দখলে দূষণে মৃতপ্রায় চিত্রা

আপডেট: 03:29:51 20/02/2018



img
img

মৌসুমী নিলু, নড়াইল : চিত্রা। নামেই যে নদীর পরিচয়। এই নদীর পাড়ে বসেই বিখ্যাত চিত্রী লাল মিয়া ছবি আঁকতেন, শিশুদের নিয়ে শিশুস্বর্গ নৌকা ভাসিয়ে বেরিয়ে পড়তেন। এখনো বর্ষা এলে নদীতে নৌকাবাইচ উপভোগ করেন হাজারো মানুষ ।
কুষ্টিয়ার কালিগঙ্গা নদী থেকে চিত্রা নদীর উৎপত্তি। সেখান থেকে ঝিনাইদহ, মাগুরা হয়ে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে একটি শাখা খুলনার ভৈরবের সঙ্গে আর অন্যটি মিলিত হয় কালিয়ার গাজিরহাটে নবগঙ্গার সঙ্গে।
একসময়ের স্রোতস্বিনী চিত্রার পাড়ে গড়ে উঠেছিল নড়াইল শহর। আর নদীর তীরে গড়ে উঠেছিল অনেক বাজার-হাট-বন্দর। চিত্রার ঘাটে ঘাটে স্টিমার চলতো। তখন কলকাতা থেকে স্টিমার নিয়ে বণিকেরা খুলনা হয়ে নদীপথেই নড়াইলে আসতেন বাণিজ্য করতে লোক আর পসরা নিয়ে।
সে সব এখন কেবলই স্মৃতি। কালের আবর্তে চিত্রা নদী তার রূপ যৌবন সবই হারিয়েছে। তবে তার জন্য যতটা প্রাকৃতিক কারণ দায়ী তার চেয়ে মানুষের তৈরি কারণ অনেক বেশি দায়ী বলে মনে করেন নদীপ্রেমীরা ।
স্থানীয়রা জানান, নড়াইল শহরের পাশ দিয়ে বয়ে চলা চিত্রা পাড়ের অধিকাংশ জায়গা দখল আর দূষণের ফলে নদীর অবস্থা শোচনীয়। এসব দখলের জন্য একশ্রেণির সরকারি কর্মচারী খাস জমি দেখিয়ে তা দখল করে স্থায়ী নিবাস গড়ে তুলে বসবাস করছেন। শুধু কর্মচারীরাই না, এই নদী দখল করে আছে শহরের কয়েকজন প্রভাবশালী ভূমিদস্যুও। মাঝে মধ্যে ‘নদী বাঁচাও’ আন্দোলনকারীদের চাপে পড়ে মাপজোখ শুরু হলেও দ্রুতই অদৃশ্য কারণে তা বন্ধ হয়ে যায়। কিছুদিন বাদেই আবার নতুন করে শুরু হয় নদী দখলের চেষ্টা। এভাবে চিত্রা নদীর নড়াইল শহরের পাড়ে অন্তত ১০০ বাড়ি বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে প্রশাসনের সামনে। এছাড়া নদীপাড়ের অসংখ্য বাড়ির পয়ঃনিষ্কাশনের পাইপ দেওয়া হয়েছে নদীর ভেতরে। এছাড়াও যোগ হয় বর্ষাকালে পাটজাগ ফলে চিত্রা নদীর প্রবহমান অংশের পানি পচে মাছসহ প্রাণিকুল মারা যায় ।
শহরের আলাদাতপুর এলাকার বাহাউদ্দিন চমকের মতে, শহরের সব ক্লিনিক ও হাসপাতলের বর্জ্য বছরের পর বছর প্রকাশ্যে নদীতে ফেলা হলেও এব্যাপারে প্রশাসনের কোনো মাথা ব্যথা নেই। চিত্রা নদীর বিভিন্ন জায়গা ডাস্টবিনে পরিণত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মহিষখোলা এলাকার গৃহিণী সোনিয়া খানম জানান, প্রতিদিন কুণ্ডুদের ঘাটে পোল্ট্রি ব্যবসায়ীরা বর্জ্য ফেলছে নির্দ্বিধায়। নদীতে গোসল করতে গেলে পানি থেকে গন্ধ বের হয়। আগে এই নদীর পানি দিয়ে রান্না করা গেলেও এখন আর যায় না।
স্থানীয়রা বলছেন, গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্পের জন্য কালিগঙ্গা, মাথাভাঙ্গা ও কুমার নদে বাঁধ দেওয়া হয়। এতে করে কুষ্টিয়ার কাছে উৎসমুখে চিত্রা নদী মরে যায়। এর পরে মাগুরাতে বাঁধ দেওয়া হলে ধীরে ধীরে স্রোতহীন হয়ে ক্ষীণ ধারায় বইতে থাকে চিত্রা। ফলে মাগুরা থেকে নড়াইলে আসার পথে নদীতীরে গড়ে ওঠা বেশকিছু বাণিজ্যকেন্দ্র নিঃশেষ হতে থাকে। আর পানির প্রবাহ না থাকায় এ অঞ্চলের খালগুলো মরে গিয়ে বিল এলাকার হাজার হাজার হেক্টর জমির সেচ সুবিধা বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়া নদীতীরবর্তী এলাকাগুলোতে ষাটের দশক থেকে অপরিকল্পিত বেড়িবাঁধ নির্মাণ করায় মরে গেছে নদীগুলো।
