ইয়ান ম্যাকলয়েডের গল্প

আপডেট: 02:06:45 11/10/2017



img

পাস্ট ম্যাজিক


[ইয়ান আর ম্যাকলয়েড ব্রিটিশ কল্পবিজ্ঞান লেখক। তিনি ১৯৫৬ সালে বার্মিংহামের কাছে সোলিহাল- এ জন্মগ্রহণ করেন। আইন বিষয়ে পড়াশোনা করার পর তিনি সিভিল সার্ভিসে যোগ দেন।
তাঁর উপন্যাসের সংখ্যা সাতটি। তাঁর লেখা উপন্যাস ‘সং অব টাইম’ বছরের সেরা সায়েন্স ফিকশন হিসেবে জিতে নেয় আর্থার সি ক্লার্ক পুরস্কার। ২০০০ সালে তার উপন্যাস ‘দ্য চপ গার্ল’ জিতে নেয় ওয়ার্ল্ড ফ্যান্টাসি অ্যাওয়ার্ড। ভবিষ্যতের পৃথিবীর সঙ্গে ফ্যান্টাসি ও ইতিহাসই তাঁর লেখার বিষয়। উপন্যাসের ছাড়াও তিনি লিখেছেন অনেক ছোট গল্প।
‘পাস্ট ম্যাজিক’ ছোট গল্পটি ২০০৬ সালে পি এস পাবলিশিং হাউজ থেকে প্রকাশিত হয়। ইংরেজি ভাষা থেকে গল্পটি অনুবাদ করেছেন সাজ্জাদ কবীর।]


বিমানবন্দরটা ছিল অন্য আরেক পৃথিবী। ক্লায়ার একটা ব্যাগ হাতে নিয়ে আমার চিবুকে চুমু খেল। তার শরীর থেকে আগের মতোই পরিচ্ছন্ন আর শরতের গন্ধ পেলাম। বিমানটা যখন ঘুরে নামছিল তখনই আমি দেখেছি, কিছুই বদলয়ানি দ্বীপটার। বাদামী পাহাড়, সমুদ্রে মূল ভূমি থেকে ছেঁড়া টুকরোগুলো। আমরা ক্যামেরার চোখ, প্রজাতি নির্ণায়ক, এইচআইভি নির্দেশক, রোবট বন্দুকসহ নানা যন্ত্রপাতি দ্রুত পার হয়ে গেলাম। আমার একমাত্র ভালো জ্যাকেটটার ভেতর নিজেকে নোংরা মনে হচ্ছিল কেমন যেন কুঁকড়ে যাচ্ছিলাম। আমি ক্লায়ারের পিছু পিছু পাম গাছের সারির ভিতর দিয়ে যাওয়া গরম টারমাকটা পার হয়ে গেলাম। সে আমার কাছ থেকে মূল ভূখণ্ডের খবরা খবর জানতে চাইল, যেহেতু সেটা বেশ দূরে। আবহাওয়া সমন্ধেও জিজ্ঞেস করে সে। আমি ওখানকার কথা ভুলে থাকতে চাইছিলাম। ওখানকার গরম, বাচ্চাদের কথা। তা ছাড়া বিমানবন্দরের দিকে আসার সময় আমাকে দু’বার জিজ্ঞাসাবাদের জন্য যে থামানো হয়েছিল সেটাও। আমি তাকে জানালাম লিভারপুলের খবর ভালোই, এখানকার মতোই। সে তার কাঁধের ওপর দিয়ে আমার দিকে এক ঝলক তাকিয়ে হাসে। আমি এমনকি ভানও করতে পারিনি। খোলা ছাদের ভিনটেজ জাগস, মারক্স গাড়িগুলো দেখে আমার খুব ভালো লাগছিল। মনে হচ্ছিল ওগুলো দোকান থেকে বের হওয়ার সময়ের চেয়েও সুন্দর।
ক্লায়ার্সকে দেখাচ্ছিল চির বাদামি, আর তার চুলগুলো সতেজ। রাক্ষুসে রোদের জন্য কোনো আতঙ্কও নেই। আমি প্লেনে একটা পত্রিকার বিজ্ঞাপণে লেজার আর স্ক্যান সম্পর্কে পড়েছি। তবে সেগুলোর মূল্য সমন্ধে আমার কোনো ধারণা নেই। ক্লায়ারের ছোট্ট গাড়িটা ধুলো ধূসরিত আর টোল খাওয়া। একটা বাচ্চা গাড়ির পিছনের আসনে বসে মিকি মাউসের ছাপ মারা টি শার্ট পরে কার্টুন থেকে স্ট্র দিয়ে জুস চুষছিল। তাকে দেখে আমার কল্পনার অতীত একটা ঝাঁকুনি খেলাম।
ক্লায়ার আমার ব্যগটা গাড়ির পিছনে ঢোকাতে ঢোকাতে বাচ্চাটাকে বলে, ‘এ হলো টনি।’ সেই আবহাওয়ার খবর নেওয়ার মতো সহজ গলায়। ‘ভালো আছ বাবা!’ বাচ্চাটা বলে। জুসের রঙে তার ঠোঁট বেগুনি হয়ে আছে, ‘আচ্ছা তুমি কি সত্যিই আমার বাবা?’ ঘটনা খুব দ্রুত ঘটে যায়। আমার এ জন্য একটু প্রস্তুতির প্রয়োজন ছিল। বিমান বন্দরের সামনে ভর দুপুরে আমি দাঁড়িয়ে থাকি স্তম্ভিত হয়ে। আমার চোখের সামনে ঝলসে ওঠে আমার মৃত মেয়ের মুখটা। সে দেখতে একেবারেই স্টেফের মতো। প্রায় বছর ছয়েকের মিষ্টি একটা মেয়ে যাকে আমি হাতে ধরে সাদা নৌকাটায় করে মাছ ধরতে যেতাম। সে আমার দিকে আড় চোখে তাকায়, মনে আছে স্টেফ অপরিচিতদের সামনে খুব চুপচাপ থাকত। বাচ্চারা যেমন করে তেমনি করে সে জিজ্ঞেস করে, ‘কে তুমি? এখানে কেন এসেছ? আমরা কি খেলা করতে পারি?’ ক্লায়ার তাড়া লাগায়, ‘চল যাওয়া যাক।’ তারপর যেভাবে লাফিয়ে গাড়িতে ওঠে যে তাকে ৩৫ বছরের মনেই হয় না। বাচ্চাটাও বলে ওঠে, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ চল যাই মা।’
