মামলা করে পরিবার নিয়ে দেড় মাস বাড়িছাড়া

আপডেট: 08:49:06 12/03/2018



img
img

আনোয়ার হোসেন, মণিরামপুর (যশোর) : মণিরামপুরের কুলটিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শেখরচন্দ্র ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে মামলা করে বিপাকে পড়েছেন ইউনিয়নের আলীপুর গ্রামের বিশ্বজিৎ হালদার নামে এক ব্যক্তি। প্রাণের ভয়ে গত দেড়মাস বৃদ্ধ বাবা-মাসহ পরিবার নিয়ে তিনি বাড়ি ছেড়ে পথে পথে ঘুরছেন।
তবে চেয়ারম্যান শেখরচন্দ্র বলছেন, বিশ্বজিতের এলাকায় ফেরায় কোনো বাধা নেই।
বিশ্বজিতের অভিযোগ, চেয়ারম্যান শেখরচন্দ্রের কুনজর পড়েছিল তার স্ত্রী সুইটি হালদারের ওপর। আলীপুর গ্রামের ভবেন্দ্রনাথের ছেলে পলাশের মাধ্যমে চেয়ারম্যান কুপ্রস্তাব দেন সুইটিকে। চেয়ারম্যানের কথায় সাড়া না দিয়ে বিশ্বজিতের কাছে বিষয়টি খুলে বলেন সুইটি। এই নিয়ে শুরু হয় শত্রুতা।
বিশ্বজিতের অভিযোগ, তার শিশু ছেলে অয়ন (৭) স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে গত ২৯ জানুয়ারি পলাশের বাড়ির লোকজন কুকুর লেলিয়ে দেয়। অয়ন কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি এসে তার মা সুইটি হালদারকে বিষয়টি জানায়। তখন বিশ্বজিতের মা স্মৃতি হালদার নিষেধ করতে গেলে তাকে ধরে মারধর করে চেয়ারম্যান অনুসারী পলাশের বাড়ির লোকজন। একই দিন বিকেলে হেলারঘাটে বিশ্বজিতের ওপর হামলা করে তাকে মারপিট করে পলাশের লোকজন। তাতেও থামেনি পলাশ। রাত নয়টার দিকে দলবল নিয়ে আবার বিশ্বজিতের বাড়িতে হামলা করে মারপিট ও ভাংচুর করে।
তার অভিযোগ, বিষয়টি নিরসনের নামে পরের দিন ৩০ জানুয়ারি সন্ধ্যায় শালিস ডাকেন চেয়ারম্যান। সেখানে হাজির হলে পরিকল্পিতভাবে চেয়ারম্যানের লোকজন বিশ্বজিৎ, তার বাবা নিতাই হালদার, মা স্মৃতি হালদার, স্ত্রী সুইটি হালদার, কাকা তপন হালদারসহ কয়েকজনকে পিটিয়ে আহত করে। পরে তারা মণিরামপুর হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।
হাসপাতাল থেকে আর বাড়ি ফেরা হয়নি বিশ্বজিতের। আবার হামলার শিকার হওয়ার আশঙ্কায় হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে স্ত্রী, সন্তান ও বৃদ্ধ বাবা-মাকে নিয়ে অন্য এলাকায় আশ্রয় নেন তিনি।
বিশ্বজিৎ বলেন, ‘মারপিটের ঘটনায় ৩০ জানুয়ারি আমার বাবা বাদী হয়ে নয়জনকে আসামি করে মণিরামপুর থানায় একটি মামলা করেন। মামলার তদন্তভার পড়ে এসআই প্রশান্তর ওপর। তিনি আসামিদের সামনে পেয়েও গ্রেফতার করেননি। এখন তারা জামিন নিয়ে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে।’
এদিকে নিজের ওপর হামলা ও নির্যাতনের ঘটনায় চেয়ারম্যান শেখরচন্দ্রসহ সাতজনের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে আদালতে মামলা করেছেন সুইটি হালদার।
বিশ্বজিৎ জানান, সেই মামলার তদন্ত করছে পুলিশ ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। মামলায় যাদের সাক্ষী করা হয়েছে চেয়ারম্যান তাদের নানা ভয় দেখিয়ে তার পক্ষে নিয়ে নিয়েছে। সম্প্রতি পিবিআই সাক্ষীসহ আসামিদের ডেকেছে।
‘আমার যে কাকা (তপন) চেয়ারম্যানের লোকজনের হাতে মার খেয়ে হাসপাতালে ছিল, সেও পিবিআই কর্মকর্তার সামনে সব ঘটনা অস্বীকার গেছেন।’
বিশ্বজিৎ বলেন, ‘গ্রামে বাবা ভ্যান চালাত আর আমি মাঠে কাজ করতাম। সবকিছু ফেলে গত দেড় মাস পথে পথে ঘুরছি। এখন খুব কষ্টে দিন যাচ্ছে। প্রাণনাশের ভয়ে বাড়ি ফিরতে পারছি না।’
‘গ্রামে ফিরলে আমাকে মেরে ফেলবে বলে চেয়ারম্যান চক্রান্ত করছে। আমার স্ত্রীকে গণধর্ষণ করবে বলেও প্রচার করছে। তাছাড়া চেয়ারম্যান তার অনুসারীদের ডেকে আমাকে একঘরে করার ঘোষণা দিয়েছে। আমার আত্মীয় যারা গ্রামে আছে তারা আমাকে ফোন করে সবকিছু জানাচ্ছে,’ বলেন বিশ্বজিৎ।
বিশ্বজিতের অভিযোগ পেয়ে রোববার সরেজমিন গিয়ে তার বাড়িটি তালাবদ্ধ অবস্থায় পাওয়া গেছে। গণমাধ্যম কর্মীর উপস্থিতি দেখে আশপাশের লোকজন সটকে পড়েন। যা দুই একজনকে পাওয়া গেছে তারা কেউ এই বিষয়ে মুখ খুলতে রাজি হননি।
অভিযুক্ত চেয়ারম্যান শেখরচন্দ্র বলেন, ‘কে বলেছে, বিশ্বজিৎ বাড়িছাড়া? তার মা-বাবাতো বাড়ি এসে থাকে। সে নিজেই পালিয়ে বেড়াচ্ছে ষড়যন্ত্র করার জন্য। তার বাড়ি আসতে কোনো বাধা নেই।’
চেয়ারম্যান আরো বলেন, ‘আমি কখনো কোনো অন্যায় কাজ করি না। কোনো দিন বিশ্বজিতের স্ত্রীর সাথে আমার কথা হয়নি। অথচ নারী নির্যাতন মামলায় আমাকে এক নম্বর আসামি করা হয়েছে।’
মণিরামপুর থানার এসআই প্রশান্ত বলেন, ‘আমি এই থানায় নতুন এসেছি। আলীপুর থানা থেকে বেশ দূরে। সেখানকার কাউকে আমি চিনি না। বাদী পক্ষ মামলা করে সরে আছে। আসামি ধরার কাজে আমাকে কোনো সাহায্য করেনি। আমি কয়েকবার এলাকায় গিয়েছি। আসামিদের চিনতে না পারায় ধরা সম্ভব হয়নি। ওই সুযোগে আসামিরা সবাই আদালত থেকে জামিন নিয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আমি এলাকার লোকজনের সাথে কথা বলেছি। বিশ্বজিৎ বাড়ি ফিরলে তার কোনো সমস্যা নেই। সে যদি সমস্যা মনে করে তাহলে থানায় আসুক। আমরা তাদের সাথে করে নিয়ে এলাকায় রেখে আসব।’

আরও পড়ুন