যশোরে মুক্তিযোদ্ধা সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যা হলো

আপডেট: 06:09:41 16/12/2017



img
img

স্টাফ রিপোর্টার : মহান বিজয় দিবসে যশোরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে চেয়ার ছোড়া ও টেবিল ভাংচুরের ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় টাউন হল মাঠের ওই অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্য, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ছাড়াও মুক্তিযোদ্ধাসহ অনেক মানুষ উপস্থিত ছিলেন। এই ঘটনা নিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন।
আজ শনিবার সকালে ‘শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল জেলা প্রশাসন। দুপুর পর্যন্ত অনুষ্ঠান চলে। বিশৃঙ্খলার পর উপস্থিত জেলা প্রশাসক মো. আশরাফ উদ্দিন তিন দিনের মধ্যে সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিলে পরিস্থিতি শান্ত হয়।
মুক্তিযোদ্ধা সংসদের জেলা কমান্ডার রাজেক আহমেদ এই ঘটনাটিকে ব্যক্তিগত ক্ষোভ থেকে ঘটানো হয়েছে বলে দাবি করেছেন। অন্যদিকে, মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স (বিএলএফ)-এর জেলা ডেপুটি কমান্ডার রবিউল আলম বলেছেন, ‘মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির দায়িত্ব হস্তান্তর না করার প্রতিবাদে মুক্তিযোদ্ধারা এই ক্ষোভ জানিয়েছেন। জেলা কমান্ডার রাজেক সাহেব অনেক নাটক করে নিজেকে আড়াল করতে পারেন। মিথ্যাকে উনি সত্য প্রমাণ করতে চাচ্ছেন।’
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, টাউন হল মাঠের রওশন আলী মঞ্চে অনুষ্ঠানের শুরুতে মুক্তিযোদ্ধাদের রজনীগন্ধার স্টিকার দিয়ে সংবর্ধনা জানানো হয়। এরপর আলোচকদের নাম ঘোষণার সময় রাজেক আহমেদকে জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার হিসেবে পরিচয় দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দর্শকসারিতে বসে থাকা বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা প্রতিবাদ জানান। তারা রাজেক আহমেদকে ‘ভুয়া’ ও ‘অবৈধ’ আখ্যায়িত করে অবিলম্বে জেলা প্রশাসকের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের দাবি জানাতে থাকেন। চিৎকার-চেচামেচির মধ্যে একজন মঞ্চের দিকে চেয়ার ছুড়ে মারেন এবং দর্শকসারির সামনে থাকা একটি টি-টেবিল আছড়ে ভেঙে ফেলেন।
বিশৃঙ্খলার এক পর্যায়ে রবিউল আলম মঞ্চে উঠে মাইকে মক্তব্য দেন। তিনি জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিকে অবৈধ আখ্যায়িত করে অবিলম্বে জেলা প্রশাসককে দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার দাবি জানান। তারপর রাজেক আহমেদ বক্তব্য দেন। এরপর জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার মুজহারুল ইসলাম মন্টুও একই মঞ্চে উঠে বক্তব্য দেন। পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে জেলা প্রশাসক আশরাফ উদ্দীন মাইক নিয়ে তিনদিনের মধ্যে এ ব্যাপারে একটি সিদ্ধান্ত জানানোর ঘোষণা দিলে পরিস্থিতি শান্ত হয় ও জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে মূল অনুষ্ঠান শুরু হয়।
অনুষ্ঠান শেষে এ বিষয়ে জানতে চাইলে রবিউল আলম সুবর্ণভূমিকে বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধা সংসদের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে চলতি বছরের জুন মাসে। তারপর সরকার ডিসি-দেরকে প্রশাসক নিয়োগ করে দিয়েছে জেলা পর্যায়ে। উপজেলা পর্যায়ে ইউএনওদের, কেন্দ্রে একজন যুগ্মসচিবকে। ডিসি পাঁচমাস ধরে দায়িত্ব গ্রহণ করছেন না। রাজেক সাহেবকে ডিসি তিনটি চিঠি লিখেছেন। তাতে ডিসি লিখেছেন আপনাকে (রাজেক আহমেদ) শেষবারের মতো বলা হলো, আপনি দায়িত্ব বুঝে দেন। রাজেক সাহেব দায়িত্ব বুঝে দেবে না। আমরা আটবার ডিসি সাহেবের সাথে দেখা করে দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার দাবি জানাই। সেটা না হওয়ায় এবং আজকে রাজেক সাহেবকে জেলা কমান্ডার ঘোষণা করায় মুক্তিযোদ্ধারা ক্ষোভে ফেটে পড়েন।’
