যশোর সদর উপজেলা ভূমি অফিসে ইতিবাচক পরিবর্তন

আপডেট: 06:47:30 19/11/2017



img
img

স্টাফ রিপোর্টার : যশোর সদর উপজেলা ভূমি অফিসের চিরাচরিত চিত্র পাল্টানোর উদ্যোগ নিয়েছেন নতুন ভূমি কর্মকর্তা।
অনিয়ম, দুর্নীতিরোধে ভূমি অফিস থেকে ইতিমধ্যে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছে নামজারির আবেদন প্রক্রিয়া। এখন থেকে ইউনিয়ন ও পৌর তথ্য সেবা কেন্দ্র থেকে করতে হবে আবেদন এবং ওই কেন্দ্র থেকেই পাওয়া যাবে পরচা ও ডিসিআর কপি। একইসঙ্গে সব ইউনিয়ন তহশিল অফিসে বসানো হচ্ছে অভিযোগ বাক্স। আর কোনো অভিযোগ পেলেই দ্রুত তদন্ত শেষে নেওয়া হবে ব্যবস্থা। নতুন ভূমি কর্মকর্তার এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন সেবাগ্রহিতারা।
যশোর সদর উপজেলা ভূমি অফিস সাধারণ মানুষের কাছে হয়রানি, ভোগান্তি ও অনিয়মের এক নাম। যেখানে কোনো কাজ করতে হলেই গুণতে হয় টাকা। আবেদন করা থেকে কয়েক ধাপে টাকা নেওয়া হয় সেবাগ্রহিতাদের কাছ থেকে। বিশেষ করে নামপত্তন বা নামজারির আবেদনকে পুঁজি করে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছিল অনিয়ম ও দুর্নীতি।
সেবা গ্রহিতাদের তথ্য মতে, কোনো কাজে গেলেই দায়িত্বরতরা আজ কাল করে দিনের পর দিন ঘোরাতেন। একপর্যায়ে সেবাগ্রহিতাই নিজে থেকে কিছু উৎকোচ দেওয়ার প্রস্তাব দিলে ঝড়ের বেগে শুরু হতো কাজ। সেইসঙ্গে ছিল দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের অফিসে লাগামহীন অনুপস্থিতি ও কাজ না করার মানসিকতা। এতে করে নির্ধারিত সময়ে কাজটি সম্পন্ন করে নিতে পারতেন না তারা।
ভূমি অফিসের চিরচারিত এ চিত্র ভাবমূর্তি নষ্ট করছে বলে মনে করেন সদ্য যোগদান করা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সৈয়দ জাকির হাসান। গত ১৯ নভেম্বর যোগদানের পরের দিনই ভূমি বিষয়ক প্রশিক্ষণে ঢাকায় চলে যান এ কর্মকর্তা। প্রশিক্ষণ শেষে গত ৫ নভেম্বর তিনি অফিস শুরু করেছেন। শুরুতেই অফিসের ভাবমূর্তি রক্ষায় হাত দিয়েছেন তিনি। প্রথমেই সরকারি নির্দেশনায় ভূমি অফিস থেকে নির্বাসনে পাঠিয়েছেন নামজারির আবেদন প্রক্রিয়া।
সহকারী ভূমি কমিশনার সৈয়দ জাকির হোসেন বলেন, ‘নামপত্তন বা নামজারি নিয়ে নানা অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে আবেদন প্রক্রিয়ার সাথে ভূমি অফিসের কর্মচারীদের সম্পর্কে ছেদ টানা হয়েছে। এখন থেকে ইউনিয়ন ও পৌর তথ্য সেবা কেন্দ্র অনলাইনে এ আবেদন প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করবে। এরপর ভূমি অফিস যাবতীয় কাজ শেষ করে পরচা ও ডিসিআরের কপি ওই কেন্দ্রে পাঠিয়ে দেবে এবং সেবা গ্রহিতা তা গ্রহণ করবে। এজন্য সরকার নির্ধারিত ফি এক হাজার ১৫০ টাকার সাথে সেবাকেন্দ্রকে সার্ভিস চার্জ হিসেবে ২৫০ টাকা প্রদান করতে হবে। স্বচ্ছতার স্বার্থে এখন থেকে সেবাগ্রহিতা সরকারি ফি এক হাজার ১৫০ টাকা নিজেই ব্যাংকে জমা দিতে পারবেন।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমার অফিসে বা তহশিল অফিসে সেবাগ্রহিতাদের দৌঁড়ঝাপ করতে হবে না। আমাদের কাজ আমরা নিয়মানুযায়ী করে দেবো। ইতিমধ্যে ভূমি অফিস থেকে আবেদন ফেরত দিয়ে সেবাগ্রহিতাদের ইউনিয়ন ও পৌর তথ্য সেবা কেন্দ্রে যেতে অনুরোধ জানানো হচ্ছে।’
