আমরা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েই থাকবো

আপডেট: 02:13:56 16/06/2017



img

আহসান কবির

৩১ মে, ১৯৭১। বাবা-মাকে নিজের সুন্দর একটা ছবি বাঁধাই করে দিয়ে ক্রিকেটার আব্দুল হামিদ চৌধুরী জুয়েল বলেছিলেন, ‘কখনও হারিয়ে গেলে এই ছবির ভেতরই আমাকে খুঁজে পাবে’। এরপর ভারতে গিয়ে খালেদ মোশাররফের অধীনে ট্রেনিং নিয়েছিলেন জুয়েল। সিদ্ধিরগঞ্জের এক সফল অপারেশন শেষে নৌকায় করে ফেরার পথে আঙুলে গুলি লেগেছিল স্টাইলিশ ব্যাটসম্যান জুয়েলের। তিন আঙুল উড়ে যাওয়ার পর গুরুতর আহত অবস্থায় আশ্রয় নিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধের আরেক নায়ক হাবিবুল আলমের মগবাজার দিলু রোডের বাসায়। ইচ্ছে ছিল একহাত দিয়েই ক্রিকেট খেলবেন। তারপর একদিন। আহত অবস্থায় গিয়েছিলেন হাবিুল আলমের বাসার কাছেই শহীদ আজাদের বাসায়। আগস্ট মাসের শেষে শহীদ আজাদের বাসা থেকেই গ্রেফতার হন জুয়েল। আহত আঙুলের ওপর সীমাহীন অত্যাচার করেছিল পাকিস্তানি সেনারা। টর্চার সেলে জিজ্ঞাসাবাদের সময় অমানবিক অত্যাচার সয়েছেন তবু বন্ধুদের কারও ঠিকানা বলেননি জুয়েল। ৭১’র আগস্ট মাসের শেষদিন থেকে জুয়েলকে আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি!
জুয়েলের মতো এত ভাগ্যহীন ছিলেন না শহীদ ক্রিকেটার মুশতাক। পাকিস্তানি হায়েনারা তাকে হত্যা করে ফেলে রেখেছিল ক্রীড়া ভবনের সামনে। তার লাশ দুইদিন পড়েছিল! (রক্তের কাফনে মোড়া  কুকুরে খেযেছে যারে, শকুনে খেয়েছে যারে সে আমার ভাই, সে আমার মা, সে আমার প্রিয়তম পিতা- রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ)
সেই মুশতাক জুয়েলদের বাংলাদেশ এখন ক্রিকেটের স্বপ্নময় দেশ। ক্রিকেট এখন এদেশের বিভাজিত মানুষকে এক করে দেয়, স্বপ্ন দেখায়। ১৯৯৭ সালের পর ক্রিকেট অনেক কিছুই বদলে দিয়েছে, ভবিষ্যতেও হয়তো দেবে! আগে কিশোর কিশোরী বয়সে প্রেমের (‘আমার লাইন হইয়া যায় আঁকা বাঁকা/ভালো না হাতের লেখা'র যুগে) যে চিঠি লেখা হতো সেখানেও ক্রিকেটীয় ভাষা ছিল ব্যাপক। যেমন কোন এক কিশোরী লিখতো – ‘ওগো, আমার বাসার সামনে তোমার ফিল্ডিং মারার দিনগুলো আজো ভুলতে পারিনি। বল বানিয়ে আমাকে ছুড়ে দেওয়া চিঠি পড়েছিল বাবার হাতে, তুমি কট অ্যান্ড বোল্ড হয়েছিলে। এরপর চার ছক্কা সমেত কী বেড়ধক না পেটানো হয়েছিল তোমাকে! মার খেয়ে মাথা নিচু করে সেদিন তোমাকে আমার ভালোবাসার স্টেডিয়াম থেকে চলে যেতে হয়েছিল। দৌড়ে চলে যাওয়ার সময়ে সেদিন আমার মনে হয়েছিল তোমার রানিং বিটুইন দ্য উইকেটের গতিও খারাপ না! মনে পড়ে ডার্লিং?’
এখন চিঠির যুগ নেই, আছে এসএমএস! সেখানেও এসেছে ক্রিকেট আধুনিকভাবে। বিয়ে ভেঙে যাওয়ার আগে কেউ হয়তো এখন আকুতি ভরা এসএমএস লেখে এভাবে- আমাকে তুমি গৌরবময় (?) অনিশ্চয়তার এই জীবন (ক্রিকেট গৌরবময় অনিশ্চয়তার খেলা) থেকে মুক্তি দাও! কাউকে আউট করার পর ক্রিকেটার তাসকিন যেভাবে হাতমেলে দৌড়ায় আর উল্লাস করে আমিও তেমন এক মুক্তজীবনে ফিরে যেতে চাই!