গরমের ধুলোর মেঘকে পিছনে ফেলে আমরা ম্যান দ্বীপের দিকে চলি। সেই জায়গা যেখানে আমি আর ক্লায়ার হেসেছিলাম, যেখানে আমরা ভালোবেসেছিলাম, যেখানে আমরা ঝগড়া করেছিলাম আর কেঁদেছিলাম। সেই জায়গা যেখানে স্টেফ, মানে আসল স্টেফ জন্মেছিল, বেড়ে উঠেছিল আর মারা গিয়েছিল। বিশাল বাড়ির সুইমিংপুলটা উপকূল ধরে পিটপিট করছিল। এই সময় আমরা গরম সাদা রাস্তাটা ধরে ভূখণ্ডের মধ্যভাগের পোর্ট এরিনের দিকে বাঁক নিলাম। অতীতটাকে ভুলে থাকা আমার জন্য কষ্টকর। ক্লায়ার, স্টেফ, আমি। কেন যে এই ভান করা। মাত্র বছর দশেক আগের কথা, আমরা বিয়ে করলাম। সব কিছুই কেমন সুন্দর আর সত্য ছিল। এই সেই ফেয়ারি ব্রিজ। ‘ক্রেন, অ্যাশ, টাউ!’ আমরা সবাই কিছু না ভেবেই চেঁচিয়ে উঠেছিলাম। পরীদের স্বাগত জানান। আগে যখন টুরিস্টদের ম্যান দ্বীপ ঘোরার অনুমিত ছিল তখন প্যাকেজের মধ্যে অনেক কিছু ছিল। তার মধ্যে, ফেয়ারি ব্রিজ, ফেয়ারি পোস্টকার্ড, পাথরের বৃত্ত, আর ম্যান দ্বীপ সম্পর্কিত ভারি গ্রন্থ। মানান্নান ছিলেন এই ম্যান দ্বীপের লর্ড। শেষ যুদ্ধে যখন নৌকায় তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় কিং আরথারের কাছে। ছেলের জন্য মনঃকষ্টে তিনি লম্বা লম্বা পা ফেলে পাহাড় পেরিয়ে খাঁড়ি পার হয়ে চলে এসেছিলেন। তিনি পাহাড়ের মেঘের মধ্যে লুকিয়ে ছিলেন। মানান্নান কখনোই চিরতরে চলে যান নি। এ বিষয়ে আমি যা পাওয়া গেছে সবই পড়েছি। সেগুলো নিয়ে স্টেফের সাথে আলাপও করেছি। এই দ্বীপ এখনো জাদু ধারণ করে। যদিও সেগুলো এখন রোদের মতো সূক্ষ্ম। এগুলো এখন পুরুষ আর নারীরা ক্লিনিকে ব্যবহার করছে।
মনে পড়ছে প্লেনের সেই পত্রিকার কৌশলী উচ্চারণ। জীবনকে ইচ্ছে মতো বন্ধ করা আবার চালু করা। এটা ওটা তৈরি করা আর ম্যান দ্বীপকে অর্থময় করে তোলা। আমরা সশব্দে কেলাগের দিকে ঢুকলাম। লক্ষ্য করলাম গেটে কোনো মানুষ নেই। ক্লায়ার আঙ্গিনায় গাড়িটাকে থামায়। কেলাগের অবস্থা ক্লায়ারের গাড়ির মতোই। ভাবখানা টাকা পয়সার থোড়াই কেয়ার করি। অঙ্গন ঘেরা সাদা দেয়াল সূর্যালোকে ডুবে আছে। এখানে ওখানে নতুন, পুরোনো মিলিয়ে চমৎকার কিছু ছবি, ঝোলাবার অপেক্ষায় অবহেলায় পড়ে আছে। স্টেফ লাফিয়ে গাড়ি থেকে নেমে ছিটকে ঢুকে গেল বাড়ির ভিতর। আমি ক্লায়ারের দিকে তাকালাম। ‘ও সত্যিই স্টেফ,’ ক্লায়ার বলে, ‘কিন্তু তার কিছুই মনে নেই। তাকে শেখাতে হচ্ছে আর উচ্চ মাত্রার থেরাপি দিতে হচ্ছে। কিন্তু এটার মাত্র ছয় মাস হয়েছে। তুমি এখনো আগন্তুক, টনি। কিছুটা সময় তোমাকে দিতেই হবে।’ মনে হয় যেন কাচের ওপর দিয়ে হাঁটছি, বললাম, ‘ও খুবই মিষ্টি, সুন্দর একটা বাচ্চা, ক্লায়ার। কিন্তু সে কখনোই স্টেফ হতে পারে না।’ ‘তুমি দেখে নিও।’ সে এটাকে খুব আনন্দের সাথে উচ্চারণ করে। কিন্তু সেখানে শক্তি খেলা করে, সেখানে আছে অন্ধকার। কিছু একটা আছে যেটা আমাকে আতঙ্কিত করছিল। যখন সে হাসে তখন তার চোখ ঝিলিক মেরে কেঁপে ওঠে, এমনকি টাকায় সেটা আড়াল করতে পারে না। ফারগুস বের হয়ে আসে ব্যাগগুলো বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য। আমরা বলে উঠি ‘ভালো তো!’