ইতিমধ্যে কুষ্টিয়া থেকে মাগুরা পর্যন্ত নদীর অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেলে ও মাগুরার নিচে গড়ের হাট থেকে নড়াইলের ঘোড়াখালী পর্যন্ত প্রবহমান রয়েছে। তবে মৃতপ্রায় এই নদীকে আরো মেরে ফেলার সরকারি উদ্যোগেও উদ্বিগ্ন স্থানীয়রা। মাগুরার বুনাগাতি থেকে নড়াইলের সুলতান ব্রিজ পর্যন্ত ৩০ কিলেমিটার নদীপথে পাঁচটি সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। সেতুগুলো নির্মাণের সময় দুই পাশে ক্রসবাঁধ দেওয়ার কারণে নদী আরো শুকিয়ে যাচ্ছে বলে তাদের ধারণা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তিন বছর আগে নড়াইল সদর থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে চিত্রা নদীর শাহাবাদ-চরবিলা পয়েন্টে একটি সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয় এলজিইডি। ৩৬ মিটার দীর্ঘ ৩.৭ মিটার প্রস্থের এই ব্রিজটি তৈরি করতে নদীর দুই অংশে বাঁধ দিয়ে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে স্থায়ী রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছিল। এর ফলে ওই এলাকায় তখন জোয়ার-ভাটা না থাকায় পলি পড়ে নদী আরো মরে গিয়েছে বলে স্থানীয়দের ধারণা।
শাহাবাদ গ্রামের মন্টু শেখ বলেন, ‘নদীতে ব্রিজ জনগণের উপকারের জন্য করা হলেও বিভিন্ন সময় সেতু তৈরির এই প্রক্রিয়া নদীকে মেরে ফেলে। সরকারি এই নিয়মে সেতু নির্মাণ করাটা আত্মঘাতী।’
আমরা সাময়িক সুবিধা পেতে বড় একটি সম্পদ হারাচ্ছি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আজিম উদ্দিন জানান, সম্প্রতি জেলা প্রশাসকের নির্দেশে নড়াইল পৌর ভূমি অফিসের একটি টিম শহর এলাকায় একটি জরিপ করেছে। জরিপে ৬৩ জন অবৈধ দখলদার বিভিন্ন এলাকায় নদীপাড় দখল করে আছে বলে শনাক্ত করা হয়েছে।
নদী বাঁচাও আন্দোলনের নেতা কাজী হাফিজুর রহমান জানান, চিত্রা নদী এখনই সুরক্ষা করা দরকার। ভূমিদস্যু ও দখলদারদের হাত থেকে চিত্রা নদীকে বাঁচানোর জন্য সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করে চিত্রা নদীকে দখল ও দূষণের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে। ভূমিদস্যু ও দখলদারদের হাত থেকে চিত্রা নদীকে বাঁচানোর জন্য প্রশাসনকে দ্রুত দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করার আহ্বান জানান এই নেতা।
জেলা প্রশাসক মো. এমদাদুল হক চৌধুরী জানান, চিত্রা নদীকে দখল ও দূষণমুক্ত করার কাজ শুরু করা হয়েছে। যারা অবৈধভাবে নদী দখল করে আছে তাদেরকে দ্রুত স্ব-স্ব স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার জন্য অফিসিয়ালি নোটিস করা হবে। যদি কোনো দখলদার তাদের স্থাপনা সরিয়ে না নেয়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিয়ে নদীকে দখল ও দূষণমুক্ত করা হবে।