চাইলেও এদেশবাসী  ক্রিকেটীয় জীবন থেকে ফিরতে পারবে না, সম্ভবত আর ফিরবেও না! এখন হচ্ছে love cricket, eat cricket, sleep in cricket আর dream cricket এর যুগ। ক্রিকেট এখন স্বপ্ন আর রঙিন ক্যারিয়ারের হাতছানি। ক্রিকেট এখন উন্মাদনা, ক্রিকেট এখন কালচার। ক্রিকেট এখন স্টেডিয়ামের মতো বড় পর্দার সামনে অথবা টেলিভিশনের সামনে নিজ নিজ ঘরে সমান আনন্দময়। ক্রিকেট এখন চুটিয়ে আড্ডা আর হাসি-আনন্দ কিংবা কান্নার সমার্থক। ক্রিকেট এখন শুধু নিছক খেলা না, হাসি আর কান্নার উৎস না, স্বপ্ন আর ঐক্যের প্রতীক। শুধু বাংলাদেশে না, এই উপমহাদেশে ক্রিকেটের চেহারাটাই এমন। এই উপমহাদেশে ক্রিকেটকে মাপা হয় অন্যরকম উচ্চতায়। জড়িয়ে থাকে আবেগ।
লগান ছবিটার কথা নিশ্চয়ই মনে আছে। কথা ছিল ব্রিটিশ রাজ রাজস্ব মাফ করে দেবে, প্রয়োজনে এলাকা ছেড়ে চলে যাবে তারা, যদি নেটিভরা রাজাদের সাথে রাজাদের খেলায় জিতে যায়! শেষমেষ খেলায় জিতেছিল নেটিভরা। যেখানে আবেগ জড়িয়ে থাকে, যেখানে থাকে দেশপ্রেম আর ভাতৃত্বের বন্ধন সেখানেই সম্ভব সবকিছু। তাই শত জাতি আর ভাষার দেশ ভারতকে ঐক্যবদ্ধ রাখে ক্রিকেট আর হিন্দি ফিল্ম।
পাকিস্তানের যেদিন ক্রিকেট খেলা থাকে সেদিন নাকি পাকিস্তানে বোমা গ্রেনেড কম ফোটে! শ্রীলংকাতে যখন তামিল বিদ্রোহীরা ছিল তখনও নাকি সে দেশের খেলার দিন তারা হামলা চালাতো না!
ব্রিটিশরাই এদেশে ক্রিকেট খেলা এনেছিল। রাজাদের খেলা হলেও ক্রিকেটের এককালীন রাজার দেশ ইংল্যান্ডের রেকর্ড তেমন ভালো না। ক্রিকেটকে ভদ্রলোকের খেলা বলে প্রথম থেকে প্রচারণা চালিয়েছিল ব্রিটিশরাই। তারা জেন্টেলম্যান নামে একটা টিম বানিয়ে এখানে ওখানে ক্রিকেট খেলতো। এর মানে এই নয় যারা হাডুডু, দাঁড়িয়াবান্ধা, ডাংগুলি, ফুটবল, হকি, ভলিবল খেলে তারা অভদ্রলোক। সারা পৃথিবীতে ক্রিকেট অসভ্যতার সবচাইতে বেশি রেকর্ড কিন্তু ব্রিটিশদের। ঘরে আগুন দেওয়া, গ্যালারিতে মারামারি, ক্রিকেট পিচে হিসি করে দেওয়া, ক্রিকেট ক্রিজকে বিয়ার দিয়ে ভিজিয়ে বিজয় উদযাপন করা শুধুমাত্র ব্রিটিশদের পক্ষেই সম্ভব! যে ইংল্যান্ড ক্রিকেট খেলার গোড়াপত্তন করেছে তারাই কোনও বড় আসরে শিরোপা পায়নি। প্রথম টেস্ট আর প্রথম ওয়ানডেতেও তারা জেতেনি। নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে যে বাংলাদেশে তারা আসতে চায়নি, চ্যাম্পিয়ন ট্রফির খেলা চলাকালীন সময়ে সেই ইংল্যান্ডেই সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে। বাংলাদেশসহ কোনও দেশ বলেনি যে ইংল্যান্ডে গিয়ে ক্রিকেট খেলাটা ঝুঁকিপূর্ণ! ক্রিকেটে মোড়লগিড়ি করতে ভালোবাসে ইংল্যান্ড, সেই সাথে অস্ট্রেলিয়া এবং ভারত। ইংল্যান্ডের কথা বলা হলো এই কারণে যে, যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারত দখল করে ইংল্যান্ডের পদানত করেছিল তারাই প্রথম এই উপমহাদেশে ক্রিকেট খেলার আয়োজন করেছিল! ১৯৩৪ সালে রঞ্জি ট্রফি চালু হওয়ার পর ১৯৩৮ সালে শিরোপা জিতেছিল এই বাংলা (অবিভক্ত)। বহুদিন পর এই বাংলার উত্তরসূরিরাই ক্রিকেটের কোনও বড় আসরে (আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফি) সেমিফাইনালে উঠেছে। সাথে আছে ইংল্যান্ডের সেই উপমহাদেশই! ভারত, পাকিস্তান!
