পাঁচ সূর্যসন্তানের শাহাদতবার্ষিকী আজ

আপডেট: 02:42:25 23/10/2017



img

আনোয়ার হোসেন, মণিরামপুর (যশোর) : আজ ২৩ অক্টোবর যশোরের বীর সন্তান আসাদ, তোজো, শান্তি, মানিক, ফজলুর শাহাদতবার্ষিকী।
১৯৭১ সালের এই দিনে মণিরামপুরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দোসর রাজাকারদের হাতে এই পাঁচ সূর্যসন্তান নির্মমভাবে শহীদ হন। দীর্ঘ ৪৬ বছর পেরিয়ে গেলেও কোনো সরকার এই শহীদদের স্মৃতি রক্ষার্থে রাষ্ট্রীয়ভাবে উদ্যোগ নেয়নি।
 বরং প্রতি বছর এদিনটিতে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা মাজার জিয়ারতের মধ্যে দিয়ে তাদেরকে স্মরণ করে থাকেন। শহীদ এ পাঁচ সূর্য্য সন্তানারা হচ্ছেন মুশফিকুর রহমান তোজো, সিরাজুল ইসলাম শান্তি, ফজলুর রহমান ফজলু, আহসান উদ্দীন খান মানিক ও আসাদুজ্জামান আসাদ।
সহযোদ্ধাদের মতে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধচলাকালে ১৯৭১ সালের ২৩ অক্টোবর সকালে মণিরামপুর উপজেলার রতেœশ্বরপুর গ্রামের জনৈক আব্দুর রহমানের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন উচ্চ শিক্ষিত ও মেধাবী স্বাধীনতাকামী নিরস্ত্র এ পাঁচ যুবক। কিন্তু রাজাকারদের চোখ এড়াতে পারেননি তারা। স্থানীয় রাজাকার কমান্ডার আবদুল মালেক ডাক্তারের নেতৃত্বে মেহের ওরফে মেহের জল্লাদ, ইসহাক, আব্দুল মজিদসহ বেশ কয়েকজন রাজাকার আশ্রয়স্থল চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলে তাদেরকে আটক করে। এর পর তাদেরকে চোখ বেঁধে চিনাটোলা বাজারের পূর্বপাশে হরিহর নদীর তীরে আনা হয়। চালানো হয় তাদের ওপর অমানবিক নির্যাতন। বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তাদের শরীরে লবণ দেওয়া হয়। এভাবে দিনভর চলে অমানবিক নির্যাতন। ওই নির্যাতনের প্রত্যক্ষদর্শীদের মধ্যে এখনো বেঁচে আছেন চিনাটোলা গ্রামের শ্যামাপদ নাথ (৭৭)।
শ্যামাপদ সেদিন ছিলেন ৩০-৩২ বছরের টগবগে যুবক। তিনি সে সময় চিনাটোলা বাজারে দিনে কুলি আর রাতে নৈশপ্রহরীর কাজ করতেন। রাজাকাররা ওইদিন শ্যামাপদকে হরিহর নদীর ব্রিজ পাহারার দায়িত্ব দেয়।
শ্যামাপদ নাথ বলেন, ‘রাত আটটার দিকে চোখ বাঁধা অবস্থায় মুক্তিসেনা আসাদ, তোজো, শান্তি, মানিক ও ফজলুকে ব্রিজের পাশে আনা হয়। এ সময় আমার দায়িত্ব ছিল ব্রিজের আশপাশে যেন কোনো লোক আসতে না পারে। এর পরপরই তাদেরকে নেওয়া হয় সৈয়দ মাহমুদপুর গ্রাম-সংলগ্ন হরিহর নদীর তীরবর্তী স্থানে। তার কিছুক্ষণ পর রাজাকার কমান্ডারের বাঁশি বেজে ওঠে। সাথে সাথে গর্জে ওঠে রাইফেল। মুহূর্তের মধ্যে পাঁচ তরতাজা যুবকের নিথর দেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। পরদিন সকালে আমি ও স্থানীয় আকব্বর আলী সেখানে শহীদদের সমাহিত করি।’
শ্যামাপদ সেই পাঁচ সূর্যসন্তানের বর্বর হত্যাকাণ্ডের স্মৃতি আজো ভুলতে পারেননি।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘স্বাধীনতার ৪৬ বছর পেরিয়ে গেলেও দেশমাতৃকার জন্য যারা অকাতরে শহীদ হলো তাদের স্মৃতি রক্ষার্থে আজ পর্যন্ত কোনো সরকার কিছু করলো না।’
শহীদ স্মৃতি সংরক্ষণ কমিটির আহ্বায়ক মশিয়ার রহমান আক্ষেপ করে সুবর্ণভূমিকে জানিয়েছিলেন, ‘স্বাধীনতার পর শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য বামপন্থীদের পক্ষ থেকে বধ্যভূমিতে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে। আমরা প্রতিবছর ২৩ অক্টোবর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে থাকি। কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে আজ পর্যন্ত শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।’
এ ব্যাপারে মণিরামপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার গাজী আব্দুল হামিদ বলেন, ‘পাঁচ শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন এবং তাদের কবরসহ উপজেলার সব শহীদদের স্মৃতি ও বধ্যভূমি সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে দাবি জানানো হয়েছে।’

কর্মসূচি
জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট যশোর জেলা শাখা প্রতিবারের মতো এবারো শহীদ পাঁচ বিপ্লবীর মৃত্যুবার্ষিকী পালন করবে।
ফ্রন্টের গৃহিত কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে সকাল ১০টায় প্রয়াতদের সমাধিস্থল চিনাটোলায় শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ, নীরবতা পালন ও শপথ পাঠ। এরপর বেলা ১১টায় কৃষক সংগ্রাম সমিতি মণিরামপুর উপজেলা কমিটির উদ্যোগে চিনাটোলা বাজারে স্মরণ সভা অনুষ্ঠিত হবে।
২৪ অক্টোবর মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৩টায় জাতীয় ছাত্রদল যশোর জেলা কমিটির উদ্যোগে শহরের দড়াটানা ভৈরব চত্বরে অপর একটি স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হবে।

আরও পড়ুন