ক্লায়ার তাকে চুমু খায় এবং বিপরীতে ফারগুস তার বিশাল বাহুতে নিয়ে চুমুর উত্তর দেয়। আমি মুহূর্তের জন্য থমকে সেটা দেখি, আর ভাবি তাদের মধ্যে আর কতটা দূরত্ব বাকি আছে! ক্লায়ার আমাকে আমার এককালের পড়ার ঘরটাকেই দেয় থাকার জন্য। একবার সে আমাকে বাড়ির বর্ধিত অংশের একটা ঘর দিতে চেয়েছিল। সেখানে আমার কিছুটা একাকিত্ব থাকতো আর থাকতো একটা স্নানাগার। কিন্তু ক্লায়ার বলে সে চায় আমি যেন তার আর ফার্গুর সাথে একই বাড়িতে থাকি, স্টেফের কাছাকাছি। এ ঘরে আমার আগের ডেস্কটার জায়গায় একটা বিছানা পাতা। এ ছাড়া সেই তালি দেয়া পার্সিয়ান কার্পেট, ফায়ারপ্লেস, এমনকি ঘরের যে গন্ধটা আমি ভালোবাসতাম... আবছায়া আর মিষ্টি, মানে সোঁদা এবং বিস্কুটের টিনের মতো। আমার ব্যাগ থেকে ‘ভক্স’ মানে কণ্ঠস্বর সংরক্ষণের যন্ত্রটা বের করা লক্ষ্য করে ক্লায়ার। যেটাতে আমি আমার চিন্তা-ভাবনা গুলো বিড়বিড় করে তুলে রাখতাম। এখনকার দিনে এটা নেহায়েতই একটা ব্যাক্তিগত ডায়েরি। আমার মনে আছে কিভাবে ক্লায়ার এটা আমাকে দিয়েছিল। এই কেলাগে এক উৎসবমুখর ক্রিসমাসের দিন ছিল সেটা। আমার লেখার জন্য নতুন যন্ত্রটা কাজে লাগবে বলেই দেয়া। এটা আজকের দিনেও মানে দশ বছর পরেও আসলে সবচেয়ে ভালো।
ক্লায়ার আমার বাহু ছুঁয়ে বলে, ‘মনে আছে তোমার সেই গল্প লেখার পুরনো কম্পিউটারটা।’ ‘আমি মোটেও টাইপ করায় পারদর্শী ছিলাম না।’ ‘আমি আবার সেটাকে বের করেছি, স্টেফের জন্য। সে পুরনো জিনিস ভালোবাসে, পুরনো খেলনা। আমি সেই ‘লক্ষ্য বস্তু তাক করা’ খেলাটা খুঁজে বের করেছি, যেসব আমরা তাকে কিনে দিতাম ক্যাসল-টাউনের দোকানগুলো থেকে। ও চেষ্টা করছে, কিন্তু পুরনো স্টেফের স্কোর এখনো সবার ওপরে।’ নতুন স্টেফ, পুরনো স্টেফ...। আমি ভক্সটা ধরে ছিলাম। পেঁচানো তার আমার কক্তের কাছে লাগানো। চালু হওয়ার লাল বাতিটা জ্বলে আছে, শব্দের অপেক্ষায়। ফার্গুস বাড়ির নতুন অংশে কাজ করছিল। পাথরের ওপর দিয়ে সমুদ্রের দিকে ঝুলে থাকা একটা কাঠ আর কাচের তৈরি বিশাল ঘর। ক্লায়ারের সাথে ফার্গু কাটিয়ে দিয়েছে দশটা বছর, যেখানে আমি মাত্র আট বছর ছিলাম। কিন্তু তারা বিয়ে করে নি, বা তাদের কোনো বাচ্চাও নেই। সম্ভবত বিষয়টা গোপন। আমি ফার্গুর ছবি আঁকা দেখছিলাম, সে আমাকে হুইস্কি দেয়। ফার্গুকে আগের মতোই লাগে, যদিও তার ছবির সেই ধার আর নেই। একটার পর একটা সিগার খাওয়ার ফলে তার ভারি কণ্ঠস্বরও কেমন যেন হয়ে গেছে। আমি দীর্ঘদিন সিগারেটের ধোঁয়ার সংস্পর্শে আসিনি। ও বোধ হয় মূল ভূখণ্ডে হলে মারাই যেত। এখানে অবশ্য পয়সা দিতে পারলেই, প্রতি ইঞ্চি ইঞ্চি পরীক্ষা করে চিকিৎসা করা হয়। শেষ বিকেলে আকাশ একটু মেঘাচ্ছন্ন হয়ে উঠল। জানালাগুলো খোলা ছিল। ঘরের তাপমাত্রাকে বের করে দেওয়ার জন্য এবং ঢেউয়ের আওয়াজ ভেতরে ঢোকার জন্য চমৎকার।
‘ভালোই হলো তোমাকে এখানে পেয়ে,’ হাতটা কাপড়ে মুছতে মুছতে সে বলে। ‘তুমি জান না ক্লায়ার কী রকম আকূল হয়ে আছে স্টেফকে ফিরে পাওয়ার জন্য। এখানে কোনো শোক নেই, অন্তত এই দশ বছর পর। এটা শুধুই... বয়ে যাওয়া, কিছু একটার দিকে।’ ‘শোক কখনোই শেষ হয় না।’ আমি বলি। ফার্গুস ক্ষণিকের জন্য একটু অস্বস্তি বোধ করে, তারপর জিজ্ঞেস করে, ‘তারা যে রকম বলে, মূল ভূখণ্ডে কি অতটাই খারাপ?’ আমি হুইস্কিতে চুমুক দিতে দিতে মুহূর্তের জন্য গভীর চিন্তায় ডুবে যাই। আসল ঘটনাটা কী সে যদি জানতে চাইতো! সেই জটিলতা এড়িয়ে আমি আমার লেখার কথা বলি। সহজ মিথ্যা যার জন্য বেশি বেগ পেতে হয় না। ‘তোমার তেমন কোনো কাজ ইদানিং দেখছি না।’ সে বলে। ‘ক্লায়ার এখনো খোঁজ রাখে...।’ সে এক নিয়ন্ত্রণহীন আবেগে ভেসে ভেসে যেতে যেতে বলে, ‘আমি আঁকাটা এখনো চালিয়ে যাচ্ছি, কিন্তু “ভক্স”এ কিছু বলতে গিয়ে আমাকে দ্বিতীয় বার চিন্তা করতে হয়। ভাঙা কিছু আধা আধা শব্দ... বোধ হয় একটা আতঙ্ক। সন্ধ্যা গাঢ় হয়ে ওঠে। ফার্গুস অনেকটা হুইস্কি ঢেলে নেয়। এরপর আবার, এবং তাকে নেশায় পেয়ে বসে। সে তখন অমায়িক, আর তখন আমরা বেশ দ্বিধাহীন ভাবে কথা বলতে থাকি। কিন্তু আমি পুরোনো ফার্গুসকে খুব একটা মেলাতে পারছিলাম না, সেই ফার্গুস যে সব কিছু নিয়েই প্রতিবাদ করছিল, সেই ফার্গুস যে মুষ্টিযুদ্ধ নিয়ে কূট তর্কে লিপ্ত। আমি তাকে ক্লায়ারের আগে থেকে চিনি। তাদেরকে আমিই পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলাম। পরে সে আইল্স অফ মানে আসে এবং বাড়ির বর্ধিত অংশে বাস করতে থাকে যেমন আমি এখন আছি। বিষয়টা যেন পুনরায় ঘটা একটা ঘটনা। নতুনটা পুরোনো জনের জন্য এবং এ জন্য কেউই ক্লায়ারকে দোষ দিতে পারবে না।
