‘এমন গন্ধ হবে জানলে চাল পানিতে ফেলতাম না’

আপডেট: 07:54:40 29/08/2018



img
img

তারেক মাহমুদ, কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) : ‘বাড়ির পাশে তিন পুকুরে চাল ফেলেছিলাম। বেশি ফেলেছিলাম পচা পুকুরে। মামু, আগে যদি জানতাম এই ঘটনা হবে, তাহলে লাখ টাকা লাভ হলেও ভিজিএফের চাল কিনতাম না। চাল পচে এমন গন্ধ হবে বুঝে উঠতে পারিনি। জানলে পানির মধ্যে ফেলতাম না। আমার মুখ দিয়ে আমি এখনো বলিনি। বারবার বলিছি আমি কিনিনি। ও মামু, এখন কী করা যাবে কন’- এভাবেই ইউপি চেয়ারম্যান খোরশেদ আলমের সঙ্গে ফোনে কথা বলছিলেন ঝিনাইদহের চাল ব্যবসায়ী আজিজুল; যার বাড়ির পাশে কয়েকটি পুকুরে পাওয়া গেছে দুস্থদের জন্য বরাদ্দ ভিজিএফের চাল।
হাতে আসা অডিও ক্লিপে শোনা গেছে, চাল ব্যবসায়ীর এই আকুতির উত্তরে ইউপি চেয়ারম্যান বলছেন, ‘সরকারি চাল এভাবে কেনা ঠিক না। তা তুই সত্যি কথা বলে দে। সাংবাদিক, পুলিশ সবাই জেনে গিয়েছে। তুই তো আর চাল চুরি করিসনি। তুই তো চাল কিনিছিস। এখন অস্বীকার করা হবে আরেকটা বড় ভুল।’
গত সোমবার ও মঙ্গলবার ঝিনাইদহ সদর উপজেলার মহারাজপুর ইউনিয়নের হরিপুর গ্রামের কয়েকটি পুকুর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ভিজিএফের চাল। যে চাল ঈদের আগে হতদরিদ্রদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বরাদ্দ করা হয়েছিল। মঙ্গলবার দুপুরে উপজেলার হরিপুর গ্রামের অন্তত পাঁচটি পুকুরে পাওয়া যায় দুর্গন্ধযুক্ত এই চাল। এসময় সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার শাম্মি ইসলামসহ উপস্থিত ছিলেন সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা। যা নিয়ে সুবর্ণভূমিসহ একাধিক মিডিয়ায় খবর প্রকাশিত হয়।
এই চাল বেচা-কেনা নিয়ে মহারাজপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান খুরশিদ আলম ও চাল ব্যবসায়ী আজিজুলের মধ্যে হওয়া কথোপকথনের একটি অডিও রেকর্ড সূবর্ণভূমির হাতে এসেছে। যেখানে তারা উপরোক্ত কথাগুলো বলছিলেন।
অডিও’র প্রথমদিকে শোনা যাচ্ছে ইউপি চেয়ারম্যান চাল ব্যবসায়ী আজিজুলকে বলছেন, ‘এই ভুলভাল কাজ করা, বিপদে পড়া কাজ কেনো করিস তুই? চালগুলো পুকুরে ফেলা দরকার ছিল? তুই চালের ব্যবসা করিস; চাল পানিতে ফেললে গন্ধ হয় জানিসনে?’
অপর পাশ থেকে চাল ব্যবসায়ী আজিজুল চেয়ারম্যানকে ‘মামু’ সম্বোধন করে বলছেন, ‘ওই দিন আমি বাজারে ছিলাম। হাসান আর বাবু ফোন করে বলছিল রাতারাত চালগুলো সরিয়ে ফেল। আমি তাড়াতাড়ি করে রাত ১১টার সময় গুদাম থেকে সব চাল সরিয়ে নিয়ে আসি। এরপর ডিবি আসছে। সাংবাদিকরা ফোন করছে। চাল কোথায় রাখবো উপায় না পেয়ে পুকুরের মধ্যে ফেললাম। কেউ জানে না। কিন্তু চাল পচে যাওয়ায় সবই জানাজানি হয়ে গেছে।’
‘এখন সমাধান কী?’- চেয়ারম্যানের কাছে বার বার জানতে চাচ্ছিলেন চাল ব্যবসায়ী আজিজুল।
মঙ্গলবার দুপুরে হরিপুর গ্রামে গিয়ে প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সোমবার সন্ধ্যার দিকে উপজেলার হরিপুর গ্রামের আজিজুল শাহর মাছের খামার থেকে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। কুরবানির পশুর বর্জ্য পচে এ দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে বলে মনে করেছিলেন তারা। মঙ্গলবার সকালের দিকে দুর্গন্ধের মাত্রা আরো বাড়ে। এতে আশপাশের মানুষ অতিষ্ট হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে কৌতূহলী লোকজন পুকুরের পানিতে নেমে পড়েন। এরপর তারা পানির নিচে চালের সন্ধান পান।
