রমিকদের রুটি-রুজির আর মালিকের মুনাফার প্রতিযোগিতা। যে প্রতিযোগিতায় শ্রমিকদেরকে মালিক শ্রেণি ও চলমান রাষ্ট্রব্যবস্থা ঠেলে দিয়েছে। যার খেসারত শুধু যাত্রী সাধারণ নয়, শ্রমিকদেরকেও দিতে হয়।

দুর্ঘটনায় শুধু যাত্রী বা পথচারী মরে না, বহু শ্রমিকেরও মৃত্যু ঘটে। কত শ্রমিক যে পঙ্গু হয়ে দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করে তার হিসাব কেউ রাখে না। অথচ এই প্রতিযোগিতার দায়ভার সব দোষ নন্দ ঘোষের এবং উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপানোর মতো, সব দোষ চালকদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে শ্রমিক ও জনসাধারণকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছে।
আরো একটি গুরুতর অভিযোগ শ্রমিকদের বিরুদ্ধে। তা হলো, ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানো। বিনা লাইসেন্সে গাড়ি চালানোই যেন দুর্ঘটনার সব কারণ। অথচ লাইসেন্সের সাথে দুর্ঘটনা ঘটা না ঘটার কোনো সম্পর্ক নেই।
এটা আইন মানা না মানার প্রশ্ন। আইনের ভাষায় যাকে বলা হয় বেআইনি কর্মতৎপরতা। লাইসেন্সের মধ্যে এমন কোনো যাদুমন্ত্র লুকিয়ে থাকে না যে, তার জাদুবলে একজন চালক দক্ষ হয়ে উঠবে এবং তার দ্বারা কোনো দুর্ঘটনা ঘটবে না।
একমাত্র একজন দক্ষ চালক পারে যে কোনো পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিয়ে দুর্ঘটনা এড়াতে। তাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব পরিবহন সেক্টরে দক্ষ চালক তৈরির কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
এমনিতেই অমর্যাদাকর এই পেশায় একান্ত দায় না ঠেকলে অশিক্ষিতরাই আসতে চায় না। গাড়ির মালিক যতটা আভিজাত্যের প্রতীক ততোটাই অসম্মানের প্রতীক শ্রমিকরা। বর্তমানে একজন রাজমিস্ত্রির জোগালের আট ঘণ্টার হাজিরা গড়ে ৪০০ টাকা। অথচ কোটি টাকার গাড়ি চালানো ৮-১০ হাজার টাকা মাইনের চালককে ডিউটি করতে হয় ১২-১৬ ঘণ্টা। ধনীদের বিলাসিতা ও মুনাফার জন্য প্রতিদিন যত গাড়ি বাজারে আসে তত দক্ষ চালক তৈরি হবার যথেষ্ট ইনস্টিটিউট রাষ্ট্র বা ব্যক্তি পর্যায়ে নেই। তাহলে এই গাড়িগুলো চালাবে কারা? দু’কলম লেখাপড়া জানা মানুষই বা স্বল্প মজুরির অমর্যাদাকর এই পেশায় আসবে কেনো? ফলে গাড়ি যত বিলাসবহুল আর যত কোটি টাকা দামের হোক না কেনো অদক্ষ অশিক্ষিত মানুষেরাই একমাত্র ভরসা।
বাস্তবতা হলো পরিবহন সেক্টরে চালক হিসেবে আমরা যাদের দেখি তারা উঠে আসে দরিদ্র পরিবার থেকে। ১২-১৪ বছরের শিশু শ্রমিকটি বাস-ট্রাকের টায়ার ধুতে ধুতে ওস্তাদের গালাগালি, মারধর খেয়ে হেলপার থেকে পর্যায়ক্রমে একজন দক্ষ চালক হয়ে ওঠে। তাদের হয়তো অক্ষরজ্ঞান থাকে না, এই যে অক্ষরজ্ঞান নেই, সেই দোষ কি ওই শ্রমিকের? তবে গাড়ির নাড়ি-নক্ষত্র, রাস্তাঘাট তার মুখস্থ থাকে। এদেরকে সামান্য প্রশিক্ষণ দিলেই এরা অতিদক্ষ চালক হয়ে উঠবে নিঃসন্দেহে। এই সব স্বশিক্ষিত শ্রমিকদের আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থার প্রশিক্ষণ দিয়ে লাইসেন্স দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। অথচ রাষ্ট্র তার দায়িত্ব পালন না করে সমস্ত দায় শ্রমিকদের উপরে দিয়ে থাকে।