‘তুমি স্টেফের মৃত্যুর পর খুব দ্রুত এখান থেকে চলে গিয়েছিলে,’ সে বলে, ‘তুমি ভেবেছিলে পিছনে রেখে গেলে ক্লায়ার আর ফার্গুসকে, কিন্তু সেটা একা ক্লায়ার। তার টাকা আছে, ক্ষমতা আছে। তুমি বা আমি এখানে আগুন্তকের মতো। ক্লায়ার শুধু এই মাটির।’ ‘তাহলে তুমি থেকে গেল কেন?’ কাঁধ ঝাঁকিয়ে সে উত্তর দেয়, ‘কোথাই বা যেতে পারতাম?’ আমরা জানালার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলাম। নিচে বাড়ির এক ধারে বাঁধানো চত্তর, সেখান থেকে ধাপ নেমে গেছে ছোট্ট ঘাটের কাছে। সুন্দর একটা জায়গা। পুরোনো দোলনা চেয়ারটায় বসে স্টেফ দোল খাচ্ছে। সাবধানে পা দুটোকে উঁচু করে রেখেছে যাতে পিঁপড়ে পায়ের পাতা বেয়ে উঠতে না পারে। সে নিশ্চয়ই আমাদের উপস্থিতি টের পেয়েছে। ওপর দিকে তাকায় সে। ভাবলেশহীন নীল চোখ যেন কৃত্রিম নীল প্রান্তরে। ওপরে তাকিয়ে সে আমাদের দেখে। তাতে কিন্তু তার চেহারায় কোনো ভাবান্তর দেখা যায় না। সেই সন্ধ্যায় লবস্টার আর ওয়াইন পানের পর ফার্গুস ধূমপানের জন্য হেঁটে বাইরে যায়। আর তখনই ক্লায়ার পর্দার ফাঁক দিয়ে হাত বাড়িয়ে আমার হাতটা ধরে বলে তার জানা ছিল সেটা আমার জন্য কত কঠিন ছিল। কিন্তু এটাই সে চাচ্ছিল, আর তার চাওয়াটা ছিল ঠিক।
স্টেফকে হারানো আমাদের জীবনের বড় ভুল। আমি সেটা করেছিলাম অনেক বছর আগে। স্টেফ ছাড়া আর কোনো সন্তানই আমি চাইনি। তোমার এখানে থেকে যাওয়া উচিৎ ঝিল টনি, কারণ স্টেফ তোমার জীবনেরই একটা অংশ। আমি কেবল মাথা নাড়তে পারলাম। সত্যিই ক্লায়ারের চোখে আগুন আছে। ওয়াইন আর মোমের আলোয় সত্যিই তাকে অপূর্ব দেখাচ্ছিল। ফার্গুস ঠিকই বলেছে, ক্লায়ারের ভিতর এই দ্বীপের শক্তি ছিল। সে আসলে চমৎকার, তার সৌন্দর্য্য ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। আমি বুঝতে পারছি আমি যখন তার সাথে ছিলাম এটাই আমাকে লেখার শক্তি যুগিয়েছে। চমৎকার শব্দের বুননের জন্য লড়াই করতে হয়েছে, লড়াই করতে হয়েছে তার ইচ্ছে পূরণ করার জন্য। লড়াই করেছি এবং হেরেছি, আর নিজেকে ঠেলে দিয়েছি একাকিত্ব আর নৈশব্দের দিকে। ক্লায়ারের কত ছবি আমার চোখের ওপর দিয়ে ভেসে যায়। যে ক্লায়রকে আমি মনে করতে পারি, যে ক্লায়ারকে আমি ভাবতাম আমি চিনি। হসপিটালে প্রথম স্টেফকে জড়িয়ে ধরে কেমন গোলাপী আর মলিন দেখাচ্ছিল ক্লায়ারকে। এরপর তার নিজের কোম্পানির লোকজনদের ডাকে, যে ব্যবসার দিকে তার আসলে তেমন কোনো মনযোগই ছিল না, শুধু ওপর থেকে নজর রাখতো পুরো বিষয়টায়।
পৃথিবীর অনেক গুলো জায়গায় নিজের পছন্দ মাফিক নানা রকম পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য নির্দেশ দেয় তাদের। যে সব আমি চিন্তাই করতে পারি না। শুধু ভাবি কিভাবে আমি একে ভালোবেসেছিলাম। তার নখ আমার পিঠের ওপর গেঁথে যায়। তার সুগন্ধ। তার শক্তি। যেটাকে সে বলতো এটা আগুনের মতো। মোমবাতি আর খালি গ্লাস পার হয়ে আসছিল সেই আগুন যা ছিল তার চোখে। সেই রাতে আমি আবার স্বপ্ন দেখলাম, আমি আর স্টেফ সাদা নৌকায় করে মাছ ধরতে যাচ্ছি। স্বপ্নটা সব সময় একটা বিশ্রি জানা ঘটনার দিকে মোড় নেয়। বাতাসের বেগ বাড়তে থাকে, আর মানান্নান মেঘ দিয়ে দ্বীপটাকে ঢেকে দেয়। ঢেউ বড় হতে হতে অলস ভাবে আমাদের দিকে এগোয়। আমি স্টেফের দিকে তাকাই। তার চামড়া ছিল সাদা। সে ইতোমধ্যেই মারা গেছে। কিন্তু সে তার মুখটা খোলা রেখেছে আর সমস্ত আইরিশ সমুদ্র তার ভিতর থেকে বের হয়ে আসছে।