অন্যদিকে, যশোর জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার রাজেক আহমেদ সুবর্ণভূমিকে বলেন, ‘যশোর সদর উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটির দায়িত্ব ছিল আমার ওপর। সে সময় আমার বন্ধু রবিউল আলম আমাকে এক-দেড়শ মানুষের তালিকা দিয়ে তাদেরকে মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট দেওয়ার জন্য বলে। কিন্তু আমি সরকারের নীতিমালার বাইরে গিয়ে সেটা করিনি। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে নিজের ১১ বছর বয়সী ছোটভাইকেও মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট দিতে বলেছিলেন রবিউল আলম। সেটাও নীতিমালায় না পড়ায় আমি মানিনি। এ কারণে রবিউল আলম আমার ওপর ক্ষুব্ধ।’
রাজেক আহমেদ আরো বলেন, ‘আমার ওপর মুজহারুল ইসলাম মন্টুর ক্ষোভ আমি তার বড়ভাই এএফএম আব্দুর রশিদের ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট বাতিল করে দিয়েছি। কারণ আব্দুর রশিদ মুক্তিযুদ্ধের পর দালাল আইনে জেলখানায় ছিল। বঙ্গবন্ধুর সাধারণ ক্ষমায়ও সে ছাড়া পায়নি। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পর ছাড়া পায় রশিদ। মন্টু জেলা কমান্ডার থাকা অবস্থায় তার এই ভাইকে অবৈধভাবে মুক্তিযোদ্ধা বানায়।’
রাজেক আহমদের অভিযোগ সম্পর্কে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে রবিউল আলম বলেন, ‘এটা কোনো পারসোনাল ব্যাপার না। এটা পারসোনালি ডাইভার্ট করার কোনো সুযোগ নেই।’
ব্যক্তিগত শত্রুতার অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে রবিউল আলম বলেন, ‘এটা কোনো ব্যক্তিগত ক্ষোভের ব্যাপার না। তার সাথে আমার কোনো শত্রুতা নেই। আমি কোনো দিন মুক্তিযোদ্ধা সংসদের দায়িত্বে ছিলাম না, ভবিষ্যতেও নির্বাচন করবো না। বরং গতবার রাজেক সাহেবকে সমর্থন দিয়ে আমরা জেলা কমান্ডার বানিয়েছিলাম। রাজেক সাহেব অনেক নাটক করে নিজেকে আড়াল করতে পারেন। মিথ্যাকে উনি সত্য প্রমাণ করতে চাচ্ছেন।’
যশোরের জেলা প্রশাসক আশরাফ উদ্দীনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন যশোর-৩ আসনের সংসদ সদস্য কাজী নাবিল আহমেদ। অন্যদের মধ্যে আলোচনা করেন যশোরের পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান, যশোর জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার রাজেক আহমেদ, মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স (বিএলএফ)-এর যশোরের কমান্ডার আলী হোসেন মনি এবং অ্যাডভোকেট কাজী আব্দুস শহিদ লাল।
যশোর-৩ আসনের সংসদ সদস্য কাজী নাবিল আহমেদ ঘোষিত তিন দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট আইন, নিয়মনীতির আলোকে জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমিটি নিয়ে একটা সমাধান দেওয়ার জন্য জেলা প্রশাসককে বলেন।
কাজী নাবিল আহমেদ বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধারা দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান।’
সংসদ সদস্য হিসেবে তিনি গর্বিত উল্লেখ করে বলেন, ‘আমার মেয়াদকালীন সময়ে সংসদে মুক্তিযোদ্ধাদের মাসিক ভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করেছেন প্রধানমন্ত্রী। এ কারণে আমি গর্বিত। তারপরও মুক্তিযোদ্ধাদের যথাযথ সম্মান আমরা কোনোদিনই দিতে পারবো না। কারণ দেশমাতৃকার জন্য আপনারা দিয়েছেন আপনাদের জীবন-যৌবন-স্বপ্ন। যার মূল্য দেওয়ার ক্ষমতা আমাদের নেই।’
তিনি অনুষ্ঠান শুরুর সময় ঘটে যাওয়া ঘটনার উল্লেখ করে বলেন, ‘আপনাদের মধ্যে প্রতিবাদী চেতনা যে এখনো টগবগে রয়েছে তা আপনারা দেখিয়েছেন। কিন্তু আপনাদের বয়স হয়েছে। এটাও মাথায় রাখতে হবে। যদিও আপনাদেরকে আমরা আজীবন ৭১-এর বয়সেই দেখে যাবো।’

আরও পড়ুন