তালায় আর্সেনিকে মৃত্যু ১৩ জনের, আক্রান্ত তিন শতাধিক

আপডেট: 03:03:46 31/10/2018



img

ইলিয়াস হোসেন, তালা (সাতক্ষীরা) : সুপেয় পানির সংকট ও মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন সাতক্ষীরার তালা উপজেলার দেড় লাখ মানুষ। আর্সেনিকে আক্রান্ত হয়ে গত ১৫ বছরে একই পরিবারের চারজনসহ ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান।
পরিস্থিতি ভয়াবহ হলেও স্বাস্থ্য বিভাগের তেমন কোনো তৎপরতা নেই। আর জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর প্রত্যেক ইউনিয়নে পুকুর খননের উদ্যোগ নিয়েছে।
স্থানীয়রা বলছেন, উপজেলার কৃষ্ণকাটি গ্রামের জালাল মোড়ল আর্সেনিকে আক্রান্ত হন। একপর্যায়ে তা ক্যানসারে রূপান্তরিত হয়েছে। তাকে কেমোথেরাপি নিতে হয়। তার পরিবারের চার সদস্যসহ গত ১৫ বছরে অনন্ত ১৩ জন মারা গেছেন আর্সেনিকের কারণে। পরিবারটির অন্য সদস্যরাও আর্সেনিকে আক্রান্ত। ওই গ্রামের তিন শতাধিক মানুষও কম-বেশি আর্সেনিকে আক্রান্ত।
তালা উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের বেশির ভাগ এলাকায় নলকূপের পানিতে রয়েছে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক। আর সুপেয় পানি সংকটের কারণে আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করতে বাধ্য হচ্ছেন দেড় লক্ষাধিক মানুষ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জনস্বাস্থ্য বিভাগ দীর্ঘদিন নলকূপের পানি পরীক্ষা করেনি। সংশ্লিষ্ট এই দপ্তরের কেউ এলাকায়ও যাননি। মাঝে মধ্যে এনজিও কর্মীরা এলাকা পরিদর্শন ও জরিপ করলেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা হয়নি।
এই উপজেলায় বেশি ঝুকিতে রয়েছেন তালা সদর, খেশরা, খলিশখালী ও জালালপুর ইউনিয়নের বাসিন্দারা।
নিহতদের পরিবারের সদস্য জালাল মোড়ল জানান, বর্তমানে তিনি আর্সেনিক থেকে মারণব্যাধি ক্যানসারে আক্রান্ত। তাকে নিয়মিত কেমোথেরাপি নিতে হয়। তার ফুফু সরবানু বিবি, বাবা আনসার মোড়ল, বড় ভাই আলাউদ্দীন মোড়ল, ভাই সালাউদ্দীন মোড়ল আর্সেনিক দূষণে মারা গেছেন। পরিবারটির অন্য সদস্যও এই আর্সেনিকের কারণে শারীরিক নানা জটিলতায় ভুগছেন।
প্রতিবেশী পরিবারের সদস্য সাজেদা বেগম জানান, তিনিও আর্সেনিকে আক্রান্ত। বিয়ের পর তার স্বামীর পরিবার যখন জানতে পারেন, তিনি আর্সেনিক আক্রান্ত, তখন তাকে বাপের বাড়িতে রেখে যান।
সাজেদা জানান, আর্সেনিকের কারণে ইতিমধ্যে মারা গেছেন আলাউদ্দিন, সালউদ্দিন, মুনছুর রহমান মোড়ল, শাহানারা বেগম, স্বরূপজান বিবি, সোনাভান বিবি, সোহরাব মোড়ল, ইয়াছিন মোড়ল, সরবানু বিবি, ছবেদ মোড়ল, ফকির মোড়ল এবং জবেদ আলী মোড়ল। আর্সেনিকের ভয়াবহতার কারণে তাদের বাড়িতে আত্মীয়-স্বজনও আসেন না। তারাও স্বজনদের বাড়িতে যেতে পারেন না।
জালালপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মফিদুল হক লিটু বলেন, ‘কৃষ্ণকাটি গ্রামে একই পরিবারের চারজনসহ অনেকেই মারা গেছেন মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করায়। আর্সেনিকের মাত্রা অনেক বেশি হলেও আমার পরিষদ থেকে তাদের জন্য কিছুই করতে পারিনি। তবে টিউবওয়েলগুলোর পানি পরীক্ষা করার উদ্যোগ নিয়েছি।’
তালা উপজেলা স্বাস্থ্যা কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. রাজীব সরদার বলেন, ‘আমরা অনেকের চিকিৎসা দেওয়ার পাশাপাশি আর্সেনিক থেকে রক্ষা পেতে পরামর্শও দিয়েছি। তবে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক কোনো মানুষের শরীরে ঢুকলে সারা শরীরে ক্ষত সৃষ্টি হয়। সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম থাকে।’
সাতক্ষীরা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘জেলার দেবহাটা বাদে আর সব উপজেলার পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা বেশি। সুপেয় পানির সংকট দ্রুত সমাধানে জেলার প্রতিটি ইউনিয়নে পুকুর খনন করা হবে।’

আরও পড়ুন