নিয়োগ পরীক্ষায় প্রথম, তবু দিতে হবে ১২ লাখ!

আপডেট: 02:40:32 20/10/2017



img

আনোয়ার হোসেন, মণিরামপুর (যশোর) : অধম্য মেধাবী হয়েও মণিরামপুরের শাহ্ আলী সিদ্দিকীয়া দাখিল মাদরাসায় নৈশপ্রহরী পদে চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নেন বেলাল হোসেন (২২)।
উচ্চ শিক্ষিত হয়েও সংসারের অভাব অনটনের কথা ভেবে অষ্টম শ্রেণি পাশের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর পদে আবেদন করেছিলেন তিনি। পরীক্ষার ফলাফলে প্রথম স্থান অধিকারও করেন বেলাল। কিন্তু তাতে লাভ হয়নি। সংশ্লিষ্টদের ঘুষ-বাণিজ্যের কাছে হেরে যেতে বসেছেন তিনি। ছয় মাস আগে নিয়োগ পরীক্ষা সম্পন্ন হলেও আজো নিয়োগ পাননি বেলাল।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, উপজেলার নেহালপুরের পাঁচাকড়ি এলাকার শাহ্ আলী সিদ্দিকীয়া দাখিল মাদরাসার নৈশপ্রহরী অবসরে যাওয়ায় পদটি শূন্য হয়। চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি ওই পদে লোক চেয়ে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী আবেদন করেন ওই এলাকার পীর মোহাম্মদ ফকিরের ছেলে মেধাবী ছাত্র বেলাল। এরপর চলতি বছরের ২০ এপ্রিল মাদরাসার প্যাডে সুপার আব্দুস সালামের স্বাক্ষরিত নিয়োগ পরীক্ষার প্রবেশপত্র পান বেলাল। যেখানে ওই মাসের ২৮ তারিখে যশোরের খালধার রোডে আমিনিয়া আলিয়া মাদরাসায় নিয়োগ পরীক্ষায় হাজির হতে বলা হয় তাকে। পূর্বনির্ধারিত সময় অনুযায়ী ওই দিন বিকেল তিনটায় পরীক্ষা অংশ নেয় বেলাল। পরীক্ষায় অংশ নেওয়া নয়জনের মধ্যে প্রথম হন তিনি।
বেলাল বলেন, ‘ওই দিন প্রথমে একবার আমাদের প্রশ্ন দেওয়া হয়। তখন আমার লেখা দেখে এবং নিজের মনোনীত প্রার্থী জসিমের লেখা খারাপ দেখে সভাপতি রফিকুল ইসলাম পরীক্ষা বাতিল করে দেন। পরে আবার নতুন প্রশ্নে পরীক্ষা হয়। তাতেও আমি প্রথম হই। তারপর ডিজি প্রতিনিধিসহ সবাই আমার নাম সুপারিশ করে আমাকে নিয়োগ দিতে বলেন।’
বেলাল জানান, নিয়োগ পরীক্ষার দুই দিন পর তিনি পাঁচাকড়ি নতুন বাজারে মাদরাসার সুপারের সঙ্গে দেখা করেন। কবে নিয়োগ পাওয়া যাবে জানতে চাইলে সুপার বলেছেন, সময় হলে তাকে ডেকে নেওয়া হবে। তখন সুপার তাকে আরো জানিয়েছিলেন, কমিটি ও শিক্ষকরা মিলে সিদ্ধান্ত হয়েছে, যেই চাকরি করতে আসুক না কেন তাকে ১২ লাখ টাকা দিয়ে যোগদান করতে হবে। তাছাড়া প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য জিয়াউর রহমান তার কাছে দশ লাখ টাকা চেয়েছেন বলে অভিযোগ করেন বেলাল।
বেলাল গরিব পিতার সন্তান। তিনি যশোর এমএম কলেজের অনার্স (ইসলাম শিক্ষা) বিষয়ের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। মাত্র চার শতক জমির ওপর জরাজীর্ণ একটি ঘর ছাড়া সম্বল বলতে আর কিছুই নেই তাদের। বাবা পীর মোহাম্মদ ফকির অসুস্থ হওয়ায় ঠিকমতো কাজে যেতে পারেন না। ফলে নিজে মাঠে কাজ করে সংসার ও লেখাপড়া চালাতে হয় বেলালকে।
বেলাল পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে বৃত্তি পেয়েছিলেন। অনার্স দুই সেমিস্টারেও তিনি প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েছেন। সংসারে বাবাকে সাহায্য করতে সপ্তম শ্রেণিতে পড়াকালেই অন্যের জমিতে কাজ করে সংসারের বোঝা টেনেছেন। যেদিন নিয়োগ পরীক্ষা ছিল, সেদিনও তিনি ৫০০ টাকা মজুরিতে অন্যের জমিতে কাজ করেন, জানান বেলাল।
আক্ষেপ করে বেলাল বলেন, ‘সংসারের অসচ্ছলতায় নিজেকে সেইভাবে গড়তে পারিনি। ভেবেছিলাম, চাকরিটা পেলে সংসার খরচের পাশাপাশি লেখাপড়াটা চালিয়ে যেতে পারবো। কিন্তু সভাপতির ঘুষ-বাণিজ্যের কাছে আমার স্বপ্ন বিলীন হচ্ছে। ফলে হতাশা গ্রাস করছে আমাকে।’
বেলালের চাচা নুর ইসলাম ফকির ওই মাদরাসা পরিচালনা কমিটির সাবেক সদস্য। তিনি বলেন, ‘বর্তমান সভাপতি রফিকুল জসিম নামের একজনকে চাকরি দেবে বলে ১১ লাখ টাকা দাবি করে আট লাখ টাকায় রফা করেছেন। জসিমের কাছ থেকে সভাপতি ইতিমধ্যে চার লাখ টাকাও নিয়েছেন।’
ফলে এই নিয়োগ বোর্ড বাতিল করে আবার বোর্ড বসিয়ে সভাপতি জসিমকে চাকরি দেওয়ার পাঁয়তারা করছেন, দাবি নুর ইসলামের। জমিস নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিয়ে তৃতীয় হন।
জানতে চাইলে নিয়োগ বোর্ডের ডিজি প্রতিনিধি ইমন আমীর বলেন, ‘আমরা নিয়োগের ব্যাপারে সুপারিশ করতে পারি মাত্র। নিয়োগ দেওয়ার কাজ কমিটির।’
তিনি এই ব্যাপারে বোর্ডের পরিচালক বরাবর আবেদনের পরামর্শ দেন।
মাদরাসার সুপার আব্দুস সালামের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ত্রিশ নম্বরের পরীক্ষায় অংশ নিয়ে একুশ পেয়ে বেলাল প্রথম হয়েছে। কিন্তু নিয়োগের বিষয়ে আমার হাত নেই। ওটা নির্ধারণ করবেন সভাপতি।’
তবে নিয়োগপ্রত্যাশীর কাছে ১২ লাখ টাকা চাওয়ার ব্যাপারে সুপার কিছু জানেন না বলে দাবি করেন।
অভিযোগের ব্যাপারে বক্তব্য জানতে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি রফিকুল ইসলাম মোড়লের নম্বরে একাধিকবার কল করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়রা বলছেন, রফিকুল নাশকতাসহ ৪-৫টা মামলার আসামি। তাই গ্রেফতার এড়াতে তিনি মোবাইল বন্ধ করে রাখেন।

আরও পড়ুন