ব্রাকের তথ্য মতে, দেশে ১৮ লাখ চালকের লাইসেন্স নেই। এই তথ্য সরকারের অজানা থাকার কথা নয়। এই বিপুল সংখ্যক চালককে লাইসেন্সের আওতায় আনার সরকারি পরিকল্পনা নেই। রাস্তায় গাড়ি দাঁড় করিয়ে জরিমানা করা এই সমস্যার কোনো সমাধান হতে পারে না। যারা ট্রাফিক পুলিশকে টাকা দিয়ে বিনা লাইসেন্সে গাড়ি চালায় তাদেরকে সহজ শর্তে সুযোগ দিলে অবশ্যই এই হার কমবে। এককালীন মোটা অংকের টাকা ও বিভিন্ন কাগজপত্রের আইনি জটিলতার কারণে দরিদ্র চালকেরা লাইসেন্স করতে পারে না। লাইসেন্সের আবেদন ফরমটাও এখনো ইংরেজিতে ছাপা, যার মাথামুণ্ডু কিছুই তারা বুঝতে পারে না।
আবার বিআরটিএ-তে জনবলের এতটাই সংকট যে, আবেদন ফরম পূরণ করার কোনো লোক পাবেন না। ফলে দালালরাই একমাত্র ভরসা। অনেক সময় দালালদের টাকা দিয়েও কোনো কাজ হয় না, পুরো টাকাটাই মার যায়। বাংলাদেশ সৃষ্টি হবার এতবছর পরও বিআরটিএ-র মতো গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরকে কার্যকর হিসেবে দাঁড় করানো হয়নি, এই ব্যর্থতার দায় শ্রমিকরা নিতে পারে না।
গাড়ির ফিটনেস পরীক্ষা করার মতো ন্যূনতম দক্ষ লোকবল নেই। দেশের ৩৬ লাখ যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা করার জন্য আছে মাত্র দশ জন ইনসপেক্টর। বিদ্যমান পদের চার ভাগের এক ভাগ এবং প্রয়োজনীয় লোকবলের  দশ শতাংশ দিয়ে খুঁড়িয়ে চলছে বিআরটিএ। প্রতি পদে পদে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, ঘুষ দিয়েও দীর্ঘসূত্রতার চরম দুর্ভোগের স্বীকার হতে হয় জনসাধারণকে। শাপে বর হবার মতোই ১৮ লাখ লাইসেন্সবিহীন চালক এখন প্রভাবশালীদের সম্পদ। এদের দিয়ে যেমন কম মজুরিতে গাড়ি চালানো যায়, তেমনি  এদের মজুরি থেকে ভাগও বসাতে পারে ট্রাফিক বিভাগ, যার একটা অংশ আবার পৌঁছে যায় ক্ষমতাসীনদের পকেটে।

পরিবহন শ্রমিকদের অমানবিক আচরণের সূরতহাল জানতে হলে ঘুরে আসতে হবে টারমিনালগুলো থেকে। কেননা টারমিনালগুলোই পরিবহন শ্রমিকদের ঘরবাড়ি। বাস-ট্রাকগুলো  শোবার ঘর। তাই অমানবিক আচরণের শিক্ষা-দীক্ষাটাও হয় এই টারমিনাল থেকে। দরিদ্র পরিবার থেকে আসা শিশুশ্রমিকরা টারমিনালে পা দেওয়ার সাথে সাথেই অমানবিক আচরণের সাথে পরিচিত হয়। পরিবহনের সাথে সংশ্লিষ্ট এমন কোনো ব্যক্তি নেই যে কিনা নবাগত শ্রমিকদের সাথে খারাপ আচরণ করে না। টারমিনাল নিয়ন্ত্রণকারী মাস্তান ও ড্রাইভার-কন্ডাকটরদের অকথ্য গালিগালাজ, ফাইফরমাস খাটতে খাটতে অমানবিকতার হাতেখড়িটা হয়ে যায়। সেই সাথে সে পরিচিত হয় বিভিন্ন মাদকের সাথে। সে স্বপ্ন দেখে বড় হয়ে সেও এদের মতো হবে। মাস্তান আর উস্তাদদের আচরণই তাদের কাছে আদর্শ মনে হয়। সে বুক ফুলিয়ে চলে, কাউকে তোয়াক্কা করে না। কারণ সে বুঝে যায় টারমিনালের ‘ভাই’রা তাদের সাথে আছে। ভাইদের বড় ভাই আছে, বড় ভাইদের নেতা আছে, নেতার মন্ত্রী আছে। উস্তাদদের ইউনিয়ন আছে, কেউ তাদের কিছু করতে পারবে না।
