শোলার মালা

আপডেট: 03:01:15 06/10/2017



img
img

মৌসুমী নিলু, নড়াইল : নড়াইলের শোলা শিল্পীদের প্রধান আকর্ষণ ‘কদম ও ঝরা’ ফুলের মালা। সনাতন ধর্মের লক্ষ্মীপূজা ও কালিপূজাকে কেন্দ্র করেই প্রধানত শোলা শিল্পীরা এই মালা তৈরি করে থাকেন। তবে ঘট পূজা ও মাঘি পূর্ণিমায়ও এ মালা ব্যবহৃত হয়। লক্ষ্মী ও কালিপূজাকে কেন্দ্র করে এ মালা শহরের বিভিন্ন দোকান ও হাট-বাজারে উঠতে শুরু করেছে।
স্থানীয়দের সূত্রে জানা গেছে, লোহাগড়া উপজেলার কোলা দিঘলিয়া, আড়াবাড়ি, সদরের হোগলাডাঙ্গা, হিজলডাঙ্গা, কালিয়া উপজেলার কালুখালি, জেলার উত্তর অংশের শেষ সীমানা শতপাড়া গ্রামের ২২-২৫টি পরিবার শোলা দিয়ে মালা তৈরির পৈত্রিক পেশা এখনো টিকিয়ে রেখেছেন। এক সময় শখের বশে পূর্বপুরুষেরা মালা তৈরি করলেও এখন তাদের উত্তরপুরুষেরা জীবিকার প্রয়োজনে এই কাজ করেন। যারা মালা তৈরি করে থাকেন তাদের স্থানীয়ভাবে সাধারণত ‘মালি’ বলে সম্বোধন করা হয়।
কালিয়ার বাবরা-হাসলা ইউনিয়নের কালুখালি গ্রামের মঞ্জুরানি পাল (৪২) জানান, তারা ‘কদম ও ঝরা’ এই দুই ধরনের মালা তৈরি করে থাকেন। প্রতিটি কদমফুলের মালা শ্রেণিভেদে বাড়ি থেকে পাইকারি ১০-১২ টাকা এবং ঝরা ফুলের মালা ছয় থেকে আট টাকায় বিক্রি করা হয়। জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা শিল্পীদের বাড়ি থেকে পাইকাররা এসব মালা কিনে নিয়ে যান। প্রতি বছর তারা ৫-৬ হাজার মালা তৈরি করে থাকেন।
নড়াইলের উত্তর অংশের সীমান্তবর্তী শতপাড়া গ্রামের নিমাই মালাকার ও মধু মালাকার জানান, লক্ষ্মীপূজাতেই এ মালা বেশি বিক্রি হয়। বিশেষ করে এই পূজাকে কেন্দ্র করেই এ শিল্পকর্মটি বেঁচে রয়েছে। বংশপরম্পরায় তারা এ পেশার সঙ্গে যুক্ত।
সদরের বাঁশগ্রাম ইউনিয়নের হোগলাডাঙ্গা গ্রামের প্রহ্লাদ পাল (৪৮) ও লক্ষ্মণ পাল (২৫) জানান, পরিত্যক্ত নিচু জমিতে শোলা জন্মে। বর্ষাকালে এগুলো সংগ্রহ করতে হয়। জমির মালিকরা শোলাকে আগাছা বিবেচনা করে তা পরিষ্কার করে কৃষি আবাদের দিকে ঝুঁকছেন। এ কারণে শোলার সংকট বাড়ছে। আগে জমি থেকে বিনা পয়সায় এসব শোলা সংগ্রহ করা গেলেও বর্তমানে জমির মালিককে কিছু টাকা দিতে হয়।

কদমফুলের মালা তৈরি হয় যেভাবে
এই হস্তশিল্পে যুক্তরা বলছেন, বিল থেকে শোলা সংগ্রহ করে রোদে ৪-৫ দিন শুকিয়ে মালা তৈরির জন্য প্রস্তুত করতে হয় । প্রথমে শোলা ছুরি দিয়ে তিন ইঞ্চি সাইজের ছোট ছোট চৌকোনা চিকন কাঠি (স্থানীয় নাম গুল) কাটতে হয়। কিছু শোলা চিকন করে কেটে কদমফুল এবং কাগজের মতো পাতলা করে পয়সার মতো কাটতে হয়। মালার নিচে দেওয়ার জন্য পাতার মতো দেখতে কিছু চিলা (স্থানীয় নাম) বানাতে হয়। ফুলটি সেট করতে শোলা দিয়ে চাল ও কিছু পাতি তৈরি করতে হয়। এবার বাজার থেকে বিভিন্ন রঙ এনে মালা তৈরির উপাদানগুলোতে রঙ করতে হয়। সবশেষে রঙ করা কাঠি, কদম, পয়সা, চাল, চিলা ও পাতি লেপ সেলাই করা সুঁই-সুতা দিয়ে চৌকোনা দেখতে এ মালা তৈরি করা হয়।
নড়াইল শহরের রূপগঞ্জ বাজারের ব্যবসায়ী বিপুল বিশ্বাস জানান, পূজার উপাচার হিসেবে লক্ষ্মী দেবীর আসনের মাথার ওপর এই মালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। সনাতন ধর্মের রীতিতে বছরে দুই তিথিতে এই পূজা অনুষ্ঠিত হয়। প্রত্যেক বাড়িতে এই পূজা অনুষ্ঠিত হয় বলে এ মালার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। শহরের বিভিন্ন দোকান ছাড়াও হাটবাজারে এসব মালা বিক্রি হয়। নিয়মানুযায়ী দুর্গাপূজার পাঁচ দিন পর আজ বৃহস্পতিবার লক্ষ্মীপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।