খালেদা জিয়া রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক অপরাধী : আদালত

আপডেট: 01:41:43 20/02/2018



img

সুবর্ণভূমি ডেস্ক : সরকারি এতিম তহবিলের টাকা এতিমদের কল্যাণে খরচ না করে পরস্পর যোগসাজশে আত্মসাৎ করে খালেদা জিয়াসহ জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার আসামিরা রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক অপরাধ করেছেন বলে আদালতের রায়ে বলা হয়েছে।
রায়ের পর্যবেক্ষণে ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫ এর বিচারক মো. আখতারুজ্জামান বলেছেন, “এ ঘটনায় বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানসহ মামলার ছয়জন আসামির প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে লাভবান হয়েছেন। তারা রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক অপরাধী হিসেবে গণ্য হবেন।”
অর্থনৈতিক দুর্নীতি রাষ্ট্রের অর্থনীতির স্বাভাবিক গতিকে ব্যাহত করে এবং এর বাজে প্রভাব সমাজের প্রতিটি স্তরে সংক্রমিত হয় বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।
এতিমদের জন্য বিদেশ থেকে আসা দুই কোটি দশ লাখ টাকা আত্মসাতের এই মামলায় গত ৮ ফেব্রুয়ারি সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেয় আদালত।
মামলার বাকি পাঁচ আসামি খালেদা জিয়ার বড় ছেলে ও বিএনপির জ্যেষ্ঠ ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান, মাগুরার সাবেক সংসদ সদস্য কাজী সালিমুল হক কামাল, সাবেক মুখ্য সচিব ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী, জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে মমিনুর রহমান ও ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদকে দশ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
রায় ঘোষণার ১১ দিন পর সোমবার বিকেল চারটার দিকে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেন বিচারক। এরপর খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের হাতে রায়ের সত্যায়িত কপি তুলে দেন আদালতের পেশকার মোকাররম হোসেন। পরে দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজলের হাতেও রায়ের কপি তুলে দেওয়া হয়।
এই রায় ঘোষণার পর থেকে পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন সড়কে পুরনো কারাগারে বন্দি আছেন বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া। দণ্ডিত অপর আসামিদের মধ্যে শুধু সালিমুল হক কামাল ও শরফুদ্দিন কারাগারে বন্দি আছেন।
মুদ্রা পাচারের এক মামলায় সাত বছরের সাজার রায় মাথায় নিয়ে তারেক রহমান গত দশ বছর অবস্থান করছেন দেশের বাইরে। কামাল সিদ্দিকী ও মমিনুর রহমানও পলাতক।
রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেন, “মামলার আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে এতিম তহবিলের দুই কোটি ৭১ লাখ ৬৩৪ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। পরিমাণের দিক থেকে এর বর্তমান মূল্য অধিক না হলেও ঘটনার সময়ে ওই টাকার মূল্য অনেক বেশি ছিল। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট নামে কোনো এতিমখানার অস্তিত্ব পাওয়া যায় নাই। সেখানে কোনো এতিম বসবাস করে না। এতিমখানার কোনো দালান-কোঠা বা স্থাপনা নেই। ফলে আসামিদের কোনো যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। রাষ্ট্রের যুক্তি গ্রহণযোগ্য।”
রায়ে বলা হয়, নথি পর্যালোচনায় প্রমাণিত হয় খালেদা জিয়া এদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী। তিনি স্বীকৃত মতেই সরকারি কর্মচারী। বাকি উপাদানগুলো এ মামলায় উপস্থিত আছে বলে ইতোমধ্যেই লক্ষ করা গেছে। ফলে খালেদা জিয়ার পক্ষে যে সমস্ত যুক্তি উপস্থাপন করা হয়েছে তা বাস্তবতার নিরিখে গ্রহণ করার কোনো কারণ নেই।
“এছাড়া আসামিদের পক্ষে দাবি করা হয়েছে যে, তিনি (খালেদা জিয়া) আইনের বিধান লঙ্ঘন করেন নাই এবং যে দুটি ট্রাস্টের অর্থ প্রদান করেছেন তাও সঠিক আছে। কিন্তু নথির পর্যালোচনায় আসামিপক্ষ উপস্থাপিত যুক্তি গ্রহণযোগ্য হয়নি।”
বিচারক বলেন, সরকারি এতিম তহবিলের টাকা বিধি মোতাবেক এতিমদের কল্যাণে ব্যয় করা উচিত ছিল। কিন্তু খালেদা জিয়া তার ব্যত্যয় ঘটিয়ে নামসর্বস্ব জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট্রের অনুকূলে এই টাকা স্থানাস্তর করেন।
“সব কিছু বিবেচনা করে এটা প্রতীয়মান হয় যে, আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধি ৪০৯ ও ১০৯ এবং দুদক আইনের ৫ (২) ধারা প্রমাণিত হয়েছে। ৪০৯ ধারার বিধান মতে সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা যে কোনো বর্ণনায় কারাদণ্ডের মেয়াদ দশ বছর পর্যন্ত হতে পারে। আসামিরা একে অপরের সহযোগিতায় অর্থনৈতিক অপরাধ করেছেন এবং সে কারণে তাদের সর্বোচ্চ সাজা দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা প্রয়োজন। তবে আসামিদের বয়স ও সামাজিক অবস্থান এবং আত্মসাৎকৃত টাকার পরিমাণ বিবেচনায় তাদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করা সমীচীন হবে না মর্মে আদালত মনে করেন।”
খালেদা জিয়ার কারাদণ্ডের বিষয়ে বিচারক বলেন, “আসামিদের মধ্যে বেগম খালেদা জিয়া এদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা ছিলেন। তাছাড়াও তিনি একটি রাজনৈতিক দলের কর্ণধার। তিনি একজন বয়স্ক মহিলা। ফলে তার শারীরিক অবস্থা, বয়স এবং সামাজিক পরিচয় বিবেচনা করে দণ্ডবিধির ৪০৯/১০৯ ধারার অধীনে পাঁচ বছর সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা সমীচীন বলে মনে হয়।
“বাকি পাঁচ আসামির ক্ষেত্রেও তাদের বয়স ও সামাজিক অবস্থান বিবচনা করে প্রত্যেককে দণ্ডবিধির ৪০৯/১০৯ ধারার অধীনে দশ বছর সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা উচিৎ মর্মে আদালত মনে করেন।”
রায়ে বলা হয়েছে, দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারায় আসামিকে শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে ‘সশ্রম’ বা ‘বিনাশ্রম’ দণ্ডের বিষয়ে স্পষ্ট কিছু লেখা নেই। সেখানে শুধু ‘ইমপ্রিজনমেন্ট’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। এমতাবস্থায় আইন ব্যাখ্যার সূত্র অনুসারে সব আসামিকে সশ্রম কারাদণ্ড প্রদানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে ২০০৮ সালে এই মামলা দায়ের করেছিল দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক।
সূত্র : বিডিনিউজ

আরও পড়ুন