পরদিন ক্লায়ার আমাকে আর স্টেফকে সাথে নিয়ে বের হয় দ্বীপের পুরান সব জায়গা দেখতে। সুর্যের তাপে আমার অসুস্থ হওয়ার দশা। ক্লায়ার অবশ্য আস্বস্ত করে সুস্থ হতে যা খরচ লাগে সেটা সে দেবে। যে রকম সব খরচই সে বহন করছে। দ্বীপের টাকা, যে টাকায় চলছে পুরান সব আকর্ষণীয় গুলো, যদিও সেগুলো দেখার জন্য কোনো পর্যটক নেই। বাষ্পচালিত রেলগাড়ি ... ঘোড়ায় টানা ট্রাম ... এমনকি বড় ওয়াটার হুইল। সব পরিষ্কার আর ঝিকমিক করছে। আমি আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করছি স্টেফের সাথে কথা চালিয়ে যেতে এবং তার সাথে বন্ধুর মতো আচরণ করতে। অর্থাৎ তার মনে নিজের সম্পর্কে পরিচিত একটা ছাপ এঁকে দেয়া। কিন্তু তার স্বাভাবিকের বাইরের অস্তিত্বের সাথে সম্পর্ক তৈরি করাটা কঠিন। আমি আরেক বিরক্তিকর মানুষ। নিজের কাছেই আশ্চর্য লাগছে কেন আমি এখানে এলাম আর কি এমন হবে যদি আমি না বলার চেষ্টা করি। সন্ধ্যাবেলা আমরা খাদের পাশ দিয়ে স্পেনিশ হেডের দিকে হাঁটছিলাম। সতেজ হাওয়া সমুদ্রের শব্দ আর গন্ধ বয়ে আনছিল। সমুদ্রের ধারের খাড়া পাহাড় সামুদ্রিক পাখিতে সাদা হয়ে ছিল। পিছনে এক ঝলক তাকিয়ে দেখলাম আমরা দোল খাওয়া ঘসের প্রান্তরকে পিছনে ফেলে এসেছি। সবে আমি স্টেফকে হেডল্যান্ডের নাম কিভাবে রণতরি বহর ঝড়ে পড়ে জাহাজ ডুবির ফলে হয়েছিল সেটা বলতে শুরু করেছি। কিন্তু সে অস্বাভাবিক ভাবে মাথা নাড়ল, যার কোনো অর্থই আমি খুঁজে পেলাম না। ক্লায়ারকে প্রকৃত অতিথি সেবক বলা যায়। সে তার সমস্ত সময়ই আমার জন্য ব্যয় করছে। এক সাথে হলেই সে আমার সাথে গল্পে মেতে উঠছে। পুরান আনন্দের স্মৃতি গুলো মনে করিয়ে দিচ্ছে।
এই দ্বীপ সম্পর্কে, এতে কী পরিবর্তন হয়েছে আর কোনোগুলো আগের মতোই আছে। সে মানুষ-জনকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। বড় একটা গাড়ি রাখা আছে, পুরোনো গান আর যে সব পুরোনো চেহার আমার স্মৃতিতে আছে। চমৎকার সব মানুষ, তাদের টাকা আর শক্তির বিনিময়ে স্বাছন্দ জীবন যাপন করে। তারা আসলে বয়সে ছাপ দেখতে এ¦তই অনভ্যস্ত যে তাদেরকে আমার কথা মনে করিয়ে দিতে হচ্ছিল। আমি বুঝলাম যখন অক্সিজের শেষ হয়ে যাবে,পৃথিবী মারা যাবে তখনও তারা হাসবে আর পান করতে থাকবে। ক্লায়ার যখন আমাকে আর স্টেফকে নিয়ে কুরাগের ওয়াল্ড লাইফ পার্কে গেল আমি অবাক হলাম। অবাক হলাম এর পরিবর্তন দেখে। অনেকগুলো খাঁচাই পূর্ণ করা হয়েছে গ্রীষ্মমন্ডলীয় প্রাণীতে। বেবুন, হামিংবার্ড আর থ। এখানে না রাখা হলে এ ধরণের প্রাণী পৃথিবীতে আর খুঁজে পাওয়া যেত না। যদিও তাদেরকে শিকের ভিতরে প্রাকৃতিক দেখানোর চেষ্টাটাও মানা যায় না। যথারীতি অন্য আকর্ষণীয় প্রাণীগুলোও ছিল সেখানে। ওসেলট আর অর্টাস এবং ছিল পেঙ্গুইন, গাঙচিলরা যাদের কাছ থেকে মাছ চুরি করে। এছাড়া ছিল লোটান ভেড়া, যে গুলো এক সময় দ্বীপের বুকে চরে বেড়াত। আরেকটা বড় আকর্ষণও ছিল। স্টেফ যেটার দিকে দৌড়ে গেল ঠিক আগের মতোই। আর মেডেলিন ল্যামব্রেডটাও এগিয়ে আসে খাঁচার গরাদের কাছে। আমার তরুণ বয়সে ম্যাডলিন প্রকৃতপক্ষে ছিল কাগুজে।
এটা নিশ্চয়ই স্টেফকে যে ক্লিনিকে তৈরি করা হয়েছে সেখান থেকেই তৈরি হয়েছে। সেই সময় দ্বীপের মানুষরা বেশ আতঙ্কে ছিল, যদি মূল ভূখণ্ডের লোকজন জেনে ফেলে আর আক্রমণ চালায়। যদি সব টাকা আর জাদু নিয়ে নেয়, সোনার ডিম! তারা এসব কাজের আগে বিজ্ঞানের জয়যাত্রা কথাটা বেশ কায়দা করে জুড়ে দেয়। যেন মনে হয় এটাতে কোনো টাকাপয়সা বানাবার ধান্দা নেই। ম্যাডলিন তার বিশাল দেহের পাশটা গরাদে ঘষতে লাগে। লোমগুলো ছিল জট পাকানো আর তৈলাক্ত। সেটা ভিজে কুকুরের মতো গন্ধ ছড়াচ্ছিল। আমি আর ক্লায়ার সেখান থেকে দূরে চলে এলাম। কিন্তু স্টেফকে দেখে মনে হলো ঐ রকম চর্বিযুক্ত থালাবাসন ধোয়া কাপড়ের গন্ধে তার কোনো সমস্যা হচ্ছে না।
