ফাঁসি মাফ, মাঠ চষছেন রাজনৈতিক দুর্বৃত্ত

আপডেট: 02:19:23 26/09/2017



img
img
img

সুবর্ণভূমি ডেস্ক : খুনের স্বীকারোক্তি দেওয়া সরকারি দলের এক নেতার ফাঁসি মাফ করে দিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি। এর পর জাতীয় দিবসের বিশেষ ক্ষমা। দ্রুতই কারামুক্তি। এখন তিনি রাজনীতির মাঠ চষছেন।
সরকারি দলের এক বড় মাপের নেতার আশীর্বাদপুষ্ট এই নেতার নাম আসলাম ফকির। ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি। নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে ফেরা এই খুনি রাজনীতিকের ভয়ে তার প্রতিপক্ষ তটস্থ। নিহত জনপ্রতিনিধির স্ত্রী প্রাণ বাঁচাতে এখন ধরনা দিচ্ছেন প্রভাবশালীদের কাছে।
শীর্ষ দৈনিক প্রথম আলোর রিপোর্টার রোজিনা ইসলাম তার এক রিপোর্টে উল্লেখ করেছেন : ফাঁসির মঞ্চে ওঠার আগের দিন ‘অস্বাভাবিক আচরণ’ করছিলেন তিনি। তখন ফাঁসি স্থগিত করে পরদিনই রাষ্ট্রপতির কাছে তড়িঘড়ি প্রাণভিক্ষা চাওয়া হয়। তিন মাস পর মানসিকভাবে অসুস্থ বিবেচনায় রাষ্ট্রপতি তার সাজা কমিয়ে দেন। কিন্তু কারাগার থেকে বেরোনোর পর ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি আসলাম ফকিরের আচরণে অসুস্থতার ছিটেফোঁটাও নেই। এখন তিনি ব্যস্ত রাজনৈতিক গণসংযোগে।
ফরিদপুর-৪ আসনের সাবেক সাংসদ আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফরউল্যাহ ও তার স্ত্রী সাংসদ নিলুফার জাফরউল্যাহর সঙ্গে এলাকার নানা কর্মসূচিতে দেখা যাচ্ছে আসলাম ফকিরকে। তার সাজা মওকুফের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে এ দুজন ভূমিকা রেখেছিলেন বলে কথিত আছে। অন্যদিকে আসলামের নিজেরও ইচ্ছা এখন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচন করার এবং আওয়ামী লীগের নেতা হওয়ার।
‘আপনি কারাগারে থাকাকালে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, এ জন্য মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা যায়নি। কী সমস্যা হয়েছিল?’ টেলিফোনে এ প্রশ্ন করা হলে আসলাম ফকির বলেন, ‘আরে আপা, অসুস্থ ছিলাম না কারাগরে। ফাঁসির দিনক্ষণ ঠিক হয়ে যাওয়ায় কিছুটা ভয় পেয়ে গেছিলাম। পরদিন দেখি, ফাঁসি বাতিল হয়ে গেছে।’
আপনাকে সাজা মওকুফ পেতে কারা সহায়তা করল?- জানতে চাইলে আসলাম ফকির বলেন, ‘কে আর করবে? লিডার কাজী জাফরউল্যাহ ও তার স্ত্রী সাংসদ নিলুফার জাফরউল্যাহ। তারা দেখিয়ে দিয়েছেন তারা কী পারেন।’
ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার মানিকদহ ইউনিয়নের আসলাম ফকির ২০০৩ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর একই ইউনিয়নের ইউপি চেয়ারম্যান এ কে এম সাহেদ আলী ওরফে সাহেব আলী মিয়াকে হত্যা করেন। দুজনই ওই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হয়ে আসছিলেন পর্যায়ক্রমে। জেলা ও দায়রা জজ আদালত আসলাম ফকিরকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন। পরে হাইকোর্ট এ রায় বহাল রাখেন।
কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ সালের ১৯ মে খুনের দোষ স্বীকার করে প্রাণভিক্ষা চেয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করেন আসলাম ফকির। কিন্তু ২০১৪ সালের ১৩ অক্টোবর তা নামঞ্জুর হয়। ওই বছরের ১৩ নভেম্বর তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার দিন ধার্য হয়। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ সুপারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উপস্থিত থাকার জন্য চিঠি পাঠানো হয়। কিন্তু ১২ নভেম্বর বন্দি আসলাম ফকির এমন আচরণ শুরু করেন, কারাগারের নথির ভাষায় যেটা ছিল ‘অস্বাভাবিক’ বা ‘অসুস্থতা’। এর ফলে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর স্থগিত করা হয় এবং ওই দিনই দ্বিতীয় দফায় রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করা হয়।
দ্বিতীয় দফায় প্রাণভিক্ষার আবেদন গৃহীত হলে আসলামের দণ্ড হ্রাস করা হয় ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি। তাকে ১৪ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। বিশেষ দিবসে বন্দিদের সাধারণ ক্ষমা লাভের সুযোগ নিয়ে গত ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে তাকে মুক্তি দেওয়ার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনানুষ্ঠানিক চিঠি (ডিও লেটার) দেন সাংসদ নিলুফার জাফরউল্যাহ।
১৩ বছর দুই দিন কারাভোগের পর গত ২৫ আগস্ট গাজীপুর হাই সিকিউরিটি কারাগার থেকে মুক্তি পান আসলাম। তিন দিন পর ২৮ আগস্ট তিনি ফিরে আসেন মানিকদহ গ্রামে। এরপর থেকেই ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের নিয়ে।
