শেষ জীবনে চরম দুর্দশায় ছিলেন রানি

আপডেট: 04:26:53 07/07/2018



img

মাজহার বাবু : অভিনেত্রী রানি সরকার আর নেই। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। আজ শনিবার ভোর চারটার দিকে রাজধানীর মতিঝিলের একটি হাসপাতালে বার্ধক্যজনিত কারণে তার মৃত্যু হয়।
রানি সরকার চলচ্চিত্রে কাজ শুরু করেন ১৯৫৮ সালে। সব মিলিয়ে তিনি এক হাজারেরও বেশি ছবিতে কাজ করেছেন। কিন্তু জীবনের শেষ সময়ে তেমন কোনো কাজের ডাক পাননি তিনি। বলতে গেলে অর্থকষ্ট ও অর্ধাহারেই দিন কেটেছে তার।
আজ দুপুর দুইটায় এফডিসিতে জানাজা অনুষ্ঠিত হয় প্রবীণ অভিনেত্রী রানির। সেখানে দীর্ঘদিনের সহকর্মীরা ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান তাকে। বাদ আসর রাজধানীর আজিমপুর কবরস্থানে রানি সরকারকে দাফন করার কথা।
মৃত্যুর আগে চলতি বছর ১ ফেব্রুয়ারি এই প্রতিবেদকের কাছে নিজের অবস্থার কথা তুলে ধরেছিলেন রানি সরকার। সেসময় তিনি বলেছিলেন, ‘এভাবে ভাতের অভাবে কাঁদতে হবে ভাবিনি। দিনটা শুরু হয় ভাতের অভাব দিয়ে। চাল থাকে তো নুন থাকে না অবস্থা। এভাবে জীবনটা শেষ হয়ে যাচ্ছে। বাকি দিনগুলো কীভাবে কাটবে বুঝতে পারছি না। কারো বাসায় গেলে চা বিস্কুট খাওয়ায়। কিন্তু ভাত দেয় না কেউ। আমি চলচ্চিত্রে কাজ করেছি, সবাই আমাকে চেনে, যে কারণে ভিক্ষা করার কথা চিন্তাও করতে পারি না।’
সংসারে কে কে আছেন, কীভাবে চলে সংসার জানতে চাইলে রানি বলেছিলেন, ‘আমরা তিন ভাইবোন ছিলাম, বড় ভাই মারা গেছেন। ছোট ভাই পঙ্গু, এখনো প্রতি সপ্তাহে চিকিৎসা করাতে হয়। তার বউ-বাচ্চাসহ মোট ছয়জনের সংসার। ছোট ভাই কোনো কাজ করতে পারে না। আমার সংসার চলে প্রধানমন্ত্রীর টাকায়। তিনি আমাকে ২০ লাখ টাকার একটা চেক দিয়েছিলেন, সেখানে থেকে প্রতি মাসে ২০ হাজার টাকা পাই। আমরা যে বাড়িতে থাকি, ছোট দুই রুমের একটা বাসা, তাও সব মিলিয়ে ১৩-১৪ হাজার টাকা চলে যায়। বাকি ছয়-সাত হাজার টাকা দিয়ে কোনোভাবে চাল-ডাল কিনি, কিন্তু তা দিয়ে চলা সম্ভব নয়, যে কারণে আমার সংসার আর চলে না।’
কাজ করতে চান জানিয়ে রানি বলেছিলেন, ‘আমি কারো কাছে ভিক্ষা চাইছি না, আমি কাজ করে ভাত খেতে চাই। আমাকে আপনারা কাজ দেন, কাজের বিনিময়ে যত ইচ্ছে টাকা দেন। আপনাদের শুটিংয়ে গেলে অন্তত সেই সময়টা ভালো খেতে পারব, কিছু টাকা পেলে বাড়িতেও দুদিন খাবার হবে।’
চার দশকের মতো কাজ করলেও কেনো কোনো সঞ্চয় করেননি জানতে চাইলে রানি সরকার বলেছিলেন, ‘আমরা কি আর টাকার জন্য কাজ করেছি? নেশা থেকেই কাজ করতাম। যেদিন শুটিং থাকত না, সেদিনও এফডিসিতে গিয়ে আড্ডা দিয়ে আসতাম। তা ছাড়া একজন সহশিল্পী কত টাকা পায়? টাকা তো পায় হিরো হিরোইনরা। তারা দুই লাখ টাকা পেলে আমরা পেতাম দুই হাজার, ছবির পরিচালকও ঠিক মতো টাকা পায় না। শুধু আমাদের সময়ই না, এখন যারা সহশিল্পী হিসেবে কাজ করছে তাদের কতজন সচ্ছল? এটা আসলে বলে লাভ নেই। টাকা যা পেয়েছি, তখন পোলাও কোরমা খেয়েছি, কিন্তু জমানোর মতো টাকা কখনোই পাইনি।’
রানি সরকার বাংলা চলচ্চিত্রে অভিনয় শুরু করেন ষাটের দশকে। বাংলা চলচ্চিত্রে অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ ২০১৬ সালে তাকে আজীবন সম্মাননা পুরস্কার প্রদান করে বাংলাদেশ সরকার।
রানি সরকার বাংলাদেশের খুলনা বিভাগের সাতক্ষীরা জেলার কালিগঞ্জ উপজেলার সোনাতলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম সোলেমান মোল্লা এবং মায়ের নাম আছিয়া খাতুন।
তিনি সাতক্ষীরার সোনাতলা গ্রামের স্কুল থেকে প্রাথমিক পাঠ শেষ করেন। এরপর খুলনা করোনেশন গার্লস স্কুল থেকে মেট্রিক পাস করেন। অভিনয় জীবন শুরু করেন ১৯৫৮ সালে বঙ্গের বর্গী মঞ্চনাটকের মাধ্যমে। একই বছর তার চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় এ জে কারদার পরিচালিত ‘দূর হ্যায় সুখ কা গাঁও’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। এরপর ১৯৬২ সালে বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার এহতেশামুর রহমান (এহতেশাম নামেই পরিচিত) পরিচালিত উর্দু চলচ্চিত্র ‘চান্দা’তে অভিনয় করেন। সেই ছায়াছবির পর থেকে তার পিতৃপ্রদত্ত নাম মেরির বদলে নতুন নাম হয় রানি সরকার।
‘চান্দা’ চলচ্চিত্রের সাফল্যের পর উর্দু ছায়াছবি ‘তালাশ’ ও বাংলা ছায়াছবি ‘নতুন সুর’-এ কেন্দ্রীয় নারী চরিত্রে অভিনয় করেন রানি। এই ছায়াছবি দুটিও বেশ জনপ্রিয় হয়। এরপর তিনি এক হাজারেরও বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। তিনি একজন নৃত্যশিল্পীও ছিলেন।
সূত্র : এনটিভি

আরও পড়ুন