স্টেফের কৌতুক শুনে ম্যাডলিনের উসকো খুসকো মাথায় কালো ছোট্ট চোখ গুলো ঝিকমিক করছিল। তার হাতির দাঁতের মতো দাঁত দুটো গত ১০ বছরে অনেক বড় হয়েছে। এগুলো সত্যিই দেখতে অস্বস্তিকর। তার ওপর এই গরমের মধ্যে। স্টেফ গরাদের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে সেটার জট পাকানো চুলের মধ্যে আঙুল চালাচ্ছিল। ম্যাডেলিন নামের ম্যামথঃ যেটার আসল কোষ এসেছিল সাইবেরিয়ায় গলতে থাকে একটা বরফের চাঁই থেকে। সেটার ডি এন এ মানচিত্রের কয়েকটা ধাপ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। কম্পিউটারের মাধ্যমে সেটাকে মেরামত করা হয়। যার ফলে যে ম্যামথ তৈরি হয়েছে সেটা নিয়ে বিতর্ক আছে, যে সেটা আসল নাকি কারো কল্পনা। এই একই জায়গা থেকে কোষ নিয়ে আর্জেন্টিনায় যেটা তৈরি হয়েছে সেটার গায়ে লোম অনেক কম এবং দুটো কুঁজ আছে একেবারে উটের মতো। রাশিয়ানরা তাদের নিজেদের মতো করেছে। তারা ম্যাডলিনকে ম্যামথ ক্লাবের অযোগ্য ঘোষণা করেছে। আসল স্টেফ দশ বছর আগে ম্যাডলিনকে এভাবেই পছন্দ করত। সে আমাদের কাছে বায়না করে চিড়িয়াখানা থেকে বের হওয়ার পথের দোকান থেকে একটা পোস্টার কিনেছিল। এখন এটা একটা পূর্বাভাস। স্টেফ এবং ম্যাডলিন। বড় এবং ছোট। একই জায়গা থেকে চেঁচে নেওয়া, চামড়ার মাঝখানের স্তর থেকে, যেটা থেকে সবচেয়ে ভালো ক্লোন হয়। এই বিষয়টা আমার মনে পড়ে গেল, বোধ হয় সেটা পোস্টারে কোথাও লেখা ছিল।
আমরা চিড়িয়াখানার বাইরের ক্যাফেতে বসলাম। ক্যাকটাসের ওপর দিয়ে গিরগিটি তীর বেগে ছুটছিল। লাল আর সবুজ রঙের ক্ষুদ্রাকৃতির টিয়ার ঝাঁক পাখা ঝাপটাচ্ছিল। আবার সেগুলো পরিপাটি করতে করতে পায়ে চলা পথের ওপর খাবারের টুকরো পড়ে কিনা সেটাও নজর রাখছিল। স্টেফ আরেক কার্টন জুস খাচ্ছিল। আমি ভেবে অবাক হচ্ছি আসল স্টেফ এই জিনিসটা কত অপছন্দ করত। সব সময় বলত এটা অতিরিক্ত মিষ্টি। এই স্টেফ অনর্গল বকে যাচ্ছে। পুরোনো কথা জিজ্ঞেস করছে, শেষ বার যখন সে এখানে এসেছিল তার কথা। সে আসল স্টেফকে খুব একটা গুরত্ব দিচ্ছিল না, কেবলই তার কৌতুহল। সে আমার চোখকে এড়িয়ে কথা বলছিল সরাসরি ক্লায়ারের দিকে তাকিয়ে। আমি তাকে বললাম, ‘তোমার কি মনে হয় না ম্যামথ আরও প্রচণ্ড হওয়া উচিৎ?’ ‘তার মানে ম্যাডলিন।’ আমি মাথা নাড়লাম, ‘হ্যাঁ ম্যাডলিন নামের ম্যামথ।’ সে তার নাকটা কোঁচকাল এবং তার ডান পা দোলাল। স্টেফ ভাবছিল। যদি তার ঠোঁট দুটো বেগুনি না হতো তাহলে এই মুহূর্তে তাকে ঠিক আগের মতোই মনে হত। আমি তাকে বেশ নিবিষ্ট হয়ে দেখছিলাম। এমন সময় চিড়িয়াখানার গোলাপী আর সাদা রঙের ছোট্ট ট্রেনটা এলো ঝমঝম করতে করতে এঁকেবেকে। স্টেফের উৎফুল্ল হয়ে সেদিকে তাকায়। সেই সাথে আমার প্রশ্নটাও সে ভুলে গেল, উত্তরও দিল না। এই নতুন স্টেফ একট ভজঘট জিগস্। যার টুকরোগুলো জুড়তে হবে। কিছু টুকরো পাওয়া যাচ্ছে না। কিছু মনে হয় কোনো দিনই এটার ছিল না। যে ক্লিনিকটাতে স্টেফকে তার চামড়ার ছাল থেকে পুনরায় বানানো হয়েছে সেটা ছিল পাহাড়ের মাথায়। যেখান থেকে নিচের ডগলাস আর পোতাশ্রয়ের বড় ইয়ট গুলো দেখা যাচ্ছিল। স্টেফকে ডিপ থেরাপি দেওয়ার সময় ক্লায়ার আমাকে সাথে করে সেখানে নিয়ে যায়। এরকম জায়গা এই দ্বীপে অনেকগুলোই ছিল। সেখানে পৃথিবীর অনেক জায়গার বিশেষ জিনিস গুলো তৈরি করা হয়। নতুন গাছ, নতুন প্রাণী, নতুন জনগণ। ভক্সের ভিতরের ছোট্ট ঘিলু। আমি বেশ অস্বস্তিতে ছিলাম। ওখানে থাকার সময় সারাক্ষণ আমার নজর ছিল একটা সাদা কোটের দিকে। ওরা স্টেফকে নিয়ে গেল, তারপর পুরু কাচের ভিতর দিয়ে তাকে দেখাল। স্ট্রেচারে করে তাকে বের করে আনলো কাফনের মতো সাদা কাপড়ে ঢেকে। আর তার মাথা থেকে অনেক গুলো তার বের হয়ে এসেছে। আমার পাশে যে ডাক্তার দাঁড়িয়ে ছিল সে আমার কাঁধে হাত রাখে, তারপর আমাকে তার অফিস রুমে নিয়ে যায়। সে আমাকে তার টেবিলের বিপরিত দিকে বসাল। তারপর এই দ্বীপের চলতি হাসি দিয়ে বলে, একটু গল্প করা যাক। ডাক্তার পেন্সিলটকে টেবিলের ওপর ঠুকছিল। ‘আমরা সবই বুঝি,’ সে বলে, ‘তোমার ভক্সের তথ্য স্টেফের সেরে ওঠার জন্য জরুরী। আমরা ডিপ থেরাপি দিয়ে অনেকটাই চেষ্টা করছি। সে হাঁটতে পারে, বলতে পারে, এমনকি সাঁতারও। আর আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি তার স্মৃতি ফিরিয়ে আনার।’ ‘তুমি কি স্মৃতি বানাতে পার?’ দিগন্ত অন্ধকার হয়ে আসছে।