এরপর মঙ্গলবার উপজেলা নির্বাহী অফিসারের উপস্থিতিতে পানিতে ডুব দিয়ে মুঠো মুঠো চাল তুলে আনতে থাকেন গ্রামবাসী। খবর ছড়িয়ে পড়ে গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে। শত শত নারী পুরুষ ছুটে আসেন সেখানে।
গ্রামের বৃদ্ধ আব্দুল কাদের ও কদম আলী দুঃখ করে বলেন, চাল পচা গন্ধে বাড়িতে টিকতে পারছেন না তারা। ভিজিএফের চাল পানিতে ফেলে দেওয়ার কথা শুনেছেন তারা। তবে কারা এ কাজ করেছে- এমন প্রশ্ন করা হলে জড়িতদের নাম বলতে রাজি হননি ওই দুই বৃদ্ধ।
যোগাযোগ করা হলে হরিপুর গ্রামের চাল ব্যবসায়ী আজিজুল শাহ ফোনে বলেন, ভিজিএফের ৫২ বস্তা চাল কিনেছিলেন তিনি। স্থানীয় বিষয়খালী গ্রামের সবুজ নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে সাড়ে ২৬ টাকা কেজি দরে এ চাল কেনা হয়। চালগুলো বিষয়খালী বাজারের আছিয়া রাইচমিলের গুদামে রাখেন তিনি। কিন্তু দ্রুত বিষয়টি জানাজানি হয়ে যায়। ভয় পেয়ে হরিপুরের নিজ বাড়িতে চাল নিয়ে যান এবং ঈদের পরের দিন নিজের ও প্রতিবেশীদের পুকুরের পানিতে বস্তা খুলে চাল ছড়িয়ে দেন আজিজুল।
সদর উপজেলা সহকারী মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার হোসনে আরা এ ইউনিয়নে চাল বিতরণ তদারকির দায়িত্ব পালন করেছিলেন । তিনি বলেন, তার উপস্থিতে চাল বিতরণ করা হয়েছিল।
এ চালের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মহারাজপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. খুরশিদ আলম বলেন, ঈদের দুইদিন আগে (২০ আগস্ট) চাল বিতরণ করা হয়। চাল বিতরণে কোনো অনিয়ম হয়নি বলে তার দাবি।
এদিকে ঈদের আগের দিন রাতে সদর উপজেলার রঘুনাথপুর গ্রামের মিঠু জোয়ার্দার, একই উপজেলার কলমনখালীর শরিফুল মোল্লা এবং বিপুলের গুদামে অভিযান চালিয়ে ১০৪ বস্তা ভিজিএফের চাল জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার দপ্তরের কার্যসহকারী জাহিদ হাসান বাদী হয়ে সদর থানায় একটি মামলা করেছেন। সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসারের দপ্তর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে ।
অন্যদিকে, জেলার কালীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মিজানুর রহমান জানান, ঝিনাইদহ সদর উপজেলার নলডাঙ্গা ইউনিয়নের এক হাজার ৪৪৪ কেজি ভিজিএফের চাল স্থানীয় জনতা আটক করে পুলিশের কাছে দিয়েছেন। ঈদের আগের দিন এ চাল নসিমনে করে কালীগঞ্জের পাইকপাড়ায় আনা হয় বলে জানান ওসি ।
ঝিনাইদহ সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার শাম্মী ইসলাম বলেন, ভিজিএফের বরাদ্দ করা চাল পানিতে ফেলে দেওয়ার ঘটনা দুঃখজনক। খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন তিনি। প্রকৃত ঘটনা অনুসন্ধান চলছে। প্রাথমিকভাবে জড়িত চাল ব্যবসায়ী আজিজুল ও সবুজের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি জানান।

আরও পড়ুন