‘কে মাদক ব্যবসায়ী তা সরকার বলার কেউ না’

আপডেট: 02:51:05 23/05/2018



img
img

সালমান তারেক শাকিল : সারাদেশে চলমান মাদকবিরোধী অভিযানে ‘বন্দুকযুদ্ধ’ নিয়ে নতুন দুশ্চিন্তায় পড়েছে বিএনপি। দলটির নেতারা মনে করছেন, এ অভিযানে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের টার্গেট করার আশঙ্কা রয়েছে। এভাবে ‘বন্দুকযুদ্ধের’ ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলবে বলেও মনে করেছে দলটি। নেতাদের পরামর্শ, যেকোনো অপরাধীকে স্বাভাবিক আইনের পথে বিচারের আওতায় আনা দরকার। এতে গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা ও আইনের শাসন নিশ্চিত হয়। 
গত ১৪ মে থেকে সারাদেশে মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল গণমাধ্যমে বলেছেন, মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত সারাদেশে অন্তত ৩৮ জন অভিযুক্ত মাদক ব্যবসায়ী কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন। প্রথমদিকে বিএনপির নেতারা এ বিষয়ে নীরব থাকলেও গত সোমবার (২১ মে) মুখ খোলেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি আগে ‘নিজেদের ঘরের মধ্যে অভিযান চালাতে’ সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
একদিন পরই মঙ্গলবার জাতীয় প্রেসক্লাবে এক আলোচনা সভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, মাদক সম্রাটরা সবাই আওয়ামী লীগের বড় বড় নেতা ও কর্মী। সরকারের এমপি, যাকে সারাদেশের মানুষ চেনে মাদক সম্রাট হিসেবে; তাকে ধরার পরিবর্তে ফুলের মালা পরানো হয়েছে। চুনোপুঁটিদের না মেরে মাদকের মূল নায়কদের নাম প্রকাশ করে বিচারের মুখোমুখি করারও দাবি জানান তিনি।
বিএনপির নেতারা মনে করছেন, নির্বাচনের বছরে এভাবে ‘বিনা বিচারে হত্যাকাণ্ডের’ প্রভাব পড়তে পারে বিরোধী দলগুলোর ওপর। ক্ষমতাসীনদের এমন কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা, তাও খতিয়ে দেখছেন তারা। যদিও মঙ্গলবার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, ‘পাঁচটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’
বিএনপির নেতাদের দাবি, মাদকের বিরুদ্ধে প্রকৃত অবস্থান সরকার এখনো নিতে পারছে না। তাহলে সরকারদলীয় এমপি আবদুর রহমান বদিকেই গ্রেফতার করা হতো সবার আগে। টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে ইয়াবার চালান আসার পেছনে বদির সংযুক্ততার অভিযোগ থাকার প্রেক্ষাপটে তারা এমন মন্তব্য করেন। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘সরকারি দলেই তো মাদক ব্যবসায়ী রয়েছে; টেকনাফের এমপি আবদুর রহমান বদি। সরকার যদি মাদক নির্মূলে আন্তরিক হয়, তাহলে তাকে আগে গ্রেফতার করে আন্তরিকতা দেখাক।’
বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, ‘এই হত্যাকাণ্ড সামগ্রিকভাবে সমাজের ওপর প্রভাব ফেলবে। ব্যবসায়ীদের ওপর, প্রশাসনের ওপর–বিশেষ করে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর প্রভাব ফেলবে বেশি। ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে এসব হত্যাকাণ্ডে।’
তিনি আরো বলেন, ‘কাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে, আর কাকে মারছে এটা তো পরিষ্কার করছে না। সরকার দাবি করছে, তারা মাদক ব্যবসায়ী। কিন্তু সরকার তো দাবি করার কেউ নয়। কোর্ট বলবে, কে দোষী। পুলিশ কেস করবে, এটার বিচার হবে, এটাই স্বাভাবিক।’
দলটির নেতারা বলছেন, প্রকৃত অপরাধীদের গ্রেফতার না করে রাজনৈতিকভাবে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের এতে ফাঁসানো হতে পারে, এমন আশঙ্কা রয়েছে তাদের। শামসুজ্জামান দুদু এমন আশঙ্কা ব্যক্ত করে বলেন, ‘এমনও হতে পারে যে, কাউকে ফাঁসিয়ে দেওয়া হতে পারে। ক্রসফায়ারে হত্যা করার কোনো আইন নেই। এটি সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করবে।’
সোমবার নেত্রকোনায় পৌর ছাত্রদলের সদস্য আমজাদ হোসেন ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন। পুলিশ তাকে মাদক ব্যবসায়ী বললেও তার পরিবার ও বন্ধুদের দাবি, আমজাদ হোসেন ধূমপানও করতেন না।
জাতীয়তাবাদী ঘরানার বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, ‘দেশে তো ক্ষমতার রাজনীতি চলছে। এভাবে তাদের মারা হচ্ছে, কাদের মারা হচ্ছে–এটা তো বুঝা যাচ্ছে না। এমনও তো হতে পারে, অনেকে মাদকে যুক্ত, অনেকে নিরপরাধ।’ তিনি আরো বলেন, ‘মেরে ফেলা তো আইনের আওতায় পড়ে না।’
সাম্প্রতিক ‘বন্দুকযুদ্ধে’ রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে কিনা এমন প্রশ্নে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই উপাচার্য বলেন, ‘এত চিন্তা-ভাবনা করে ব্যাপারটা করা হচ্ছে বলে মনে হয় না। এটা তো ঠিক, রোহিঙ্গারা আসার পরপরই মাদকের ভয়াবহতা বেড়েছে। কিন্তু হত্যাকাণ্ড মেনে নেওয়া যায় না।’
এদিকে বিএনপির একটি সূত্র জানায়, মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইন ও স্বাভাবিক বিচারের পথে না গেলে বিষয়টিকে দেশীয় ফোরামে আলোচনায় রাখা হবে। দলীয় নেতারাও বিষয়টিকে ফোকাসে রাখবেন। তারপরও কোনো উন্নতি না ঘটলে বিষয়টি আন্তর্জাতিক ফোরামে তোলার সম্ভাবনাও বাতিল করছেন না বিএনপি নেতারা।
দলটির মহাসচিবের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের ভাষ্য, মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থান শেষ পর্যন্ত তাদের (সরকারের) বিরুদ্ধেই যাবে। বিগত দিনের অভিজ্ঞতার আলোকে ওই সূত্রের দাবি, বিএনপিও এভাবে ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। পরে তা বিএনপির বিরুদ্ধেই গেছে। ফলে উদ্দেশ্য থাকলেও রাজনৈতিকভাবে এর মাধ্যমে বিএনপিকে খুব বেশি বিপদে ফেলা যাবে না–এমন ধারণা ওই সূত্রের। এ বিষয় শামসুজ্জামান দুদু বলেন, ‘আমরা ক্রসফায়ারের বিরোধিতা করছি। আগেও সবসময় করেছি। প্রয়োজন হলে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোয় বিষয়টি তুলবো।’
সূত্র : বাংলা ট্রিবিউন

আরও পড়ুন