ক্ষমা চাই টুন ভাই

আপডেট: 02:31:34 27/05/2018



img

মিজানুর রহমান তোতা

যশোরের মাটি ও মানুষের সাথে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত প্রথিতযশা সাংবাদিক শ্রদ্ধাভাজন জমির আহমেদ টুন ভাই আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন তিন বছর আগে। ২০১৫ সালের ২২ মে শুক্রবার রাত সোয়া ১১টায় ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন তিনি। নীরবে চলে গেল তার মৃত্যুদিনটি।
আমি আসলে ভুলে গেছি। ক্ষমা চাই টুন ভাই, ক্ষমা করবেন। আফসোস আমি আপনার জন্য ওইদিন একটু দোয়াও করতে পারিনি। এটিই নির্মম সত্য ‘চোখের আড়াল হলে মানুষ মনের আড়াল হয়’। জানি আমার ক্ষেত্রেও তার ব্যত্যয় ঘটবে না। সবাই আমরা যে যার কাজ নিয়ে ব্যস্ত। স্বাভাবিক কিন্তু ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ করে ফেলেছি। আসলে যখন মনে হয় টুন ভাইয়ের কথা তখন স্মৃতিপটে অনেক কথা ভেসে ওঠে। দৈনিক ইনকিলাবের যশোর অফিসে নিয়মিত বসার কারণে ইচ্ছায় অনিচ্ছায় অনেক কথাই বলতেন। তিনি বলতেন ‘জানো তোতা, আমরা সাংবাদিকতার স্বর্ণযুগ পার করলাম, সামনে কঠিন অবস্থা। যে মর্যাদা ঐতিহ্য আছে এটি কী হবে বলা মুশকিল। প্রশাসনের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা, সমাজবিরোধী, পলিটিক্যাল ক্যাডার ও অস্ত্রবাজদের বিরুদ্ধে জোরালো কলম ধরার দিন শেষ হয়ে আসছে। মুষ্টিমেয় সাংবাদিক নামধারীদের জন্য পেশাটির মর্যাদা হচ্ছে প্রশ্নবিদ্ধ।’
মরহুম সাংবাদিক টুন ভাইয়ের বিকল্প ছিল না। তিনি ছিলেন নবীন ও প্রবীণ সাংবাদিকদের সত্যিকারের বন্ধু। তার সবসময় মুখে থাকতো হাসি। শিশুমনের মানুষটি ছিলেন সর্বজনশ্রদ্ধেয়। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জগতে তার ছিল সরব উপস্থিতি। একজন সাদা মনের মানুষ টুন ভাই। যশোর প্রেসক্লাবের ফাউন্ডার প্রেসিডেন্ট জমির আহমে টুন ভাইয়ের বন্ধু তৌহিদুর রহমান ভাইয়ের মাধ্যমে ১৯৬২ সালে মর্নিং নিউজ পত্রিকায় সাংবাদিকতার যাত্রা শুরু করেছিলেন। সেই থেকে তিনি আমৃত্যু সাংবাদিকতার বাইরে অন্য কোনো পেশায় একদিনের জন্যও যুক্ত হননি। আপাদমস্তক তিনি ছিলেন সাংবাদিক। প্রেসক্লাব যশোরের তিনবার প্রেসিডেন্ট ও একবার সেক্রেটারি ছিলেন তিনি।
অনেক পরে আমি তার সাহচর্য পেয়েছি। ১৯৮০ সালে টুন ভাই, আতিউর ভাই (মরহুম), মসিউল আযম, ফারাজী আজমল হোসেন, দেবব্রত সিংহসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্তত ৩০ জন সাংবাদিকের পিআইবির খুলনা ভেনুতে ট্রেনিংয়ে অংশগ্রহণের সময় বিশেষ করে সুন্দরবনের হিরণ পয়েন্টে ট্রেনিং ট্যুর থেকে কাছাকাছি আসার সুযোগ পাই। তিনি তখন দুলদুল ফার্মেসীতে বসে পুরাতন একটা ছোট টাইপ মেশিনে নিউজ টাইপ করতেন। আর আমরা অনেকেই সেটি সেম টেক্সট লিখে টরেটক্কা টেলিগ্রাম করতাম। সেই থেকে টুন ভাইয়ের ব্যক্তিত্ব, সততা, নিষ্ঠা, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাসহ কাজকর্ম দেখে মুগ্ধ হয়ে কোনোদিন কোনোসময় পিছু ছাড়িনি। তিনি প্রেসক্লাবে সভাপতি আর আমি সেক্রেটারি হয়েও একবার কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। তারই হাত ধরে আমি অবিভক্ত যশোর সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি, প্রেসক্লাবের তিনবার সভাপতি হয়েছি।