পতাকা উড়ছে। বেড়া গুলো ঝনঝন করছে। সমুদ্র কেঁপে কেঁপে তরঙ্গ তুলছে। ‘আমরা সবাই স্মৃতি তৈরি করি।’ সে বলে। ‘তুমি কি গল্প লেখ না? তুমি জান স্মৃতি আর অতীত দুটো আলাদ বিষয়।’ ‘তুমি আমাকে কী করতে বল?’ ‘কাছাকাছি থাক, টনি। স্টেফ তোমাকে শিগগিরই পছন্দ করতে শুরু করবে।’ ‘এই ছোট মেয়েটা কারো একজনের মতো দেখতে, যে আমার মেয়ে হতে চায়। আর তুমি বলছ তার সাথে পারিবারিক বন্ধুর মতো আচরণ করতে। আবার পেন্সিলে ঠোকঠুকি চলে। ‘স্টেফের মৃত্যুর সাথে কি বিষয়টা জড়িত? সেটাই কি সমস্যা? তুমি কি নিজেকে দায়ী করছ?’ ‘অবশ্যই আমি নিজেকেই এর জন্য দোষ দেই... এবং না, এটা কোনো সমস্যা না। সমস্যাটা হতে পারে আমার সারা জীবনটাই... কেন আমি লিখতে পারি না। কিন্তু এখানে স্টেফের জন্য কিছু করার নেই আমার। এই স্টেফের জন্য। ‘ঠিক আছে,’ সে বলে। ‘তাহলে আমরা কী করবো?’ আমি চুপ করে থাকলাম। অপসৃয়মান পোতাশ্রয়ের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। শেষে সে বলে, ‘ঠিক আছে আমার একটা পরামর্শ আছে।’ আমি উৎসুক চোখে তাকাতেই সে বলে, ‘তোমার বক্সটা ব্যবহার করতে দাও।’ আমি মাথা নাড়ি, ‘না।’ ‘তুমি যদি আমাদের সাংকেতিক শব্দটা দাও তাহলে আমরা সব ডাটা মেইনফ্রেমে তার কপি রেখে দেব। অবশ্যই নিরাপত্তার সাথেই থাকবে। আমরা অবশ্যই এটাকে ফিল্টার করব। অল্প কিছু অংশই আমাদের এর থেকে কাজে লাগবে।’ ‘আর তোমরা আমার অসংলগ্ন চিন্তা স্টেফের মাথার ভিতর ঢুকিয়ে দেবে।’ ‘তোমার একটা বিশাল অংশ এতে আছে। তুমি নিশ্চিত থাক, আমরা এর থেকে ভালো এবং দরকারি অংশটুকুই নেব।’ সে তার হাতটা তুলে ধরে আমার সাথে করমর্দনের জন্য। ‘এটা নিয়ে চিন্তা করে দেখ। আমার মনে হয় এটাই এগুবার একমাত্র পথ। স্টেফের জন্য।’ ক্লিনিকের পার্কিংএ গাড়ি রাখার সময় ক্লায়ার দুই এক ফোটা বৃষ্টি পড়তে দেথে হুডটা তুলে দিয়েছিল।
স্টেফ পিছনের সিটে বসেছিল, হাতে সেই বেগুনি রঙের জুসের নতুন একটা কার্টন। তাকে স্বাভাবিকই দেখাচ্ছিল, এমনকি আমার কাছাকাছি থেকেও। ডিপ থেরাপি দেওয়ার ফলে তার মাথায় যে নতুন বিষয় ঢুকেছে হতে পারে তার জন্য। আসল বৃষ্টি শুরু হলো আমরা যখন ফেয়রি ব্রিজ পার হচ্ছি। পরিদের উদ্দেশে বললাম ক্রেন, অ্যাশ, টাউ। ধূসর একটা পর্দা ক্রমে আকাশটাকে ঢেঁকে ফেলছে। গাড়ির হুড জায়গায় জায়গায় ফুটো আর ভাঙা। আমরা কেলগে ফিরতে ফিরতে ভিজে ঠান্ডায় কাঁপতে লাগলাম। রাস্তার পানি ভরা গর্তে পড়ে গাড়ি সশব্দে কেঁপে উঠছিল। আমরা পৌঁছাতেই ফার্গুস স্টেফকে দৌড়ে নিয়ে গেল গোসলখানার দিকে। পানির শব্দ শোনা গেল। আর শুনলাম স্টেফের চিৎকার সেই সাথে ফার্গুসের কর্কশ হাসি। আমার থাকার অংশে ঢুকে আমি স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক্ষণ ধরে গোসল করলাম। এক ধরণের প্রশান্তি এলো মনে। পরিষ্কার সাদা দেয়াল, নতুন সাবান আর তোয়ালে ক্লায়ারের পরবর্তী অতিথির জন্য অপেক্ষা করছিল। সেখানে আমি আমার বেশ কিছু আনন্দের সময় কাটিয়েছি। আমি লিখেছি, ক্লায়ারের প্রেমে পড়েছি। তার বাবা তখন বেঁচে। সে তখন মুক্ত বিহঙ্গ। মূল ভূখণ্ডের পৈত্রিক সম্পত্তি দুহাতে খরচ করছিল কোনো ভবিষ্যতের কথা চিন্তা না করে। আর সেই চিন্তাটা প্রায় সত্যিই ছিল। দ্বিতীয় বৃহৎ বন্যার আগে আমাদের সাক্ষাৎ হয়েছিল লন্ডনে। কেলাগে আমাকে আমন্ত্রণের অনুমতির জন্য সে জোর চেষ্টা চালিয়েছিল। সেখানে আমি এক ভাস্করের ফেলে যাওয়া ধুলো ভার্তি কার্পেট খুঁজে পেয়েছিলাম। আমরা একে অপরকে ভালোবাসলাম। এর মধ্যে তার বাবা মারা গেলেন আর আমি তার সাথে চলে এলাম। স্টেফ তখন তার সাথে। তারপরও আমরা বিয়ে করলাম।
আমার কাজ তখন বিক্রি হচ্ছিল ভালোই। এর জন্য তার কোনো সহযোগিতা আমার দরকার ছিল না। ক্লায়ার আর স্টেফের সাথে বসবাস করার জন্য আমি আমার নিজস্ব একটা গড়ন ভেবে নিয়েছিলাম। কিন্তু আমি বুঝতে পারলাম আমি অন্য একটা গড়নের অংশ হয়ে গিয়েছি। ক্লায়ার শিল্পী খুঁজে আনতো। সে তাদের টাকা দিত, উৎসাহ যোগাত, সমালোচনা থেকে শুরু যোগাযোগ করে দিত। এমন কি সে তাদেরকে নিজের শরীরটাই দিয়ে দিত। যেহেতু স্টেফের জন্য আমার ক্লায়ারকে প্রয়োজন তাই আমি আমার পরিকল্পনার বাইরে কেলাগে থেকে গেলাম। দ্বীপটাতে একটা নেশা আছে, এমনকি তাদের ক্ষেত্রে যারা এখানকার না। টাকা, বিভিন্ন পার্টি, শক্তি। সেই সব মানুষেরা যারা থাকত উৎফুল্ল আর অকৃত্রিম, যারা ইতিহাস জানে, যারা জানে হিউমার এবং শিল্প, যারা একটা ফোনের মাধ্যমেই জীবন-মৃত্যুকে ডেকে আনতে পারে, যারা সূর্যোদয় পর্যন্ত ব্রান্ডি আর শ্যাম্পেন নিয়ে আলাপের অথবা তর্ক করে যেতে পারে, যারা যেকোনো সময় তামাশা করতে পারে আবার গম্ভীরও হয়ে যেতে পারে অথবা ভাব করতে পারে প্রেমে পড়েছে... যারা সব কিছুই করতে পারে যেটাই হোক আর যেভাবেই হোক এবং হোক না সেটা তাদের নিজেদের মতো করে।
