ভারতে থিতু হওয়ার চেষ্টায় ‘হুন্ডি কাজল’

আপডেট: 09:06:37 22/04/2018



img

কাজী মৃদুল, কোটচাঁদপুর (ঝিনাইদহ) : কোটচাঁদপুরের এক সময়ের বহুল আলোচিত সিন্ডিকেট ব্যাংকের হোতা ফারুক আহমেদ কাজল সব সম্পত্তি বিক্রি করে ভারতে থিতু হওয়ার চেষ্টা করছেন।
‘হুন্ডি কাজল’ নামে পরিচিত এই ব্যক্তির কাছে অন্তত হাজার কোটি টাকা পাবেন বহু মানুষ; যারা বিপুল লাভের আশায় কাজলের কাছে লগ্নি করেছিলেন। কাজলের দেশছাড়ার খবরে নতুন করে শঙ্কায় পড়েছেন তারা। যদিও  প্রায় দেড় যুগ ধরে কাজল তার নিজ এলাকা কোটচাঁদপুরে নেই। তবু বেঁচে থাকা লগ্নিকারীদের আশা, একদিন কাজল ফিরবেন, আর টাকা ফেরত পাবেন তারা।
প্রায় ১৮ বছর আগে কাজলের সিন্ডিকেট ব্যাংকের পতন ঘটে। তখন বহু মানুষের মধ্যে কান্নার রোল পড়ে যায়। তারা সবাই উচ্চ মুনাফার আশায় কাজলের কথিত সিন্ডিকেট ব্যাংকে টাকা লগ্নি করেছিলেন। লগ্নিকারীদের মধ্যে রাজনীতিক, জনপ্রতিনিধি, সরকারি কর্মী, ব্যবসায়ীসহ সবশ্রেণির মানুষ ছিলেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কাজল সম্প্রতি ভারতের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার হাবড়া থানার বামনগাছী গ্রামের মুন্সিপাড়ার ফকির সাহেবের বাড়ির পাশে জমি কেনেন। জমিটি তার এক আত্মীয় বনগাঁ থানার চাঁদপাড়া এলাকার স্কুলশিক্ষক ফজলুর রহমানের নামে কেনা হয়েছে। ভারতীয় নাগরিক ফজলুর রহমান তার আত্মীয়। ওই জমিতে একতলা বাড়ি তৈরি হয়ে গেছে। এখন চলছে দোতলার কাজ। সা¤্রাজ্যের পতনের পর কাজল ঢাকা ও পশ্চিমবঙ্গে থাকেন। দুই দেশেই রয়েছে তার নানা ধরনের ব্যবসা। ঢাকায় ছেলে-মেয়েদের নামে কিনেছেন ফ্লাট।
এদিকে, কোটচাঁদপুর ও চুয়াডাঙ্গা জেলার জীবননগরে স্ত্রী ও সন্তানদের নামে বেশ সম্পত্তি ছিল কাজলের। পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া ছাড়াও কথিত হুন্ডি ব্যবসার সময় সংগৃহিত টাকায় এগুলো কেনা হয়েছিল। সম্প্রতি সেই সব সম্পত্তি চুপিসারে বিক্রি করে দিয়েছেন।
তবে কাজলের স্ত্রী শামিমা আহমেদ রেটিনা সুবর্ণভূমিকে বলেন, ‘সে তো (কাজল) মানুষের টাকা দিয়ে দেবে বলছে। তবে তার নামে বেশ কিছু মামলা রয়েছে। মামলা চালানোর খরচ জোগাতে জমি বিক্রি করতে হচ্ছে।’
জমি বিক্রি করে মামলা চালালে লগ্নিকারীদের টাকা কোথা থেকে দেবেন?- এমন প্রশ্ন করা হলে রেটিনা উত্তর না দিয়ে চুপ থাকেন।
চেক ডিজঅনারের তিনটি ও হুন্ডি ব্যবসায় টাকা আত্মসাতের অভিযোগে রুজু হওয়া মামলায় কাজলের মোট ১৮ বছরের জেল হয়। এর পর থেকে তিনি ফেরার।
কিন্তু, অভিযোগ উঠেছে, ইদানীং টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বলে কাজলের সম্পত্তি কথিত হুন্ডি এজেন্টদের মাধ্যমে বিক্রির পাঁয়তারা চালাচ্ছেন তার স্ত্রী। সে কারণে মাঝে-মধ্যে কাজলের স্ত্রী কোটচাঁদপুরে এসে অবস্থান করছেন। এর আগেও কাজলের বেশ কিছু সম্পত্তি বিক্রি হয়েছে গোপনে। বাদবাকি প্রায় ২০০ কোটি টাকার সম্পত্তি ভোগদখল করছেন কাজলের আশীর্বাদপুষ্ট কয়েক ‘এজেন্ট’।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শহরের সলেমানপুর এলাকার আব্দুল মাজেদ ও তার ভাই পিকুলের নামে ‘হুন্ডি ব্যবসা’ চলাকালে কাজলের কেনা সম্পত্তি রয়েছে ৭০-৭৫ কোটি টাকার। তাছাড়া কাজল ও মাজেদের নামে রয়েছে যৌথ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট। ওই অ্যাকাউন্টে ২০০০ সালে আট কোটি টাকা ছিল। পরে মাজেদের সঙ্গে কাজলের বনিবনা না হওয়ায় টাকা থেকে যায় ওই অ্যাকাউন্টে; যা বর্তমানে সুদ-আসলে বেড়ে দাঁড়ানোর কথা ৩৫ থেকে ৪০ কোটিতে। যদিও মাজেদ তার সঙ্গে কাজলের যৌথ অ্যাকাউন্ট থাকার কথা অস্বীকার করেছেন।
