খুন-খারাবির স্বর্গরাজ্য

আপডেট: 07:59:13 12/09/2018



img

রূপক মুখার্জি, লোহাগড়া (নড়াইল) : চলতি বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি দুপুর ১২টায় লোহাগড়া উপজেলা পরিষদ চত্বরে প্রকাশ্যে খুন হন দিঘলিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান কুমড়ী গ্রামের শেখ লতিফুর রহমান পলাশ। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে চলা একটি বৈঠকের মাঝে চেয়ারম্যান পলাশ সঙ্গী আরেক ইউপি সদস্যকে নিয়ে উপজেলা পরিষদের বাইরে আসার পথে ভূমি অফিস এবং নির্বাচন অফিসের মাঝের রাস্তায় এই হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়। ওত পেতে থাকা খুনিরা গুলি করে এবং কুপিয়ে হত্যা নিশ্চিত করে পালিয়ে যায়। দিন-দুপরে প্রকাশ্যে এলাকার প্রভাবশালী চেয়ারম্যান এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের শ্রম বিষয়ক সম্পাদক খুন হওয়ায় স্তম্ভিত হয়ে যায় এলাকার মানুষ।
ঘটনার তিন দিন পরে নিহত পলাশের বড় ভাই সাইফুর রহমান হিলু বাদী হয়ে ১৫ জনকে আসামি করে পেনাল কোডের-৩০২ ধারায় মামলা করেন। মামলায় প্রধান আসামি করা হয় একই এলাকার স্থানীয় প্রতিপক্ষ নড়াইল জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শরীফ মনিরুজ্জামানকে। মামলার অন্য আসামিরা হলেন মনিরুজ্জামানের আপন ভাই শরীফ বাকি বিল্লাহ, সোহেল খান, ইউপি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী (নৌকা) মাসুদুর রহমান, দিঘলিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ওহিদুর সরদার, প্রতিপক্ষ খায়ের শেখ, তার দুই ভাই বাবু শেখ ও রওশন শেখ, বনি শেখ ও তার ভাই কোন্টে শেখ, সৈয়দ হেদায়েত আলী, নজরুল ফকির, রিপন শেখ, আব্দুর রব মোল্যা ও দিঘলিয়ার সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মাসুম খান।
১৭ ফেব্রুয়ারি মামলার প্রধান আসামি শরীফ মুনিরুজ্জামানকে ঢাকা থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এরপর মামলার অন্য দশ আসামি ১৫ মার্চ তারিখে আদালতে হাজির হলে আদালত তাদেরকে জেলহাজতে পাঠান। বাকি চার আসামি বর্তমানে পলাতক আছেন।
মামলার এজাহারে নাম থাকা আসামিদের কয়েক দফা রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদে কোনো তথ্য বের করতে পারেনি পুলিশ। নড়াইলের সহকারী পুলিশ সুপার মেহেদী হাসানের নেতৃত্বে চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলা তদন্তে বিভিন্ন সূত্র ধরে এগুতে থাকে। সন্দেহভাজন কয়েক ব্যক্তির মোবাইল ফোন অনুসন্ধান করে পলাশ খুনের মূল আসামিদের ধরতে পুলিশি তৎপরতায় ২২ মার্চ চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট থেকে গোলাম কিবরিয়া, ২৩ মার্চ নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে সৈয়দ রোমান আলী এবং ঢাকার তেজগাঁও বেগুনবাড়ি থেকে সৈয়দ আল-আমীনকে আটক করে। পলাশ খুনে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আসামিরা প্রত্যেকেই ১৬৪ ধারায় ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে জবানবন্দি দেন।
আল-আমিন তার জবানবন্দিতে স্বীকার করেন, ‘তিন বছর আগে নিহত চেয়ারম্যান পলাশ নিজ হাতে তার বাবাকে খুন করেছে, তাই সেই খুনের প্রতিশোধ নেওয়া হয়েছে। এই খুনের জন্য অস্ত্র সরবরাহ করে তার আপন ভাগনে শান্ত।’
গোলাম কিবরিয়ার লিখিত জবানবন্দিতে জানান, শান্তর কাছ থেকে অস্ত্র নিয়ে পলাশকে গুলি করেন। প্রথম গুলিটি চেয়ারম্যানের গায়ে লাগলেও পরের গুলিটি সঙ্গী আল-আমিনের হাতের আঙুলে লাগে। ওদের কাছ থেকে টাকা পাবেন- এই আশায় তিনি পলাশ খুনের অভিযানে অংশ নেন।
পুলিশের কাছে জবানবন্দি দেওয়া অপরজন সৈয়দ রোমান আলী তার জবানবন্দিতে জানান, ২০১৬ সালের নির্বাচনের পরে পলাশ চেয়ারম্যানের লোকেরা তাদের বাড়ি থেকে পাঁচটি গরু লুট করে নিয়ে যায় এবং তার বাবাকে দুই দফা মারধর করে। চেয়ারম্যান পলাশের ভয়ে তিনি গত তিন বছর বাড়িতে থাকতে পারেন না। গত বছর কুমড়ীতে গেলে পলাশের লোকজন তাকে মারধর করে। নিজের পরিবারের অপমান এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিনি এই খুনে অংশ নেন। এই সকল খুনির স্বীকারোক্তিতে উঠে আসা অস্ত্র সরবরাহকারী ও অস্ত্র উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। শান্তকে আটক করতে পারেনি।
নড়াইল জেলার লোহাগড়া উপজেলার দিঘলিয়া ইউনিয়নের দাঙ্গাপ্রবণ কুমড়ী গ্রামে কথা হয় নিহত চেয়ারম্যান পলাশের পরিবারের সঙ্গে। প্রিয় ছেলেকে হারিয়ে পলাশের বৃদ্ধা মায়ের বিলাপ, ‘আমার ছেলে কার এমন ক্ষতি করেছে, যে তাকে এভাবে আমার কাছ থেকে সরিয়ে দিলো? এখন আমার খোঁজ কে নেবে?