উপমহাদেশের দুই দেশ ভারত আর পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের ক্রিকেট খেলা মানে অন্যরকম একটা ব্যাপার, ভিন্ন মাত্রার উত্তেজনা! পাকিস্তানের সাথে খেলাটা বাংলাদেশের জন্য আজীবন উত্তেজনার। না চাইলেও শহীদ মুশতাক আর জুয়েলের কথা মনে পড়ে যায়। ৭১ এর উত্তাল মার্চে যেদিন স্টেডিয়ামে আগুন দিয়েছিল স্বাধীনতাকামী বাঙালি, সেদিন পাকিস্তান টিমের একমাত্র বাঙালি সদস্য রকিবুল হাসান যে ব্যাট নিয়ে খেলতে নেমেছিলেন সেই ব্যাটে লেখা ছিল জয় বাংলা! ১৯৯৯ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে জয় পাওয়াটা ছিল অসম্ভব অনুপ্রেরণার। আনন্দ আর তুমুল উত্তেজনার। এরপর পাকিস্তানের মুলতানে এক টেস্টে বাংলাদেশকে হারিয়ে দেওয়ার স্মৃতি কখনোই ভোলা সম্ভব না। সম্ভব না এশিয়া কাপে পাকিস্তানের কাছে হারার পর ক্রিকেটার মুশফিকুর রহিম আর সাকিব আল হাসানের কান্নার সেই দৃশ্য। শহীদ জুয়েল আর মুশতাকের দেশে ক্রিকেট এখন এদেশের মানুষের কান্না হাসি মাপার ব্যারোমিটার!
ক্রিকেটের তিন মোড়লের একজন ভারতের সাথে বাংলাদেশের ক্রিকেট সম্পর্কটাও কেমন যেন। আইসিসি এবং ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের একসময়ের চেয়ারম্যান জগমোহন ডালমিঞা ( বাঙালি বলেই এমন নাম। ভদ্রলোক মারা গেছেন) টেস্ট স্ট্যাটাস পেতে বাংলাদেশকে যতোই সাহায্য করে থাকুন না কেন, ভারত বাংলাদেশের খেলা হলে ২০১৫ সালের একদিনের ক্রিকেট বিশ্বকাপের কথা মনে পড়বেই। ২০১৫ সালের ১৯ মার্চ একদিনের ক্রিকেট বিশ্বকাপে ছিল বাংলাদেশ আর ভারতের খেলা। ক্রমাগত ভালো খেলতে থাকা বাংলাদেশের বিজয়ের রথ সেদিন যেন থামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বিতর্কিত আম্পায়ারিংয়ের চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে এই ম্যাচ। খেলা শেষে কান্নাকাতর মাশরাফি তার বাবাকে টেলিফোনে শুধু এইটুকু বলতে পেরেছিলেন- বাবা আজ আমাদের হারিয়ে দেওয়া হয়েছে!
বিশেষ দ্রষ্টব্য : আমি অবশ্য আমার বাবাকে এই কথা বলতে পারিনি এবং পরাজয়ের এই ম্যাচ আমার দেখা সম্ভব হয়নি।  কারণ আমি আমার বাবাকে হারাই এইদিন। এরপর ১৮ জুন ২০১৫ সালে বাংলাদেশ ভারতকে ৭৯ রানে হারানোর পর আকাশের দিকে তাকিয়ে শুধু এইটুকু জানতে চেয়েছিলাম- বাবা তুমি কী দেখতে পাচ্ছো?
চোখের জল মুছে বিজয়ের আনন্দে মাতবার দিন খুব কমই এসেছে জাতির জীবনে। বাংলাদেশের জন্য এমন আরেকটা বিজয় খুব বেশি দরকার। চিৎকার করে আমরা বলতে চাই- আকাশ তুমি সরে যাও! আমরা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েই থাকবো!
লেখক : মিডিয়াকর্মী, অভিনেতা, রম্যলেখক