টুন ভাইয়ের সাথে আমার পারিবারিক সম্পর্ক হয়ে যায়। তিনি আপন কি পর সে হিসাব করেননি কখনো। তিনি আমার বড় ভাই, অভিভাবক, সুখে-দুঃখের সাথী হিসেবে বটবৃক্ষের মতো ছায়া দিয়ে রাখতেন। আমার পিতার মৃত্যুর খবর শুনে আমার গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজের পাশে চরমুরারীদহ গ্রামে গিয়ে আমাকে সান্ত্বনা দিয়েছেন। আমার মেয়ে মিথিলা রহমান লতা ও মিশিলা রহমান পাতার খোঁজ নিতেন সবসময়। আমি স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে যশোর হাসপাতালের করোনারি কেয়ার ইউনিট ও ঢাকায় শমরিতা হাসপাতালে যখন চিকিৎসাধীন ছিলাম, এই একমাত্র ব্যক্তি টুন ভাই আমার পাশে সকাল থেকে রাতঅবধি বসে থাকতেন। সালাম দিলে বলতেন বাম হাত উঁচু করে যেদিন সালাম দিতে পারবে সেদিই আমি সালাম নেব। বিভিন্নভাবে আমাকে সাহস যোগাতেন। আমার মন শক্ত করতে বলতেন। আমি যখন একটু হাত-পা নাড়াতে পারলাম, তখন হুইল চেয়ার এনে বললেন, ‘তুমি যতদিন হাঁটতে না পারো, ততদিন হুইল চেয়ারে একটু ঘুরবে।’ আজ হাত নাড়িয়ে সালাম দিতে পারি। কিন্তু টুন ভাইকে পারি না- এটি বড়ই কষ্টকর। এরকম অনেক স্মৃতি আজ হয়েছে বেদনা।
টুন ভাই সাংবাদিকতার কাজে বেশিরভাগ সময় আমাকে সঙ্গী করতেন। বলতেন, ‘জানো তোমাকে আমার আপন ছোট ভাইয়ের মতোই ভালোবাসি।’ তার ছিল তোতা নামের এক আপন ছোট ভাই। সে কারণে আমাকে তিনি ছোট ভাই হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন। আমিও জীবন চলার পথে তার সবকিছু অনুকরণ করার চেষ্টা করতাম। জানি না কতটুকু রপ্ত করতে পেরেছি। তবে এটুকু বলবো যে ক’দিন ইহকালে আল্লাহপাক রাখেন আমাকে সে ক’দিন সাংবাদিকতার পেশায় থেকে সাংবাদিক বন্ধুদের আপনজন হিসেবে যাতে পাশে থাকতে পারি সেই কামনা করি মনেপ্রাণে।
টুন ভাইয়ের মৃত্যুর ঘটনায় স্মতি হাতড়ে দেখলাম সাংবাদিক গোলাম মাজেদ, আবুল হোসেন মীর, আতিয়ার রহমান, মাহমুদ উল হক, মহিউদ্দীন আহমদ, সাইফুল আলম মুকুল, শামছুর রহমান, অশোক সেন, সাহা কিরণকুমার কচি ও বিএম মাহবুবসহ অনেককেই আমরা হারিয়েছি। কত স্মৃতি ছিল তাদের সঙ্গে! তাদেরও ভুলে গেছি টুন ভাইয়ের মতো। মনে হয় এটিই নিয়ম।
কিছুদিন আগে প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি কল্যাণ সম্পাদক একরাম-উদ-দ্দৌলা ও সাবেক সভাপতি প্রভাতফেরী সম্পাদক ফকির শওকতসহ আমি একটি অনুষ্ঠানে একসাথে যাবার পথে মরহুম টুন ভাইয়ের কথা উঠলো। মুরুব্বি সাংবাদিক একরাম ভাই বললেন, ‘টুন ভাই আসলে আমাদের আইকন ছিলেন।’
[লেখক : দৈনিক ইনকিলাবের বিশেষ সংবাদদাতা; প্রেসক্লাব যশোরের সাবেক সভাপতি]