নিহত পলাশের স্ত্রী বর্তমান দিঘলিয়া ইউপি চেয়ারম্যান নীনা ইয়াসমীন বলেন, ‘আমার স্বামীকে প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়েছে। আমরা প্রকৃত খুনিদের বিচার চাই।’
পলাশ হত্যা মামলার এজাহারে থাকা চার নম্বর আসামি মাসুদুর রহমান আড়াই মাস হাজত খেটে ১৬ মে জামিনে বের হন।
তিনি বলেন, ‘আমি গ্রামের অবস্থা বুঝতে পেরে ৪০ বছর আগে গ্রাম ছেড়ে লক্ষ্মীপাশা শহরে এসে পরিবার নিয়ে বসবাস করছি। তবুও পলাশ হত্যা মামলা থেকে রেহাই পেলাম না। আমার অপরাধ হলো, আমি ইউপি নির্বাচনে পলাশের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছি।’

অব্যাহত খুন-খারাবি
অনুসন্ধানে জানা যায়, স্বাধীনতার পর থেকে জেলার সবচেয়ে দাঙ্গাপ্রবণ কুমড়ী গ্রামের তিনটি পাড়ায় খুন হয়েছেন অন্তত ২৮ জন; যাদের মধ্যে ২৫ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে।
কুমড়ী-পশ্চিমপাড়ায় খুন হন ছয়জন। আবদুর রশীদ শেখের ছেলে বনিরুল শেখ (ছাত্র), মোসলেম সিকদারের ছেলে বজলার শিকদার (কৃষক), গোলাম রসুলের ছেলে ছাপা শেখ (ছাত্র), ফজর শেখের ছেলে মিকাইল শেখ (কৃষক), সৈয়দ সাহেব আলীর ছেলে ইলিয়াস আলী মীর (কৃষক) এবং গোলাম রসুলের ছেলে লতিফুর রহমান পলাশ (ইউপি চেয়ারম্যান)।
কুমড়ী মধ্যপাড়ায় খুন হওয়া ছয়জন হলেন দুদু খাঁ, তার ছেলে লায়েক খাঁ, লালমিয়া শেখের ছেলে মুজিবর শেখ, গনি মোল্যার ছেলে কাতেব মোল্যা, রওশন খাঁর ছেলে তোতা খাঁ ও পাচু শেখের ছেলে বাদশা শেখ।
কুমড়ী পূর্বপাড়ায় সর্বাধিক ১১ জন খুন হন। যার দুইজন আবার স্বাধীনতার আগে পাকিস্তান আমলে। খুন হওয়া এসব লোকেরা হলেন, দবির শেখের ছেলে ছবেদ শেখ (ছাত্র ), মতলেব শেখের ছেলে ঠান্ডা শেখ (কৃষক ), আতিয়ার শেখের স্ত্রী পাচি বিবি, ওজেত শেখের স্ত্রী অলেকা বিবি, ধলা মিয়ার মেয়ে ভিক্ষুক আমেনা (গুঙ্গি), খালেক শেখের ছেলে আফসার শেখ (কৃষক), রোকন শেখের ছেলে কালা শেখ (কৃষক ), বাচ্চু শেখের ছেলে তরিকুল শেখ (কৃষক), কাউসার ফকিরের ছেলে তনু ফকির (যুবক), রউফ শেখের ছেলে শিশু আজিজুর শেখ এবং মুকুল শেখের শিশু ছেলে সিয়াম।
নড়াইল জেলার সবচেয়ে দাঙ্গাপ্রবণ দিঘলিয়া ইউনিয়নের কুমড়ী গ্রাম। তথ্য বলছে, কেবলমাত্র এই একটি গ্রামে গত ৫০ বছরে খুন হয়েছেন অন্তত ২৮ জন। যার বেশিরভাগই প্রতিহিংসামূলক। আবার একটি খুন হলে আধিপত্য বিস্তার করতে আসামি করা হয় প্রতিপক্ষকে। বছরের পর বছর ধরে চলা এসব খুনের ঘটনা এবং পাল্টা হামলা, ভাঙচুর আর লুটপাটের কারণে মামলা হয়েছে প্রায় ৩০টি; আসামি অন্তত তিন হাজার। বছরের পর বছর ধরে চলা গ্রাম্য কোন্দলের হওয়া মামলার কারণে নিঃস্ব হয়েছেন অনেকে। কেউ কেউ আবার এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন। হত্যা আর লুটপাটের আতঙ্কে থাকেন সাধারণ মানুষ।
কুমড়ী গ্রামের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ওসমান সর্দার বলেন, এই গ্রামের যত খুন হয় কিছুদিন পর তা মিটমাটের জন্য একদল লোক উঠে পড়ে লেগে যায়। এখানকার প্রভাবশালী লোকদের জন্যই কোনো হত্যা মামলার সঠিক বিচার হয় না। সেই কারণে গ্রামে একের পর এক খুন হচ্ছে।