ফার্গুস ছিল তার শেষ এবং দীর্ঘদিনের অনুগামী। মনে আছে এক সকালের কথা, খুব গরম ছিল। আমি বাড়ির বর্ধিত অংশের শোবার ঘরে গিয়েছিলাম একটা বই ধার করতে। সেখানে আমি ফার্গুস আর ক্লায়ারকে একসাথে দেখি। তাদের শরীর মিষ্টি জুসে চকচক করছিল। তারা উঠে বসে কিন্তু কিছুই বলে নি। কেবল আমিই লজ্জা পেলাম। তখন ক্লায়ার আমাকে তার ওসব ব্যাপারে কোনোদিন মিথ্যা বলে নি। সে শুধু আমার সামনে থেকে সরিয়ে রাখত। এরকম একটা ধাক্কা খাওয়ার জন্য আমার নিজের কাছে কোনো যুক্তি ছিল না। আমি সব সময়ই জানতাম কেবল এই দ্বীপ এটার বিস্বস্তাতা বজায় রাখে। কিন্তু ভান করাটা সত্যিই কষ্টকর। আমি দৌড়ে বোগেনভেলিয়া ফুলের ঝাড় পার হয়ে ছুটে গেলাম সাদা নৌকাটার দিকে। স্টেফ সকাল সকাল উঠে পড়ে। দোলচেয়ারে দুলছিল পা দুটো উঁচু করে, পা বেয়ে যাতে পিঁপড়েরা উঠতে না পারে। সে আমাকে ‘হাই’ বলে, জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি কি মাছ ধরতে যাচ্ছ, আমি তোমার সাথে আসতে পারি?’ আমি হেসে তার চুল এলোমেলো করে দিলাম।
আকাশটা ছিল গরম আর ধাতব নীল। স্টেফ হালটা নেয়। পানি দাঁড়ের ওপর থেকে পিছলে যাচ্ছিল যেন সবুজ জেলি। আমি বেয়েই যেতে থাকলাম যতকক্ষণ না ঠান্ডা বাতাস বইতে শুরু করলো আর মানান্নান দ্বীপটাকে অন্ধকারে ঢেঁকে দিল। ক্লিনিক থেকে ফেরার পর সেই রাতে আমি স্টেফকে শুভরাত্রি জানাতে গেলাম। একসাথে বিদায়ও হতে পারে, কারণ আমি তখন নিশ্চিত ছিলাম না। ঝড়টা জানালার ওপর ঝনঝনিয়ে আছড়ে পড়ছিল, সেই সাথে ঢেউ এসে ধাক্কা দিচ্ছিল নিচের পাথরে। অনন্ধকারে বালিশে রাখা তার মুখটা দেখতে পেলাম, তার চোখ চকচক করছিল। ‘আমি কি তোমাকে জাগিয়ে দিলাম?’ ‘না।’ ‘তুমি সব সময় এই ভাবে কথা বল। ‘না’। সবার মতো নরম করে না।’ ‘মা আমাকে যেভাবে বলেছে, যেভাবে আমি সব সময় করতাম।’ ‘এটা কি রকম অদ্ভুত মনে হয় না? তুমি কি জান তুমি কে?’ আমি দরজাটা বন্ধ করে দিলাম। এটা ছয় বছরের একটা বাচ্চার জন্য উদ্ভট প্রশ্ন। তার বিছানার পাশে সেই পুরোনো নড়বড়ে চেয়ারটায় বসলাম আমি। ‘তুমি কি আমাকে দেখে নিজেকে বাবার মতো মনে কর?’ ‘এটা জোর করে দুদিক থেকে টেনে আনার মতো। তুমি আমাকে চিনতে পারনি।’ ‘আমি জানি তুমি কে। আমি বইয়ের পিছনে তোমার ছবি দেখেছি, মা দেখিয়েছে। কিন্তু তুমি পুরোপুরি সে রকম দেখতে না।’ ‘সেটা অনেক আগের কথা। আসল স্টেফ... অন্যরকম হওয়ার কথা।’ আসল স্টেফ। আমাকে সেটাই বলতে হলো। ‘সত্যিই আমি কিছু বুঝতে পারছি না।’ ‘বোঝার দরকার নেই। তুমি যা তুমি তাই।’ আমার একেবারে ভিতরে সবকিছু ঘটছিল। এইখানে, এই ঘর যা আমি চিনি খুব ভালোভাবে। আমি তাকে চুমু খেতে চাইলাম, আমি তাকে উঁচু করে ধরতে চাইলাম, সব বাধা সরিয়ে সত্যিকারের কিছু করার ইচ্ছে। কিন্তু আমি জানি যা কিছুই আমি ছুঁতে চাই সবই স্মৃতির শুকনো খোলস।
আমার ঘরে ঢুকে দেখি ক্লায়ার আমার ভক্সটা নিয়ে বসে আছে, সেটার লাল আলো জ্বলজ্বল করছিল। আমি বিছানায় তার পাশে বসলাম। তার পরনে ছিল তোয়ালের গাউন। তার শরীর থেকে শরতের মতো সতেজ সুগন্ধ আসছিল আর একাধারে তাকে সুখি এবং বিষণ্ণ মনে হচ্ছিল। ‘তুমি তো জান আজ ওরা কী জিজ্ঞেস করছিল ক্লিনিকে।’ আমি বলি তাকে। ‘তুমি বদলে গেছ টনি।’ সে ভক্সের ছোট্ট তারটা সামনে পিছনে দোলাতে দোলাতে বলে, ‘আমি ভেবেছিলাম পুরোনো তোমাকে ফিরিয়ে আনতে পারব।’ ‘যেমন স্টেফকে আনতে চাইছো?’ ‘না,’ সে বলে, ‘ওটা সম্ভব, কিন্তু তোমাকে অসম্ভব।’ ভক্সটার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আমি জিজ্ঞেস করি, ‘কেন তুমি আমাকে এখানে টেনে আনলে? তুমি যেমন চাইছো আমি তেমন হতে পারব না... আমি কখনো সেরকম ছিলাম না। কিছু মিথের বলে তুমি আমাকে স্টেফের বাবা বানাতে চেয়েছিলে। আমি সেটা হতে পারব না। তুমি কি আমাকে বেচারা ফার্গুসের মতো হতে বলো? সে কো