‘এখানেই শেষ নয়, সদর উপজেলা ভূমি অফিসকে জনবান্ধব করতে এ অফিসসহ ১৩টি ইউনিয়ন তহশিল অফিসেই বসানো হচ্ছে অভিযোগ বাক্স। সেইসাথে টাঙানো হবে ১৩টি ফেস্টুন। যেখানে সচেনতনামূলক তথ্য ও মোবাইলে অভিযোগ দেওয়ার তথ্য তুলে ধরা হবে।’
অফিস সূত্র জানায়, অভিযোগ বাক্স বা ০১৭৭৭৩৪০৮১৬ নম্বরে অভিযোগ করলেই দ্রুত তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতিমধ্যে দুটি অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।
সহকারী কমিশনার বলেন, ‘দায়িত্ব নেওয়ার সময় দুই হাজারের অধিক পেন্ডিং ফাইল পেয়েছি। ৫ নভেম্বর কাজ শুরু করে ইতিমধ্যে এক হাজার ফাইলের প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে বাকি কাজ শেষ করতে পারবো।’
এরপর আর ফাইল জমবে না বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। আর জট না থাকলে ভোগন্তিও থাকবে না বলে মনে করছেন এই কর্মকর্তা।
সৈয়দ জাকির হাসান বলেন, ‘সদর উপজেলা ভূমি অফিসের অবকাঠামোগত কিছু পরিবর্তনও আনা হবে। পুরনো জরাজীর্ণ ভবন ও কিছু গাছ নিলামের প্রক্রিয়া করা হয়েছে। শিগগির দরপত্র আহ্বান করা হবে। সেই সাথে নির্মাণ করা হবে নিরাপত্তা দেয়াল।’
তিনি জানান, সদর উপজেলা ভূমি অফিসকে জনবান্ধব করতে সব ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এজন্য তিনি সবার সহায়তা কামনা করেন।
এদিকে নতুন ভূমি কর্মকর্তার এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন সেবাগ্রহিতারা। রাজিয়া বেগম নামে একজন বলেন, ‘নতুন এ কর্মকর্তা আসার তিন মাস আগে আবেদন করেছিলাম। কিছু ভুল হওয়ায় ফের আবেদন করি। এখনো নামজারির কাগজপত্র পাইনি। তবে আজ শুনলাম নামজারির আবেদন পৌরসভায় করলে সময়মতো কাগজপত্র পাওয়া যাবে। সেটা হলে ভোগান্তি কমে।’
সালাম হোসেন নামে অপর একজন জানান, আগের অফিসারের কক্ষে যাওয়া যেত না। বর্তমান অফিসারের কাছে গিয়ে সমস্যা জানালে তিনি সহায়তা করেন। অনেক সময় নানা সমস্যায় জর্জরিতদের কাজ দ্রুততার সঙ্গে করেও দেন।
হিতু মল্লিক নামে এক সেবাগ্রহিতা জানান, তিনি দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসে থাকেন। বাড়িতে ফিরে জমির কিছু কাজ নিয়ে ভূমি অফিসে আসেন। প্রবাসী হওয়ার সুবাদে সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী নির্ধারিত নয়দিনের মধ্যে তার কাজটি সম্পন্ন করে দিয়েছেন বর্তমান ভূমি কর্মকর্তা। এতে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, ‘সব ভূমি অফিসে এমন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা থাকলে জনভোগান্তি জাদুঘরে যাবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘এ অফিসে সেবাগ্রহিতাদের বসা বা পানি পানের সমস্যা রয়েছে। বিষয়টি উপলদ্ধি করে আমি একটি পানির জার অনুদান দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলাম। ভূমি কর্মকর্তা আমার প্রস্তাবটি গ্রহণ করেছেন এবং সেটি সেবাগ্রহিতাদের জন্য চালু করায় ধন্যবাদ জানাচ্ছি।’
একইসঙ্গে তিনি সেবাগ্রহিতাদের জন্য ভূমি অফিস চত্বরে একটি বসার স্থান চালু করার দাবি জানান।

আরও পড়ুন