টারমিনালের বড় ভাইদের কাছে শুধু শ্রমিকরা জিম্মি তা নয়, মালিকরাও জিম্মি থাকে। টিকিট কাউন্টারগুলোর বেশির ভাগ স্টার্টার বড় ভাইদের লোক। বাসস্ট্যান্ডগুলোতেও বড় ভাইদের লোক নিয়োগ দিতে হয়,  নইলে রাস্তায় গাড়ি চলতে দেওয়া হয় না। বড় ভাইদের সন্তুষ্ট ও পুলিশকে মাসোহারা দিয়েই রাস্তায় গাড়ি চালাতে হয়। মালিকরা যত প্রভাবশালী হোক না কেনো টারমিনাল আর রাস্তার নিয়ন্ত্রণ থাকে ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় থাকা বড় ভাইদের হাতে।
অপরদিকে শ্রমিক ইউনিয়নগুলো নিয়ন্ত্রণ করে মালিকরা। দূরপাল্লার পরিবহন কোম্পানিগুলো ইউনিয়নের বড় নেতারা ভাগাভাগি করে করে নেন। এদের নির্বাচনী খরচসহ মাসোহারা দিয়ে পুষে রাখে বাস কোম্পানিগুলো। লোকাল ও মাঝারি পাল্লার গাড়িগুলো থাকে ছোটখাটো নেতাদের ভাগে। ইউনিয়নের নির্বাহী কমিটির সদস্য নির্বাচিত করে আনতে ২-৪ লাখ টাকা খরচ করতেও মালিকরা দ্বিধা করে না। বড় পদের জন্য ২৫-৩০ লাখ পর্যন্ত খরচ করা হয়। অথচ শ্রমিকদের কোনো প্রকার আইনি অধিকার দিতে মালিকরা রাজি না।  মালিক সমিতি ও শ্রমিক ইউনিয়নের মধ্যে এই ‘মাসতুতো ভাই’ সম্পর্কে এখন আর কোনো রাখঢাক নেই। শাপ ও নেউলের এ এক অভূতপূর্ব মিলনমেলা। তাই পরিবহন সেক্টরে শ্রমিকদের কোনো ইউনিয়ন নেই। যা আছে সবই মালিকদের পোষ্য ইউনিয়ন। যেকারণে পরিবহন সেক্টরে যতযাই হোক, শ্রম আইন বাস্তবায়নের কোনো আন্দোলন হয় না।
সাধারণ শ্রমিকরাও তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন না। দুর্ঘটনাজনিত পঙ্গু হলে বা অবসর নিলে অথবা পরিচয়পত্র জমা দিলে ইউনিয়নের পক্ষ থেকে কিছু আর্থিক সুবিধা পেয়ে থাকে। তাতেই তারা মহাখুশি। শ্রমিক ইউনিয়ন, মালিক সমিতি ও পাওয়ার পার্টির  বড় ভাইদের সমন্বয়ে পরিবহন সেক্টর চলে মাফিয়া স্টাইলে। তবে এই সেক্টরের লোকদের যত বদনামই থাকুক না কেনো এদের শক্ররাও নীতিহীনতার বদনাম দিতে পারবে না। যখন যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেনো এই সেক্টর নিয়ন্ত্রণকারীরা পাওয়ার পার্টি ছেড়ে যায় না।  পুলিশ প্রশাসনের নাকের ডগায় টারমিনালের নিয়ন্ত্রণ ও শ্রমিকদের জিম্মি করে প্রতিদিন সারাদেশ থেকে যে কোটি কোটি টাকা চাঁদা আদায় হয় তার ভাগবাটোয়ারা নিশ্চিত করতে হলে পাওয়ার পার্টির ছত্রছায়ায় থাকার বিকল্প নেই। পাওয়ার পার্টিও তাদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে এই সব মাফিয়া দুর্বৃত্তদের আশ্রয় প্রশ্রয় দিয়ে থাকে।
দেশের জনগণের জান-মালের নিরাপত্তা ও  নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দায়িত্ব যাদের উপর ন্যস্ত, তারা নিজেদের কায়েমি স্বার্থ টিকিয়ে রাখতে দেশের গুরুত্বপূর্ণ  এই খাতকে কুক্ষিগত করে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে রাখে। যাদের অব্যাহত লুটপাটের কারণে পরিবহন খাত মৃত্যুদূতে পরিণত হয়ে আছে, আমরা তাদেরকে দায়ী না করে, যারা বেঁচে থাকার জন্য সামান্য কয়টা পয়সার বিনিময়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমাদের সেবা দেয়, আমরা যখন সেই হতভাগাদের দিকেই আঙুল তুলি, তখন সত্যিই জানতে ইচ্ছে করে, রাস্তার এই লাশের স্তূপের জন্য আসলেই দায়ী কে?