শারীরিক ও মানসিক অবস্থা জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, তিনি পুরোপুরি সুস্থ আছেন। অনেকগুলো হাসপাতালে চেকআপ করিয়েছেন, কোনো সমস্যা নেই। এখন ব্যস্ত গণসংযোগ নিয়ে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, আসলামের বাড়িতে দর্শনার্থীর ভিড় সকাল থেকে গভির রাত পর্যন্ত। তিনি যখন বাইরে বের হন, তার সঙ্গে থাকে মোটরসাইকেলের বহর। ১৭ সেপ্টেম্বরও কাজী জাফরউল্যাহর সঙ্গে সদরপুর ও চরভদ্রাসনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দেন আসলাম ফকির।
এ বিষয়ে কাজী জাফরউল্যাহর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বিষয়টি রাজনৈতিক। তিনি এর বেশি কিছু মন্তব্য করবেন না।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সে তো মানসিক রোগী ছিল। এ জন্যই তাকে ক্ষমা করা হয়েছে। এখন ঘুরে বেড়াচ্ছে, গণসংযোগ করছে, কী বলেন? খোঁজ নিতে হবে তো। এটা মেনে নেওয়া যায় না।’
নিহত ইউপি চেয়ারম্যানের স্ত্রী ও মামলার বাদী পারুল আক্তারীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘এতো বড় অন্যায় মেনে নেওয়া যায় না। ফাঁসির দিন ধার্য করে পরিপত্র জারি হয়। পরে অসুস্থ সেজে ফাঁসি স্থগিত করছে। প্রভাবশালীরা আমার স্বামীর খুনিকে রেহাই দিয়ে উৎসব করছে। আর ওই খুনি এলাকায় এসে গণসংযোগ করছে।’
আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেন, ‘ঘটনাক্রম শুনে মনে হচ্ছে, আমরা খুব অসুস্থ অবস্থার মধ্যে আছি। প্রশাসনের নানা পর্যায়ে ক্ষমতাধরদের অসুস্থ মানসিকতার অবস্থা পরিষ্কার। কাকে ক্ষমা করা যাবে বা কার সাজা মওকুফ করা যাবে, সে ব্যাপারে কোনো নীতিমালা নেই। অন্যান্য দেশে এ বিষয়টি স্পষ্ট করা থাকে। নীতিমালা না থাকায় ক্ষমতার অপব্যবহার হচ্ছে।’
এদিকে, শীর্ষস্থানীয় অনলাইন নিউজপোর্টাল বিডিনিউজের ফরিদপুর প্রতিনিধির করা প্রতিবেদনে বলা হয়, ফাঁসির একদিন আগে ‘অস্বাভাবিক আচরণের’ কারণে পার পাওয়ার পর কারামুক্ত ফরিদপুরের যুবলীগ নেতা আসলাম ফকির বলছেন, এখনো পুরোপুরি সুস্থ নন তিনি।
তবে আগামী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য আসলাম এরইমধ্যে প্রচারণা শুরু করায় নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কায় থাকার কথা জানিয়েছেন তার হাতে খুন হওয়া সাবেক চেয়ারম্যান একেএম শাহেদ আলী মিয়ার স্ত্রী পারুল বেগম।
তিনি বলেন, “একজন মানুষকে খুন করলো। আইনের বিচারের অপেক্ষায় ছিলাম। কিন্তু সেটাতো হলো না। আসামি অসুস্থতার ভান করে ফাঁসির দণ্ড থেকে মুক্তিও পেল।
“এখন নির্বাচন করতে গণসংযোগ করছে। আমার বাসার কাছে মঞ্চ বানিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছে। এলাকার প্রভাবশালীরা তাকে প্রশ্রয় দিচ্ছে।”
এতে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন জানিয়ে পারুল বলেন, বিষয়টি ফরিদপুর-৪ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সনকেও জানিয়েছেন। বিষয়টি তিনি দেখবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন।
তার ওই শঙ্কার বিষয়ে জানতে চাইলে আসলাম ফকির বলেন, “আমি মানসিকভাবে এখনো পুরোপুরি সুস্থ নই। মাঝে মাঝে অসুস্থ থাকি। নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিচ্ছি।”
গত ২৫ আগস্ট কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে এলাকায় ফেরার পর আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফরউল্যাহর সর্বক্ষণিক সহচর হিসেবে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন আসলাম ফকির। সামনের নির্বাচনে মানিকদহ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার মানিকদহ ইউনিয়নের মানিকদহ গ্রামের বাসিন্দা হলেও আসলাম লেখাপড়া ও রাজনীতি করেন পাশের সদরপুর উপজেলায়। এক পর্যায়ে তিনি ওই উপজেলা যুবলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। পরে মানিকদহ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানও হন তিনি।
২০০৩ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর সহযোগীদের নিয়ে ওই ইউনিয়নের নির্বাচিত চেয়ারম্যান শাহেদ আলীকে কুপিয়ে হত্যা করেন।
মোট ১৩ বছর দুই দিন কারাভোগের পর গ্রামে ফিরলেও এখনো এলাকার মানুষের কাছে ‘জনপ্রিয়’ বলে দাবি করেন আসলাম ফকির।
তিনি বলেন, “আমি তো দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলাম। একবার চেয়ারম্যানও নির্বাচিত হয়েছিলাম। এখন বাড়িতে লোকজন আসে। আর দলীয় নেতাদের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছি। এলাকার মানুষ চাইলে নির্বাচনও করতে পারি।
“যে কোনো মানুষ দুর্দিনে যাকে পাশে পায় তাকেই তো মনে রাখে, তাই নয় কি? এটাতো কোনো অপরাধ নয়।”

আরও পড়ুন