চেয়ারম্যান হত্যা মামলার বাদী নিহত পলাশের বড়ভাই নড়াইল জেলা পরিষদের সদস্য সাইফুর রহমান হিলু বলেন, পুলিশ ঘটনা ভিন্নদিকে প্রবাহিত করতেই এজাহারভুক্ত আসামিদের বাদ দিয়ে অন্যদের জবানবন্দি নিয়েছে। ঘটনাটি পুলিশের সাজানো। মামলার এজারহারভুক্ত আসামিদের কয়েকজন এখনো এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। অথচ পুলিশ তাদের ধরছে না।
এই মামলার প্রধান আসামি কুমড়ী গ্রামের সালাম শরীফের ছেলে শরীফ মনিরুজ্জামান। নড়াইল জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তিনি। ঢাকার এই ব্যবসায়ী সংসদ নির্বাচনের জন্য এলাকায় আসা-যাওয়া শুরু করেছিলেন। পলাশ হত্যা মামলার প্রধান আসামি হয়ে ইতিমধ্যে হাজত খেটেছেন প্রায় ছয় মাস। বর্তমানে জামিনে মুক্ত।
তিনি বলেন, ‘আমাদের স্থানীয় এমপি শেখ হাফিজুর রহমানের চক্রান্তে আমাকে আসামি করা হয়েছে। আমি এমপি নির্বাচন করতে মাঠে আসি। এটা উনার সহ্য হচ্ছে না। তিনিই এলাকার সব হত্যা মামলা মীমাংসা এবং জড়ানোর ব্যাপারে বড় ভূমিকা রাখেন।’
আসামিদের অভিযোগ প্রসঙ্গে নড়াইল-২ আসনের সংসদ সদস্য কুমড়ী গ্রামের বাসিন্দা অ্যাডভোকেট শেখ হাফিজুর রহমান বলেন, ‘মনিরুজ্জামানের মতো অনেকেই এমপি প্রার্থী হিসেবে দৌড়ঝাপ করছেন। সবাইকে মামলা দিয়ে আটকানো হয়নি। আসামি মনির শরীফ কালো টাকার মালিক হয়ে এলাকায় টাকা ছড়িয়েছে। সে মনে করেছে, এলাকায় পলাশ থাকলে সুবিধা হবে না, তাই টাকা দিয়ে পলাশকে হত্যা করিয়েছে।’
এলাকার হত্যা মামলার বিচার না হওয়া প্রসঙ্গে এই আইনজীবী বলেন, ‘মামলা মীমাংসা তো হতেই পারে। এটাতো আইনে নিষিদ্ধ নাই।’
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা লোহাগড়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মনিরুল ইসলাম বলেন, অধিকতর তদন্ত শেষে চাঞ্চল্যকর পলাশ হত্যা মামলার অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দেওয়া হবে।
পলাশ হত্যা মামলা তদন্তে বিশেষ ভূমিকা রাখা নড়াইলের সহকারী পুলিশ সুপার মেহেদী হাসান বলেন, এলাকায় হত্যা হলেই প্রতিপক্ষকে আসামি করা হয়। পলাশ হত্যা ঘটনার প্রকৃত রহস্য বের হরতে সক্ষম হয়েছে পুলিশ। অস্ত্র সরবরাহকারী শান্তকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। অচিরেই পুলিশ এই চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার চার্জশিট দাখিল করবে।
এ ব্যাপারে নড়াইলের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, ‘ইউপি চেয়ারম্যান পলাশ হত্যা মামলাটি গুরুতসহকারে দেখা হচ্ছে। গ্রেফতার তিনজন পলাশকে হত্যার কথা স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। পুলিশ সঠিক পথেই এগুচ্ছে।’
এলাকাবাসীর বক্তব্য, খুনোখুনি আর প্রতিহিংসা টিকিয়ে রেখেছে গ্রাম্য কোন্দল। যার সুফল ভোগ করেন মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আইনজীবী, পুলিশের লোক আর ক্ষমতালোভী মাতবরেরা। সাধারণ মানুষ প্রকৃত হত্যাকারীদের বিচার করে এসব নোংরা গ্রাম্য রাজনীতি থেকে মুক্তি চান, পরিত্রাণ চান।