ভাটার মধ্যে করাতকল, অবাধে পুড়ছে কাঠ

আপডেট: 01:34:04 17/03/2018



img
img

বিশেষ প্রতিনিধি, ঝিনাইদহ : ঝিনাইদহে ১৩০টি ইটভাটায় চলতি মৌসুমে প্রায় এক কোটি ৩০ লাখ মণ কাঠ পোড়ানো হবে।
যে ভাটাগুলো পরিবেশের ক্ষতি করে এই বিপুল পরিমাণ কাঠ পোড়াবে, তার মধ্যে ১১২টিরই অনুমোদন নেই। বাকি ১৮টি ভাটার মালিক অনুমোদন নিলেও তারাও জ্বালানি হিসেবে কাঠ ব্যবহার করছেন। ২-৪টি ভাটা কর্তৃপক্ষ কয়লা ব্যবহার করলেও পাশাপাশি কাঠের ব্যবহারও অব্যাহত রেখেছেন।
ভাটা মালিকদের একটি সূত্র জানায়, নভেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে শুরু হয়ে জুনের মাঝামাঝি পর্যন্ত চলে ইট পোড়ানো মৌসুম। সাধারণত এক চিমনির ভাটায় মৌসুমে ২৫ থেকে ৩০ লাখ ও দুই চিমনিতে ৫০ থেকে ৬০ লাখ ইট পোড়ানো যায়। গড় হিসেবে এ বছর ঝিনাইদহের প্রতিটি ভাটায় ৫০ লাখ করে ইট পোড়ানো হবে।
ভাটার মালিকদের হিসেব অনুযায়ী এক লাখ ইট পোড়াতে দুই হাজার মণ কাঠ প্রয়োজন। সেই হিসেবে ৫০ লাখ ইট পোড়াতে লাগবে এক লাখ মণ কাঠ। আর ১৩০টি ভাটায় পুড়বে এক কোটি ৩০ লাখ মণ কাঠ। এর পুরোটাই যোগাড় হবে স্থানীয় গাছপালা কেটে; যা পরিবেশের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করেন ঝিনাইদহের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কমিটির আহ্বায়ক মাসুদ আহম্মদ সনজু।
জেলা বন কর্মকর্তা খন্দকার গিয়াস উদ্দিন জানান, ভাটা স্থাপন বা ইট পোড়ানোর ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নিতে হয়। এছাড়া ১২০ ফুট উঁচু চিমনি তৈরির নিয়ম রয়েছে। ব্যারেল চিমনি কোনোভাবেই ব্যবহার করা যাবে না। কয়লা পোড়ানোর উপযোগী ভাটা হতে হবে। গ্রামের মধ্যে, ফসলি জমি বা জনবসতিপূর্ণ এলাকায় ইটভাটা স্থাপন দণ্ডণীয়।
তিনি জানান, ‘জ্বালানি হিসেবে কাঠ পোড়ানো যাবে না’ মর্মে অঙ্গীকার করার পর ইটভাটা স্থাপনের অনুমোদন দেওয়া হয়। কিন্তু অধিকাংশ ভাটামালিক এসব নিয়ম মানতে চান না। আর জনবলের অভাবে তারাও সব সময় অভিযান পরিচালনা করতে পারেন না।
সরেজমিনে দেখা গেছে, হরিণাকুণ্ডু উপজেলার চাঁদপুর এলাকায় এমএস ব্রিকস্-এর মধ্যে করাতকল বসিয়ে নিয়ে কাঠ কেটে তা পোড়ানো হচ্ছে। একই উপজেলার রুমা ব্রিকস্ কাঠ ব্যবহার করছে। সদর উপজেলার রামনগর গ্রামে পাল ব্রিকস্ কর্তৃপক্ষ ভাটার পাশে করাতকল বসিয়ে নিয়েছেন। তারাও কাঠ ব্যবহার করছেন। কালীগঞ্জ উপজেলার কাশিপুর মাঠে অবস্থিত একটি ইটভাটা ব্যাপকভাবে কাঠ পোড়াচ্ছে। কোটচাঁদপুর উপজেলার সাব্দালপুর বাজারের পাশে অবস্থিত রানা ব্রিকস্ জ্বালানি হিসেবে কাঠ পোড়াচ্ছে।
একাধিক কাঠ ব্যবসায়ী জানান, ঝিনাইদহের বেশ কয়েকটি ভাটায় করাতকল রয়েছে, যা সবার নজরে আসেনি। সংশ্লিষ্টদের চোখ এড়িয়ে তারা ভাটার মধ্যে করাতকল বসিয়ে কাঠ কেটে যাচ্ছেন।
ইটভাটার এক মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কয়লা পাওয়ার ক্ষেত্রে অনেক ঝামেলা মোকাবেলা করতে হয়। তাছাড়া কয়লা নগদ টাকায় কিনতে হয়; আর কাঠ বাকিতে কেনা যায়।
এলাকার একাধিক কাঠ ব্যবসায়ী জানান, জেলার বেশির ভাগ ইটভাটায় তারা কাঠ সরবরাহ করছেন।
অপর এক ভাটার মালিক জানান, তারা অনেককে খুশি করে এভাবে কাঠ ব্যবহার করে যাচ্ছেন।
এ বিষয়ে ঝিনাইদহের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. আসাদুজ্জামান জানান, এই সব ভাটার বিরুদ্ধে অভিযান অব্যহত আছে। গত সপ্তাহে শৈলকুপার তিনটি ভাটামালিককে ছয় লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। আরো অভিযান চলবে বলে তিনি জানান।
আর পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কমিটির ঝিনাইদহ জেলা আহ্বায়ক মাসুদ আহম্মেদ সনজু বলেন, ‘প্রশাসনের অভিযান যেন লোক দেখানো না হয়। তারা যেন আইন মানতে বাধ্য হন এবং বন উজাড় বন্ধ হয়।’
এ ব্যাপারে প্রশাসনের আরো কঠোর হওয়া জরুরি বলে তিনি মনে করেন।
অবশ্য পরিবেশ অধিদপ্তর যশোর অঞ্চলের উপ-পরিচালক মিজানুর রহমান জানান, তারা বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন। গত সপ্তাহে মাগুরা জেলায় অভিযান পরিচালনা করেছেন। ঝিনাইদহে এই সকল ভাটার বিরুদ্ধে অভিযান চলবে বলে তিনি জানিয়েছেন।

আরও পড়ুন