ধর্মীয় বা ব্যবহারিক- কাজেই আসছে না নলডাঙ্গা দোহা

আপডেট: 03:15:33 11/09/2018



img

তারেক মাহমুদ, কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) : নয় একর আয়তনের জলাকর; যাকে স্থানীয়রা কালীকাতলা বা কালিকাদোহা বলে চেনে। ঝিনাইদহ সদর উপজেলার নলডাঙ্গা ইউনিয়নের নলডাঙ্গা গ্রামে এ দোহার অবস্থান।
দোহার পশ্চিম পাশে রয়েছে সর্বজনিন কালীকাতলা মহাশ্মশান। পূর্ব-দক্ষিণে রয়েছে গঙ্গামন্দির। আর এই মন্দির ধরে দোহায় নেমে গেছে একটি দর্শনীয় সিঁড়ি। যে সিঁড়ি ব্যবহার করে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ প্রতিবছর গঙ্গাপূজা করে থাকেন। এসময় হাজার হাজার মানুষ এই পানিতেই পূণ্যস্নান করে থাকেন। এছাড়া হিন্দু-মুসলিম অধিবাসীরা এই দোহার পানি গোসল ও রান্নাসহ নানা কাজে ব্যবহার করেন।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, শত বছরের বেশি সময় ধরে এলাকার মানুষ এই দোহার পানি ব্যবহার করে আসছেন। এই দোহা সৃষ্টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে রয়েছে মজাদার সব লোকজ কাহিনি।
বহুকাল ধরে মন্দির কমিটিসহ স্থানীয়রা অধিবাসীদের বিভিন্ন সংগঠন সরকারকে রাজস্ব দিয়ে লিজে মাছ চাষ করেন। ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে জেলা প্রশাসন এই দোহাটি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জন্য পূণ্যস্থান এবং এই অঞ্চলের সর্বসাধারণের পানীয় জলের জন্য ‘ইজারাবহির্ভূত জলমহাল’ ঘোষণা করে। ২০১২ সালে মামলা সংক্রান্ত জটিলতায় সরকারের এক আদেশে জেলা প্রশাসক দোহাটি দখলমুক্ত করে তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়ে নেয়। তখন থেকে দোহাটি সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করায় কচুরিপানায় ভরে গেছে। পানি দূষিত হয়ে দোহার বড় বড় মাছসহ দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ মরে যাচ্ছে। ফলে ফলে প্রতিবছর মোটা টাকার রাজস্ব হাতছাড়া হচ্ছে সরকারের। এদিকে স্থানীয় বাসিন্দারা পূজা ও পূণ্যস্নানসহ প্রয়োজনীয় কোনো কাজে এই পানি ব্যবহার করতে পারছে না।
তবে শ্মশান কমিটির দাবি দোহাটি সঠিকভাবে ব্যবহারের জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে বার বার আবেদন করা হলেও তেমন সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। এ নিয়ে ২০১৭ সালের ১২ জুলাই জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর মেজবাউল করিম স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে শ্মশান কমিটিকে লিজ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু শ্মশান কমিটি উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে গেলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। একইভাবে ২০১৮ সালের ২০ আগস্ট অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) খোদেজা খাতুন শ্মশান কমিটির পক্ষে খাস আদায়ের নির্দেশ দেন। তার নির্দেশনার কপি উপজেলা নির্বাহী অফিসারের দপ্তরে নিয়ে গেলেও এখনো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
শ্মশান কমিটির সাধারণ সম্পাদক শ্রীনিখিল দত্ত বলেন, ‘আমি দোহাটি বার বার লিজ বা খাস আদায়ের জন্য আবেদন করে আসছি। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিরা কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছেন না। ফলে দোহাটির শত বছরের ঐতিহ্য নষ্ট হচ্ছে। বিষাক্ত পানির জন্য হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার কাজ ব্যাহত হচ্ছে। ফলে স্থানীয় অধিবাসীরা চরম বেকায়দায় পড়েছে। অন্যদিকে জীববৈচিত্র্য হুমকির মধ্যে রয়েছে।’
শ্মশান কমিটির এই নেতা লিজ, খাস আদায় অথবা সরকারিভাবে হোক- দ্রুত দোহাটির কচুরিপানা পরিষ্কার করে সংরক্ষণের দাবি জানান। তা না হলে দোহাটি একসময় ময়লা আবর্জনায় ভরাট হয়ে যাবে।
ঝিনাইদহ সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার শাম্মী ইসলাম বলেন, ‘এই দোহাটি আমি পরিদর্শন করেছি। দোহাটি নিয়ে আদালতের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। জেলা প্রশাসন কিংবা স্থানীয় কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি দোহাটি দখলে নিতে পারবে না।’
তিনি বলেন, স্থানীয়রা জানিয়েছেন, দোহার পানি কচুরিপানার জন্য নষ্ট হচ্ছে। বড় বড় মাছও নাকি মারা যাচ্ছে। আদালত এ বিষয়ে নিদের্শনা দিলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানান ইউএনও।
ঝিনাইদহের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) খোদেজা খাতুন জানান, এই দোহাটি নিয়ে আদালতে মামলা রয়েছে। যার কারণে জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ নেওয়া যাচ্ছে না।
তিনি জানান, দোহাটিতে কচুরিপানা ভরে গেছে। মাছ মরে যাচ্ছে এমন খবর তার কাছে আছে। এটি বন্দোবস্ত নিতে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন আবেদনও করেছেন।
তিনি বলেন, কোনো দোহা বা বিল-বাঁওড় ২০ একরের বেশি হলে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বন্দোবস্ত দেওয়া হয়। ২০ একরের নিচে হলে উপজেলা প্রশাসন বন্দোবস্ত দিয়ে থাকেন।