অপর একটি সূত্র জানায়, ‘হুন্ডির কারবার’ রমরমা থাকাবস্থায় কোটচাঁদপুর কৃষি ব্যাংকে মাজেদের অ্যাকাউন্টে ৭৫ লাখ টাকা আমানত রাখেন কাজল। ফটকা ব্যবসায় ধস নামার পর সুযোগ বুঝে ২০০১ সালে ওই টাকা অ্যাকাউন্ট থেকে তুলে নেন মাজেদ। এ ছাড়াও আজিজ ওরফে মুড়ি আজিজ, রশিদ সরদার, মোজাম্মেল, মফিজসহ বেশ কয়েকজনের নামে কাজল ১০০ কোটি টাকারও বেশি সম্পত্তি কেনেন। ওই সব কথিত এজেন্ট এখনো সেই সব সম্পত্তি ভোগদখল করছেন।
১৯৯৫ সালের প্রথম দিকে কোটচাঁদপুর শহরের সলেমানপুর এলাকার মৃত পচা মিয়ার ছেলে ফারুক আহম্মেদ কাজল কথিত সিন্ডিকেট ব্যাংক খোলেন; স্থানীয়রা যাকে ‘হুন্ডি ব্যবসা’ হিসেবেই জানতেন। ১৯৯৮ সালের দিকে কাজলের এই অবৈধ কারবার প্রকাশ্য রূপ নেয়। বিপুল মুনাফা দেওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ায় পরের বছরের প্রথম থেকে কোটচাঁদপুর ও আশপাশের এলাকার হাজার হাজার মানুষ কোটি কোটি টাকা লগ্নি করেন কাজলের কথিত সিন্ডিকেট ব্যাংকে। অনেক মানুষ সহায় সম্বল বিক্রি করে টাকা জমা রাখেন কাজলের কাছে। লগ্নিকারীদের চাপ সামলাতে নিযুক্ত হন বহু সংখ্যক এজেন্ট। কাজলের পাশাপাশি এই সব এজেন্ট নিজেদের মতো করেও সাধারণ মানুষের কোটি কোটি টাকা লুটে নেন।
আইন প্রয়োগকারী সব সংস্থার সামনে প্রকাশ্যে এই ব্যবসা চলেছে বেশ ক’বছর। কাজল এ ব্যবসা ‘বৈধ’ বলে নিজে ও তার সহযোগীদের দিয়ে প্রচার করার পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময়ে লভ্যাংশ দেওয়ায় লগ্নিকারীদের আস্থাভাজনে পরিণত হন কাজল। যে কারণে ২০০০ সালের জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে কাজল আনুমানিক ৭-৮ শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিতে সক্ষম হন বলে স্থানীয়দের ধারণা। কিন্তু গণমাধ্যমে নেতিবাচক খবর প্রচারের জেরে ওই বছরের মার্চ মাসে কথিত হুন্ডি ব্যবসায় ধস নামে। বিপুল সংখ্যক লগ্নিকারী হামলে পড়েন টাকা ফেরতের আশায়। কাজল লভ্যাংশের টাকা প্রদানে গড়িমসি শুরু করলে লগ্নিকারীদের সন্দেহ ঘনীভূত হতে থাকে। লগ্নিকারীদের টাকা ফেরত না দেওয়ায় ৮ মে কোটচাঁদপুরে সৃষ্টি হয় ভয়াবহ পরিস্থিতি। হাজার হাজার লগ্নিকারী উত্তেজিত হয়ে শহরে ব্যাপক ভাংচুর শুরু করেন। প্রতারক কাজল ও তার কথিত এজেন্টদের বাড়িঘর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আক্রান্ত হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কিছু সুযোগ সন্ধানী লুটপাটও চালান। ওই দিন কাজলকে পুলিশ গ্রেফতার করে।
কাজলের গ্রেফতারের পর টাকা ফেরতের দাবিতে কোটচাঁদপুরে হরতাল, ভাংচুর, অপহরণ অব্যাহত থাকে। এমন পরিস্থিতিতে ২০০০ সালের ৫ জুলাই তখনকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম আসেন কোটচাঁদপুরে। বয়েজ হাইস্কুল মাঠে নাসিম লগ্নিকারীদের সমাবেশে লগ্নিকারীদের উদ্দেশে বলেছিলেন, আপনারা শান্ত হোন, কাজল ও তার এজেন্টদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে আপনাদের লগ্নি করা টাকা ফেরতের ব্যবস্থা করা হবে। অপরাধীরা ৪০ হাত মাটির নিচে থাকলেও সেখান থেকে তাদেরকে বের করে আনা হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কঠোর বক্তব্যে লগ্নকারীরা শান্ত হন। কথা রাখেন লগ্নিকারীরা। উত্তপ্ত কোটচাঁদপুর শহর শান্ত হয়ে আসে। অথচ কথা রাখেনি সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নাসিম। ১৮ বছর অতিবাহিত হতে চললেও কোনো টাকাই ফেরত পাননি লগ্নিকারীরা। ইতিমধ্যে অনেকের মৃত্যু হয়েছে। দায়-দেনায় জর্জরিত হয়ে অনেকে পথে বসেছেন। এখন কথিত সিন্ডিকেট ব্যাংকের প্রধান কাজল ভারতে স্থায়ী হতে পারলে লগ্নিকারীদের সব আশা ধুলোয় মিশে যাবে।

আরও পড়ুন